বাংলাদেশ বিশ্বকাপ স্কোয়াড: ১১ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করা হয়েছে আজ। দল পাবার পর থেকেই বিভিন্ন মানুষের মতামত দেখতে পাচ্ছি। তার পর থেকেই মাথায় বিভিন্ন প্রশ্ন ঘুরছে। সেগুলো সংকলিত করে একটা ‘FAQ’ বানানোর উদ্যোগ নিলাম। তাছাড়া একজন ক্রিকেট পর্যবেক্ষক হিসেবেও ভেতর থেকে তাড়না বোধ করছিলাম।

প্রশ্ন ১: কেমন হলো বিশ্বকাপ স্কোয়াড?

ব্যাখ্যা: আমি একটু পেছন থেকে শুরু করতে চাই। এবারের বিশ্বকাপ ফরম্যাট ইতিহাসের বাকি আসরগুলো থেকে আলাদা। ফ্রাঞ্চাইজি লীগগুলোর আদলে প্রত্যেক দল একে অপরের বিপক্ষে খেলবে, যে কারণে এবারই সর্বাধিক ৯ টি করে ম্যাচ পাচ্ছে প্রতিটি দল।

ফরম্যাটের কারণে অন্যান্য আসরগুলোতে ২-১টা ম্যাচে আপসেট ঘটিয়ে র‍্যাংকিংয়ের পেছনের কোনো দল কোয়ার্টার বা সেমিফাইনালেও চলে যেতে পারতো। এদের আমরা বলতাম ডার্কহর্স। অন্যদিকে সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কলাপ্স করে বিদায় নিতো।

কিন্তু ৯ টি ম্যাচ হওয়ার কারণে ডার্ক হর্স পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই দেখা যাচ্ছে না। যে কারণে টেস্টে আপসেট ঘটে খুবই কম, এবং টি২০ তে আপসেট শব্দটাই নেই; ফ্যাক্টরটা হলো ধারাবাহিকতা।

অল্প সময়ের ব্যবধানে ৯ টি ম্যাচ খেলা ফিটনেস আর টেম্পারমেন্টের বড়ো পরীক্ষা নেবে।

এই ফরম্যাটের কথা অনেকদিন আগে থেকেই ঘোষিত হয়ে ছিল। কিন্তু ফরম্যাটের চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য যে দূরদর্শীতা থাকা উচিত ছিল বিসিবি তা দেখাতে পারেনি। তারা ৩০ জনের একটা খেলোয়াড় পুল তৈরি করেছিলো, উচিত ছিল পুলের অন্তত ২৫ জনকে রোটেশন ভিত্তিতে বিভিন্ন সিরিজে খেলানো, যাতে প্রত্যেকেই তৈরি থাকে এবং পজিশনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা থাকে৷ উলটো ২০১৮ থেকেই বিসিবি অতি রক্ষণাত্মক নীতি নিয়ে ১৬-১৭ জন খেলোয়াড় নিয়েই মজে ছিল।

২০১৮ এর শুরুতে ইনজুরিতে পড়েন সাকিব, বছরজুড়ে সেটি ভোগাচ্ছে তাকে। মাশরাফির ছোটখাটো ইনজুরি সমস্যা থাকেই প্রায়। এশিয়া কাপেই বোঝা গেছে মুস্তাফিজের ফিটনেস কেমন নাজুক। মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ, রুবেল, তামিম এর ইনজুরির খবর জেনেছি আমরা। ১৫ জনের ৭ জনই ইনজুরিপ্রবণ।

সেই অনুপাতে রিপ্লসমেন্ট আছে? নেই। আমরা যদি ৮ জন ব্যাক আপ প্লেয়ার প্রস্তুত রাখতে চাই কারা তারা? রাব্বি, নাঈম, শফিউল, ইমরুল, এনামুল, মুমিনুল। ৮ পূরণ হলো না কিন্তু। যে ৬ জন আছে এদের মধ্যে রাব্বির এখনো অভিষেকই হয়নি, নাঈম টেস্ট খেলেছে, ওয়ানডেতে সুযোগ পায়নি। এনামুল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পর আর দলে আসেনি; শফিউল সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছে অনেক দিন আগে। মুমিনুল এশিয়া কাপের পর থেকেই বাইরে। একমাত্র ইমরুলই দলের সাথে ছিল।

