বাংলাদেশ: পৃথিবীর সবচেয়ে নিরোমিষভোজী দেশ!

শিরোনাম দেখে আমরা অনেকেই হয়ত ভাবছি, আদৌ কি সম্ভব?

ভোজনরসিক বাংলাদেশিরা নাকি নিরামিষভোজী! সকাল দুপুরের খাবার থেকে যেকোন অনুষ্ঠানে খাবারের আয়োজন যেখানে মাংস ছাড়া পরিপূর্ণতা পায় না সেই বাংলাদেশিদের নিরামিষভোজী ট্যাগ আসলেই অবাক করার মত। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে গড়ে প্রতি বছর একজন পূর্ণবয়স্ক বাংলাদেশি মাত্র চার কেজি মাংস খেয়ে থাকে। সম্প্রতি বিখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছ এই বিষ্ময়কর তথ্য।

দৈনিকটিতে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের জাতিসংঘের ‘খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার’ এক সমীক্ষায় বাংলাদেশকে পৃথিবীর নিরামিষভোজী দেশগুলোর তালিকায় প্রথমে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ, ভারত, বুরুন্ডি, শ্রীলংকার সাথে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ যেমন রুয়ান্ডা, মোজাম্বিক, সিয়েরা লিওন প্রভৃতি দেশ তালিকার প্রথমে অবস্থান করছে।

২০ টি দেশ, যারা সবচেয়ে কম মাংস খেয়ে থাকে

১. বাংলাদেশ – ৪ কেজি

২. ভারত – ৪.৪ কেজি

৩. বুরুন্ডি – ৫.২ কেজি

৪. শ্রীলংকা – ৬.৪ কেজি

৫. রুয়ান্ডা – ৬.৫ কেজি

৬. সিয়েরা লিওন – ৭.৩ কেজি

৭. ইরিত্রিয়া – ৭.৭ কেজি

৮. মোজাম্বিক – ৭.৮ কেজি

৯. গাম্বিয়া – ৮.১ কেজি

১০. মালাউই – ৮.৩ কেজি

১১. ইথিওপিয়া – ৮.৫ কেজি

১২. গিনি – ৮.৬ কেজি

১৩. নাইজেরিয়া – ৮.৮ কেজি

১৪. তানজানিয়া – ৯.৬ কেজি

১৫. নেপাল – ৯.৯ কেজি

১৬. লাইবেরিয়া – ১০.৪ কেজি

১৭. উগান্ডা – ১১ কেজি

১৮. ইন্দোনেশিয়া – ১১.৬ কেজি

১৯. টোগো – ১১.৭ কেজি

২০. সোলোমোন আইসল্যান্ড – ১১.৯ কেজি

সমীক্ষায় আরো উঠে এসেছে একজন গড়পড়তা ব্রিটিশ নাগরিক প্রতিবছর প্রায় ৮৪.৫ কেজি মাংস খেয়ে থাকে। আর এই কারণে সবচেয়ে বেশি মাংস খাওয়া দেশের তালিকায় ৩০তম স্থানটি রানী এলিজাবেথের দেশ ইংল্যান্ডের হাতেই আছে।

তবে এই তালিকায় প্রথম অবস্থানে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একজন আমেরিকান প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২০.২ কেজি মাংস খেয়ে থাকে, যা একজন বাংলাদেশির তুলনায় প্রায় ত্রিশগুণ। তবে কেএফসি, পিৎজা হাট, সাবওয়ের মত বিশ্ববিখ্যাত ফুড চেইন কোম্পানিগুলোর জন্ম যেই দেশে সেই দেশের মানুষের মাংসের প্রতি দুর্বলতা থাকাটা স্বাভাবিক নয় কি?

সবচেয়ে বেশি মাংস খাওয়া দেশের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কুয়েত। আশ্চর্যজনকভাবে এর পরেই রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। যদিও বার-বি-কিউ এর জন্য বিখ্যাত এই দেশে মাংসের প্রতি চাহিদা থাকাটা সমীচীন বলেই মনে করা হয়। এর পরের ১০টি স্থান যথাক্রমে বাহামা, লুক্সেমবার্গ, অস্ট্রিয়া, ফরাসি পলিনেশিয়া, বারমুডা, আর্জেন্টিনা এরাই ধরে রেখেছে।

