বাংলাদেশের ব্যান্ড ভূবন, একনায়কতন্ত্র ও এলআরবি

ব্যান্ড সঙ্গীতের ভূবনটাই এমন। এখানে ভাঙা গড়া চলবেই। এই কথাটা বহির্বিশ্বে যেমন সত্যি, বাংলাদেশেও তাই। ব্যান্ড সঙ্গীতের ফিলোসফি বলে, এখানে যার যেমন ভূমিকাই থাকুক না কেন, দলে সবাই সমান। হ্যা, কিছু টেকনিক্যাল কাজ সামলানোর জন্য লিডার বা ম্যানেজার থাকেন কেউ না কেউ, কিন্তু সেটা এক্ষেত্রে তাঁর বাড়তি কাজ। গানের ব্যাপারে বা বলা ভাল এখানে কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাবেন না, বরং একজন আরেকজনকে পূর্ণতা দেবেন। এখানে কারোই নেতা বা একনায়ক হওয়ার সুযোগ নেই।

সেদিক থেকে আইয়ুব বাচ্চু ব্যতিক্রম। তিনি এলআরবিতে ছিলেন সর্বেসর্বা। এলআরবিতে তিনি বাদে খুব কিংবদন্তিতুল্য কোনো মুখ নেই। টুটুল ছিলেন একটা সময়, এখন তিনিও নেই। এর বাদে স্বপন খুব যোগ্য লোক, তবে তিনি খুব বিখ্যাত কেউ নন। ফলে, আইয়ুব বাচ্চু চলে যাওয়ার পর কে? – এই প্রশ্নে বিতর্ক হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। খুবই আনন্দের ব্যাপার যে ব্যান্ড মিউজিকের ফিলোসফি মেনেই বাচ্চুর পরিবার ও তাঁর সতীর্থরা একটা সমঝোতায় আসতে পেরেছেন।

বাচ্চু এলআরবিতে ছিলেন একনায়ক। কথাটা জেমসের ক্ষেত্রেও খাটে। জেমস ‘ফিলিংস’-এ ছিলেন যখন তখনও তিনি সবাইকে ছাপিয়ে বড় তারকা ছিলেন, এখন যখন ‘নগর বাউল’-এ আছেন, তখনও তার পাশে দাঁড়িয়েই যারা বাজায় তাদের কেউ চেনে না বললেই চলে। তবে, এলআরবি’র মত নগর বাউল একটা ব্যান্ড হিসেবে ততটা ব্র্যান্ড ভ্যালু দাবী করে না। তাই, জেমস কখনো নগর বাউল ছাড়লেও উত্তরসূরী খুঁজতে এলআরবির মত জলঘোলা হবে না।

যেমনটা হয়েছিল ‘শিরোনামহীন’-এর ক্ষেত্রে। তানযীর তুহীনকে অনেকটা বাদ দিয়ে শেখ ইশতিয়াককে দলে নেওয়াটা ভক্তদের একটা পক্ষ কখনোই ভাল চোখে দেখেনি।

‘মাইলস’ ব্যান্ডেও এমন সংকট এসেছিল। অধুনা রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া শাফিন আহমেদ ব্যান্ড ছেড়ে দিয়ে আলাদা ব্যান্ড গড়েছিলেন। তখন কিছুদিন শাফিনের ভাই হামিন আহমেদই গান গাইতেন। কিন্তু, পরে অবশ্য তারা ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে এক হয়ে যান।

ব্যান্ড হল একটা রিলে রেসের মত। এখানে কোনো কিছুর জন্যই গানবাজনা থেমে থাকবে না। হয়তো ব্যাটন একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে যাবে, ব্যাস। এই চর্চাটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়।

এখানে প্রথমের বলা দরকার ‘সোলস’-এর কথা। ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের কিছু তরুণ সাজিদ, লুলু, নেওয়াজ, রনি বড়ুয়া ও তাজু মিলে বিদেশি গানের দলের অনুকরণে গানের একটি দল গঠন করে। যার নাম দেয় ‘সুরেলা’। পরের বছরই নামটি বদলিয়ে রাখা হয় সোলস।