পর্যাপ্ত প্লেয়ার প্রস্তুত না করার মাশুল দিতে হতে পারে।

এই ফ্যাক্টটা বাদ দিলে এবারের দলটা সময়ের উপযুক্ততম দলই বলা যায়। একমাত্র চমক বলবো আবু জায়েদের অন্তর্ভুক্তি। আয়ারল্যান্ড টুর্নামেন্টে মুস্তাফিজ আর তাকে রোটেশন করিয়ে খেলানো উচিত। তাতে সে ২টি ম্যাচ পাবে, এবং বিশ্বকাপের আগেই আন্তর্জাতিক এক্সপোজার পেয়ে মানিয়ে নিতে পারবে। একই কথা প্রযোজ্য রাব্বির ক্ষেত্রেও। মিথুন আর সাব্বিরের সাথে রোটেশন করিয়ে তাকে ২ ম্যাচ দেখা যেতে পারে। মাহমুদুল্লাহ, মুশফিক, তামিম ৩ জনকেই বাই রোটেশন ১ ম্যাচ বিশ্রাম দিলে মোসাদ্দেক সবগুলো ম্যাচে খেলার সুযোগ পাবে। দুর্বল আয়ারল্যান্ড আর ভগ্নশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথেও যদি এক্সপেরিমেন্ট করতে ভয় পেতে হয়, তাহলে ১৯৯৯ এর আসর, যেটি বসেছিলো ইংল্যান্ডে, সেই সময়ের বাংলাদেশ ২০ বছর পরেও একই জায়গায় রয়ে গেছে আসলে।

প্রশ্ন ২: ইমরুল কায়েস কেন দলে নেই?

ব্যাখ্যা: আমরা যদি ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিকে স্যাম্পল হিসেবে নিই, বাংলাদেশ তাদের ৩ টি ম্যাচের ১টিতে অবলীলায় হেরে গেছে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা নিতান্তই সৌভাগ্যক্রমে পণ্ড হয়েছে, সেখান থেকে পাওয়া পয়েন্ট আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়- সাদাচোখে দেখলে মাত্র ১ ম্যাচ জিতেই সেমিতে খেলেছে।

কিন্তু ৯ ম্যাচের লম্বা দৌড়ে এই সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আফগানিস্তান আর শ্রীলংকার বিপক্ষে জিতবে; ওয়েস্ট ইন্ডিজের হিটারদের ডে অফ গেলে তাদের হারানোও খুব সম্ভব। সর্বশেষ খেলা ৪ ওয়ানডের প্রতিটিতেই পাকিস্তানকে হারিয়েছে এই পরিসংখ্যান হয়তোবা তাদের বিপক্ষে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দেবে।

গাণিতিকভাবে যদি ধরেও নেই ৪ টি ম্যাচে জিতবে, তবু কোয়ালিফায়ার খেলতে তাদের আরো ১ টি জয় এবং বৃষ্টির বদৌলতে পয়েন্ট পেতে হবে৷ সেজন্য রেসিপি একটাই- মরণকামড় দেয়া- হয় ছক্কা নয় অক্কা নীতি নেয়া। এক্ষেত্রে তামিম ইকবাল হলো এক্স ফ্যাক্টর। ভারতের জন্য কোহলি যতোটা বাংলাদেশের জন্য তামিমের উইকেটের মূল্য তার চাইতেও বেশি।

আমরা দেখেছি তামিম তার ব্যাটিং এপ্রোচ বদলে ফেলেছেন। নিজের উইকেটকে সংহত করে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রক্ষণাত্মক থাকেন। ৩ এ যদি সাকিব খেলেন, তিনি মূলত স্ট্রাইক রোটেট করে খেলবেন। এই ২ অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের মাঝখানে একজনকে নিয়ে বাজি খেলবে ম্যানেজমেন্ট, যে পাওয়ার প্লে এর এডভান্টেজ নিতে চেষ্টা করবে। ইমরুল সেই ক্যাটেগরিতে পড়েন না। তিনি প্রথাগত ওপেনার।

ফলে একাদশে খেলতে হলে তাকে তামিমের জায়গা নিতে হবে। ইনজুরি বা অন্য কোনো অক্রিকেটিয় কারণ ব্যতীত একাদশ থেকে তামিমের বাদ পড়ার কারণ নেই, আর যদি পড়েন, এবারের আসর ২০০৩ এর চাইতেও ভয়াবহ হবে। একজন খেলোয়াড় স্কোয়াডে থাকা মানে তাকে যে কোনো ম্যাচে একাদশে রাখা হতে পারে সেই সম্ভাব্যতা মাথায় রাখা।

