একজন নকীব খান এবং চিরতরুণ রেনেসাঁ ব্যান্ড

‘আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে

আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই’

শিশুদের নিয়ে বাংলায় এমন গান আর নেই বললেই চলে। গানটি আমাদের খুব চির চেনা। শৈশবকাল থেকেই এই গানটি আমরা শুনে শুনে বড় হয়েছি। গানটি আমরা পেয়েছি জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড রেনেসাঁর সৌজন্যে।

শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর কথায় শাহবাজ খান পিলুর সুরে এই গানটি গেয়েছিলেন রেঁনেসা ব্যান্ডের প্রধান ও জনপ্রিয় সংগীত ব্যক্তিত্ব নকীব খান। ‘হৃদয় কাঁদামাটির কোনো মূর্তি নয়, আঘাত দিলে ভেঙে যাবে’ – রেঁনেসা ব্যান্ডের আরেক জনপ্রিয় গান।১৯৯৩ সালে তাদের দ্বিতীয় অ্যলব্যাম ‘তৃতীয় বিশ্ব’ – তে ছিল এই গানটি। আজ যে শিশু গানটিও এই একই অ্যলব্যামেরই গান।

নকীব খান ও পিলু খান

এই নকীব খান মূলত আরেক জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘সোলস’ – এর প্রোডাকশন। স্বাধীনতার পরেই যুক্ত হন ব্যান্ড সঙ্গীতে। প্রথমে ‘বার্লাক’ নামের একটি ব্যান্ডে বেশ কিছু দিন ছিলেন। এরপরই যোগ দেন ব্যান্ড তারকাদের আতুরঘর ‘সোলস’ ব্যান্ডে। সেটা ১৯৭৫ সালের কথা। নকীব খানের যোগ হবার পর থেকেই সোলসের নিজস্ব গান সৃষ্টির সূচনা হয়।

‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’, ‘এই মুখরিত জীবনে চলার পথে’ – সোলসের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই দুটি গানেরই সুরকার তিনি। প্রায় দশ বছরেরও বেশি সময় সোলসে কাটানোর পর ১৯৮৫ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন।

নিজেই গড়ে তোলেন ব্যান্ড দল। নাম দেন ‘রেনেসাঁ’। এরপর তিন বছর পর ‘রেঁনেসা’ নামে প্রথম অ্যালব্যাম বের করেন। একে একে বের হয় ‘তৃতীয় বিশ্ব’, ‘৭১ এর রেঁনেসা’ ও ‘একুশ শতকের রেনেসাঁ’। যদিও, ২০০৪ সালের পর থেকে তাঁদের নতুন কোনো আর অ্যালবাম বের হয়নি। ২০১৮ সালে নতুন অ্যালবাম করার গুঞ্জন উঠলেও সেই ব্যাপারে নতুন কোনো ‘আপডেট’ পাওয়া যায়নি।

রেনেসাঁর প্রথম অ্যালবামের কভার

রেঁনেসা জ্যাজ-রেগে ফিউশন ধারার গানের জন্য বিখ্যাত ছিল। ভিন্ন রকমের লিরিকসের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। লোকে মজা করে বলতো ‘বুড়োদের ব্যান্ড’। এখানে নকীবের সাথে আরো আছেন রেজাউর রহমান, ইমরান রহমান, কাজী হাবলু ও কার্তিক। বয়স বাড়লেও তাঁরা যেন চীরতরুণ!

‘ভালো লাগে জোছনা রাতে, মেঘ হয়ে আকাশে ভাসতে’ – রেঁনেসা ব্যান্ডের এক অপূর্ব সৃষ্টি, যেই গানের মূল কারিগর তিনিই। এছাড়া রয়েছে ‘আচ্ছা কেন মানুষ গুলো’, ‘তুমি কি আজ বন্ধু যাবে আমারই সাথে’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘তুমি এলে পায়ে পায়ে’-সহ বেশ সংখ্যক গান।

নকীব খানের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৮ মার্চ। তিনি চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর বাবা হলেন আইয়ুব খান। এই পরিবার বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে নকীব-সহ মোট তিনজন কিংবদন্তি উপহার দিয়েছে। বাকি দু’জন হলেন নকীবেরই দুই ভাই জিল্লু ও পিলু।

সুরকার ও গীতিকার জালাল উদ্দিন খান জিল্লু হলেন নকীবের বড় ভাই। ছোট ভাই শাহবাজ খান পিলু ড্রামার, ভোকালিষ্ট ও গীতিকার হিসেবেও খ্যাতিমান। জিল্লু এক সময় জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ব্যালাড’-এর সদস্য ছিলেন। তিনি একটা সময় সঙ্গীতের ভূবনে খুব পরিচিত একজন মানুষ ছিলেন। আর পিলু আছেন রেনেসাঁতেই।

গানের জগতের বাইরে ব্যক্তিজীবনেও নকীব খান বেশ সফল। নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেডে তিনি বড় পদে চাকরী করেন। এর ফাঁকে ফাঁকেই চলে গানের চর্চা, কখনো কখনো স্টেজ শো। ব্যান্ডটির সব সদস্যই আসলে এমন। প্রত্যেকেই সিরিয়াস চাকরী করেন, এর ফাঁকে ফাঁকে সময় বের করে গানবাজনা করেন। হয়তো এই কারণেই রেঁনেসা ব্যান্ড একালে আর খুব বেশি জনপ্রিয় নয়, আবার ভিন্ন ভাবে বললে বলা যায় ব্যান্ডটি কখনোই আলোচনা থেকে হারিয়ে যায়নি।

১৯৮৫ সাল থেকে শুরু করে আজ অবধি এই ব্যান্ডে বড় রকমের কোনো ভাঙন ধরেননি। তাই তো আজো কোনো কনসার্টে বা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে নকীবের পেছনের মুখগুলো একই থাকে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।