২০ টি দেশ, যারা সবচেয়ে বেশি মাংস খেয়ে থাকে

১. যুক্তরাষ্ট্র – ১২০ কেজি

২. কুয়েত – ১১৯.২ কেজি

৩. অস্ট্রেলিয়া – ১১১.৫ কেজি

৪. বাহামা – ১০৯.৫ কেজি

৫. লুক্সেমবার্গ – ১০৭.৯১ কেজি

৬. নিউজিল্যান্ড – ১০৬.৪ কেজি

৭. অস্ট্রিয়া – ১০২ কেজি

৮. ফরাসি পলিনিশিয়া – ১০১.৯ কেজি

৯. বারমুডা – ১০১.৭ কেজি

১০. আর্জেন্টিনা – ৯৮.৩ কেজি

১১. স্পেন – ৯৭ কেজি

১২. ইসরায়েল – ৯৬ কেজি

১৩. ডেনমার্ক – ৯৫.২ কেজি

১৪. কানাডা – ৯৪.৩ কেজি

১৫. সেন্ট লুসিয়া – ৯৩.৬ কেজি

১৬. পর্তুগাল – ৯৩.৪ কেজি

১৭. সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইন দ্বীপপুঞ্জ -৯১.৪ কেজি

১৮. নেদারল্যান্ডস এন্টিলস – ৯১ কেজি

১৯. ইটালি – ৯০.৭ কেজি

২০. স্লোভেনিয়া – ৮৮.৩ কেজি।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এই সকল মাংসভোজী দেশগুলোর নাগরিকরা তাদের স্থূলকায় শরীরের জন্য বিখ্যাত। এমনকি বিশ্বের স্থূলকায় তথা মোটা মানুষের তালিকায় যুক্তরাজ্য ১২ তম, কুয়েত নকম, বাহামা ১০ম, নিউজিল্যান্ড ২৪তম এবং অস্ট্রেলিয়া ২৬তম অবস্থানে রয়েছে।

কিন্তু নিরামিষভোজীরা নিজেদের কিছুটা সান্ত্বনা দিতে পারবে এই ভেবে যে পৃথিবীতে দিন দিন মাংসভোজী তথা মাংস খাওয়ার লোকের সংখ্যা কমতে শুরু করছে। উপরে উল্লেখিত দেশসমূহ যারা মাংসভোজী হিসেবে প্রসিদ্ধ তেমন অনেক দেশে মাংসভোজী মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমতে কমতে প্রায় অর্ধেকে চলে এসেছে।

সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ২০০২-২০০৯ সালের ব্যবধানে আমেরিকানদের মাংস খাওয়ার পরিমাণ ১২৪.৮ কেজি থেকে কমে ১২০.২ কেজিতে নেমে এসেছে। লুক্সেমবার্গে ১৪৭.৯ কেজি থেকে কমে ১০৭.৯কেজিতে এসে দাঁড়িয়েছে। নিউজিল্যান্ডে ১৪২.১ কেজি থেকে ১০৬.৭ কেজিতে এবং সব থেকে বেশি মাংসভোজী নাগরিকের দেশ ডেনমার্কে এই সংখ্যা ১৪৫.৯ কেজি থেকে কমে ৯৫.২ কেজিতে এসে দাঁড়িয়েছে।

পৃথিবীর কোন অংশের মানুষ কি পরিমান মাংস খায়

শহুরে সংস্কৃতিতে পিৎজা, বার্গার, চিকেন ফ্রাইয়ের মত ফাস্টফুডের চাহিদা ক্রমবর্ধমান থাকার কারনে মাংসের প্রতি চাহিদা শহর এলাকায় ক্রমবর্ধমান। কিন্তু আজো গ্রাম-বাংলার মানুষ শাক-সবজির উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

একথা অনস্বীকার্য যে আমিষ তথা মাংস শরীরের সার্বিক পুষ্টিসাধনে প্রচুর ভূমিকা রাখে। একজন মানুষের সার্বিক পুষ্টিসাধনে দৈনিক ২১-২৪ গ্রাম মাংস তথা আমিষজাতীয় খাদ্যের প্রয়োজন, যা বছরে হিসাব করলে প্রায় ৭.৫ কেজি থেকে ৮.৬ কেজি হয়।

এই পরিসংখ্যান বলতে পারি এই দেশের মানুষ এখনো আমিষের চাহিদাপূরণে মাংসের ব্যবহারে পিছিয়ে আছে অনেকটাই।আর্থিক সামর্থ্য এই ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা বলে মনে করা হয়। কিন্তু এই কথাও ভুললে চলবে না যে মাংসের অত্যধিক ব্যবহার বিশেষ করে রেড মিট ডায়াবেটিস, হৃদরোগের মত রোগের অন্যতম কারণ। তাই এই সমীক্ষা এই দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসূচকে আশানুরূপ সবুজ সংকেত বলেও ধরা যায়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।