কিন্তু ইমরুল যেহেতু কোনো ম্যাচেই একাদশে ঢোকার প্রেক্ষাপট নেই, তার মতো একজন সিনিয়র ক্রিকেটারকে শুধু শুধু বসিয়ে রাখা যায় না। এশিয়া কাপে কিংবা জিম্বাবুইয়ে সিরিজে তাকে খেলানো হয়েছিলো তামিম না থাকায়। জিম্বাবুইয়ে সিরিজের সাফল্যে দলে তার রোল রিডিফাইন করার উদ্যোগ নেয়া হয় ৩ নম্বর পজিশনে খেলিয়ে। কিন্তু মিরপুরের স্লো-লো বাউন্সি পিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে থমাসের বিপক্ষে তার ব্যাটিং এপ্রোচ দেখে টিম ম্যানেজমেন্ট উপলব্ধি করে এই রোলে তিনি মানানসই নন।

প্রশ্ন ৩: লিটন বা সৌম্য কেন দলে?

ব্যাখ্যা: লিটন যেরকম অধারাবাহিক তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে মূলত নিদহাস ট্রফিতে শ্রীলংকার বিপক্ষে ২১৫ চেজ করতে নেমে দ্রুত ৪১+ রানের ইনিংস, আর এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের বোলিংকে উড়িয়ে দিয়ে করা ১২১ রান। ফাইনাল ম্যাচের প্রেসার যে এভাবে নিতে পারে কিংবা২০ ওভারে ২১৫ চেজ করতে গিয়ে যে তুলোধুনো করতে পারে বাজি ধরতে হলে এমন কারো উপরই ধরা উচিত। জিম্বাবুইয়ে সিরিজ দিয়ে সৌম্য যেভাবে ফিরে এসেছে তারপর থেকে তার খেলায় ব্যাপক পরিবর্তন। বিপিএল এ ফ্লপ করলেও আন্তর্জাতিক আঙ্গিনায় তিনি ছন্দেই আছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শেষ ওয়ানডে, নিউজিল্যান্ড সফরের প্রথম ওয়ানডেতে যেভাবে ব্যাটিং করেছেন, দল আসলে এরকম কুইক ফায়ারই প্রত্যাশা করে। সৌম্য কুইক ফায়ার শেষেই নিভে যান, লিটন ফায়ারিংয়ের পূর্বেই নিভে যান বেশিরভাগ ম্যাচে। এটাই সমস্যা। কিন্তু দল থেকে যদি বলা হয় তুমি রান যা-ই করো, স্ট্রাইকরেট ১০১+ চাই,সেটাই তাদের আইডিয়াল গেমপ্ল্যান হতে পারে। বাংলাদেশ যদি সম্ভাব্য ৩টি জয়ের বাইরে আরো ২টি জয়ের আশা করে সেটা ওই ২ জনের ১ জনের ফ্লুক ইনিংসের আশাতেই। ৯ ম্যাচের একটাতেও তারা যদি সেটা না পারে নিশ্চিত করে বলা যায় বিশ্বকাপ শেষে লিটন বাদ পড়বেই।

প্রশ্ন ৪: এখনো ওয়ানডে অভিষেক না হওয়া স্বল্পগতির রাহী কেন বিশ্বকাপ দলে?

ব্যাখ্যা: নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে রাহীর বোলিং বাংলাদেশের মানদণ্ডে আশাব্যঞ্জক ছিল। সুইং করিয়েছেন যথেষ্ট পরিমাণে। ভারতের ভুবনেশ্বর কুমার স্বল্পগতি নিয়েও সুইংয়ের কারণে ইংল্যান্ডের মাটিতে সাফল্য পান, এটা হয়তোবা রাহীর অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।

বিকল্প অপশন হিসেবে যারা ছিল ( শফিউল, আবু হায়দার, খালেদ) তাদের মধ্যে আবু হায়দার টি-টোয়েন্টি গুলোতে পাওয়া সুযোগ লুফে নিতে পারেননি, খালেদের বোলিংয়ে সুইং কম; জোর প্রতিদ্বন্দ্বী শফিউল। তাকে যেহেতু অতীতে সুযোগ দেয়া হয়েছিলো, এবং খুব বেশি মনে দাগ কাটার মতো কিছু দেখাতে পারেননি, এবং সর্বোপরি বেশিরভাগ ম্যাচেই যেহেতু রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকতে হবে, তাই ফ্রেশব্লাড কাউকে নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে চেয়েছেন।

প্রশ্ন ৫: ইয়াসির কে না রেখে মোসাদ্দেককে নিলো কেন?