সোলস

সে বছর শেষের দিকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য লুলু ব্যান্ড ত্যাগ করার আগেই যোগ দেন নকীব খান। পূর্বে নকীব খান দলে যোগ দেন। তিনি পরে ‘সোলস’ ছেড়ে দিয়ে ‘রেনেসাঁ’ ব্যান্ড এর প্রতিষ্ঠা করেন। তার সাথেই ফিডব্যাক ছেড়ে চলে যান তারই ভাই পীলু খান। একই সময়ে তপন চৌধুরী এসেছিলেন, তিনিও চলে গেছেন।

তখন সোলস শুধু চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। এরই মধ্য ১৯৭৭ সালে ব্যান্ড এ যোগ দেয় আরেক তরুণ নাসিম আলী খান। এর পরের বছর মানে, ১৯৭৮ সালে যোগ দেন আইয়ুব বাচ্চু। ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে যোগ দেন কুমার বিশ্বজিৎ। কালক্রমে ব্যান্ডটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন কুমার বিশ্বজিৎ ও বাচ্চু। বাচ্চু বের হয়ে ‘এলআরবি’র যাত্রা করেন। কুমার বিশ্বজিৎ বাংলা আধুনিক গানের ভূবণে অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

সোলস কিন্তু এখনো টিকে আছে। নাসিম আলী খান ও পার্থ বড়ুয়ারা দিব্যি শো-টো করে বেড়াচ্ছেন, প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। একগাদা তারকার পতনে তাদের ব্যান্ড টিকিয়ে রাখতে কোনো সমস্যা হয়নি।

ফিডব্যাক

৭০-এর দশকেই শুরু হওয়া আরেকটা ব্যান্ড দল হল ‘ফিডব্যাক। ১৯৭৬ সালে ফিডব্যাকে যোগ দেন মাকসুদ। তিনি ১৯৮৭ সাল থেকে ব্যান্ডটির হয়ে বাংলা গান করা শুরু করেন। তাঁর কণ্ঠেই বিখ্যাত ‘মেলায় যাইরে’ গানটা প্রথম রেকর্ড করা হয়।

১৯৯৬ সালের অক্টোবরে ফিডব্যাক ত্যাগ করেন মাকসুদ। গড়ে তোলেন তাঁর নতুন ব্যান্ড ‘মাকসুদ ও ঢাকা’। ফিডব্যাকের সঙ্গীদের মধ্যে এলেন সেকান্দার আহমেদ খোকা। তবে, এরপরও ফুয়াদ নাসের বাবু ও পিয়ারু খানরা গানবাজনা অব্যহত রেখেছেন। ওই যে বলে না – শো মাস্ট গো অন!

বাংলাদেশে মেটাল ঘরানার অন্যতম কাণ্ডারী ওয়ারফেজও কখনো ‘ওয়ান ম্যান শো’-তে পরিণত হয়নি। ব্যান্ডের যাত্রা শুরু ১৯৮৪ সালে। বাবনা, রাসেল, সঞ্জয়, কমল ও টিপু – পাঁচজনই তখন কিশোর। ওই সময়টা সঞ্জয়ের কণ্ঠে যেমন ধরণে গান গাইতেন, সেই হেভি মেটাল কণ্ঠটা আজকের দিনে আর কল্পনা করা যায় না। মাঝে মধ্যে গাইতেন বাবনাও, সৃষ্টি হত অন্যরকম ম্যাজিক।

২৫ বছর পূর্তিতে এক হয়ে শো করেন ওয়ারফেজের সাবেক ও বর্তমানরা।

সঞ্জয় গেলেন, বাবনাও গেলেন। একে একে বালাম, মিজানরা এলেন, তারাও চলে গেলেন। অর্থহীনের সুমনও কিছুদিন ছিলেন ওয়ারফেজে। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্টদের একজন কমল এখন অসুস্থতার কারণে খুব কম কাজ করেন। টিপু এখনো ড্রামে প্রধান ভরসা। ভোকাল হিসেবে এখন আছেন পলাশ। তিনি আগে ছিলেন ‘রেডিওঅ্যাকটিভ’-এ। এত ভাঙা গড়ার পরও ‘ওয়ারফেজ’ নামের ‘ব্র্যান্ড’-এ এক বিন্দু আচড়ও লাগেনি।

ব্যান্ডের কালচারটাই তো এমন। এই কালচারটা তখনই টিকে থাকবে, যখন একটি দলের মধ্যে থেকে কোনো নির্দিষ্ট একজন আলাদা করে তারকা হয়ে গড়ে উঠবেন না, বরং পুরো দলটাই অনেকগুলো তারার একটা মিছিল হবে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।