ব্যাখ্যা: এটা ব্যালেন্সিং; বোর্ড প্রেসিডেন্টের কথা থেকেই পরিষ্কার বাংলাদেশ আসলে আয়ারল্যান্ড সিরিজটাকে দল গঠনের মূল মঞ্চ হিসেবে নিয়েছে, আজকের দলটা নিছকই ফরমালিটি। কোনো কারণে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে দলে বেশ কয়েকটি পজিশনে পরিবর্তন আসবে। রাব্বি অন্তত ১টি ম্যাচে সুযোগ পাবে, যদি সেটায় দল বিপর্যয়ে থাকে এবং রাব্বি ৪৩+ ইনিংস খেলে, তিনি স্কোয়াডে যুক্ত হবেন।

মোসাদ্দেক অন্তত ২টি ম্যাচ খেলবেন, এর মধ্যে ব্যাটিং-বোলিংয়ে কিছু দেখাতে না পারলে জায়গা হারাতে পারেন। মিথুন আর লিটন উইকেট কিপিং অপশন হিসেবেও প্রায়োরিটি পাবেন, কিন্তু রাব্বি-মোসাদ্দেক ২ জনই সুযোগ কাজে লাগালে এবং লিটন-মিথুন তাদের পাওয়া সুযোগগুলো ব্যর্থ করে দিলে একজনকে বাদ পড়তে হবে। এমনকি সোস্যাল মিডিয়া আর প্রিন্ট মিডিয়ার মরাকান্নায় ওয়াইল্ড কার্ড এন্ট্রি পেতে পারেন ইমরুল কায়েস। ফলে লিটন-মিথুন-মোসাদ্দেক-রাব্বি-ইমরুল এই ৫ জন মিলে ২টি পজিশনের জন্য ক্লাইমেক্স তৈরি করবেন ধারণা করছি।

প্রশ্ন ৬: মিরাজ আর সাইফুদ্দিন এর মধ্যে কে প্রথম একাদশে সুযোগ পাবেন?

ব্যাখ্যা: বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বিস্মরণযোগ্য হতে পারে যে ৪ টি কারণে তার শীর্ষে থাকবে মিরাজ আর সাইফুদ্দিনকে একসাথে একাদশে খেলানো। কোনো এক অদ্ভুত কারণে ওয়ানডেতে মিরাজ অটোচয়েজ, কোচের মুগ্ধতার কারণে সাইফুদ্দিনও তাই। সাইফুদ্দিন ঠেকনা দেয়ার মতো ব্যাট করতে জানেন, বয়সভিত্তিক দলে মিরাজ জেনুইন ব্যাটসম্যান ছিলেন। এই দুটো তথ্য তাদের দুজনকেই একাদশে রেখে দেয়, তাতে ৯ জন ব্যাটসম্যান হয় একাদশে। বাংলাদেশের ব্যাটিং যেহেতু অতি ভঙ্গুর, যত বেশি ব্যাটসম্যান রাখা হবে, শত বিপর্যয়ের মধ্যেও কেউ না কেউ পার্টনারশিপ গড়ে স্কোরটাকে ২২৩+ নিয়ে যাবেন, তারপর বোলিংয়ে নেমে মিরাকলের মতো সেটা ডিফেন্ড করবে দল। এই কৌশলে ৫ টার মধ্যে ১ টা ম্যাচও যদি জেতা যায়, মন্দ কী। কিন্তু তাতে করে দলের বোলিং হয়ে পড়বে নখদন্তহীন; কোনো থ্রেট বোলার থাকবে না। এটাই ম্যাচ হারিয়ে দেবে। সাব্বিরের ফিল্ডিং এবং নিউজিল্যান্ড সফরে রান করাটা একাদশে তাকে নিশ্চিত করেছে, সেই সাথে তাকে ঘিরে রচিত বিগ হিটিং মিথ তো রয়েছেই। সাইফুদ্দিন আর মিরাজ ২ জনই খেললে সাব্বিরের জায়গায় একজনের নামা উচিত, কিন্তু দুজনের কারো ব্যাটিংই জেনুইন ব্যাটসম্যানসুলভ না হওয়ায় ৭ এ তাদের ভাবা হয় না। সাইফুদ্দিন আর মিরাজ এর মধ্যে মিরাজকে খেলানো উচিত বোলিংয়ে বৈচিত্র আনতে। মাহমুদুল্লাহ ইনজুরির কারণে বোলিংয়ে সার্ভিস দিতে পারবে না, সাব্বিরের বোলিং চলে না, স্পিনার বলতে থাকে কেবল, বোলিং তখন খুবই প্রেডিক্টেবল আর ওয়ান-ডিরেকশনাল হয়ে যায়।

প্রশ্ন ৭: সাইফুদ্দিন, নাকি রুবেল-কাকে সুযোগ দেয়া উচিত?

ব্যাখ্যা: যে কোনো পিচে, যে কোনো কন্ডিশনে রুবেলই বাংলাদেশের একমাত্র পেসার যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ডেথ ওভারে রান বেশি দেয়ার ফলে তার সমস্ত কৃতিত্ব চাপা পড়ে যায় ওই রানগুলোর নিচে। তবু রুবেল যদি ম্যাচের পর ম্যাচ বেশি রান দেয় তার জায়গায় রাহী আসতে পারে, সাইফুদ্দিন কোনোভাবেই নয়। সে একজন স্টক বোলার, যে ৬-৭ ওভার সাপোর্ট দিবে এবং রান কম দেয়ার চেষ্টা করবে।

নিউজিল্যান্ড টিমে এককালে এরকম কিছু মিনি অলরাউন্ডার ছিলো, কিংবা ডেভ হোয়াটমোর উদ্ভাবিত মাল্টি স্কিল্ড প্লেয়ার ক্যাটেগরিতেও সে পূর্ণরূপে ফিট করে যায়। কিন্তু জেনুইন বোলার হিসেবে তাকে খেলানো মানেই ম্যাচ জয়ের পথে প্রথমেই ডিফেন্সিভ মোডে চলে যাওয়া। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের গলার কাঁটা হওয়ার বড়ো আশংকা সাইফুদ্দিনকে ঘিরে রয়েছে অনুমান করি।

প্রশ্ন ৮: সাকিবের ম্যাচ প্র‍্যাকটিসের অভাব কোনো ফ্যাক্টর হতে পারে কিনা?

ব্যাখ্যা: সাকিব নিজের পারফরম্যান্সের একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এটাও মনে রাখা দরকার তার বয়স হয়েছে, পারফরম্যান্সে তার প্রভাব পড়তেই পারে। কিন্তু বাহ্যিকভাবে সেটা বোঝা যাবে না, কারণ সাকিবের মিডিওকর পারফরম্যান্সও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গড়পড়তার অনেক উপরে থাকে, তুলনাটা নিজের সেটকৃত মানদণ্ডে হলেই কেবল তার অবনমনটা বোধগম্য হতে পারে। তবে বাংলাদেশ যদি নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা আর অস্ট্রেলিয়া- এই ৩ দলের কোনো একটিকে হারাতে চায়, তবে সাকিবকে অবশ্যই ২০১২-১৫ সময়ের সাকিবে ফিরে যেতে হবে।

প্রশ্ন ৯: ভারত বা ইংল্যান্ডের সাথে জেতার কি কোনোই সুযোগ নেই?

ব্যাখ্যা: তামিম আর রুবেলের অতিমানবীয় কোনো পারফরম্যান্সে ইংল্যান্ডকে হারানো খুবই সম্ভব। ইংল্যান্ডের টপ অর্ডারই মূলত ম্যাচ থেকে বারবার ছিটকে দেয় আমাদের।তবে তাদের ব্যাটিং হুটহাট কলাপ্স করে, একমাত্র এটাই আশার কথা।

২০১৫ এর হোম সিরিজের পর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডেতে আর জেতাই হয়নি, ২টি নিশ্চিত জেতা টি২০ হেরেছি নার্ভাস ব্রেকডাউনের কারণে। লিটন বা সৌম্য যদি উড়াধুরা কোনো ইনিংস খেলতে পারে একমাত্র তাহলেই ক্ষুদ্র সম্ভাবনা থাকতে পারে।

প্রশ্ন ১০: মুস্তাফিজের কাছে প্রত্যাশা কম কেন?

ব্যাখ্যা: মুস্তাফিজের বোলিং একঘেয়ে, স্লো-পিচে তাকে খেলতে বেগ পেতে হলেও ব্যাটিং প্যারাডাইজে তার বোলিং ক্ষুধার্তের সামনে বিরিয়ানী দেয়ার মতো। ২০১৫ তে তিনি যেমন ছিলেন, মধ্যবর্তী ৪ বছরে তেমন কোনো গ্রোথও হয়নি।তবু ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর আফগানিস্তানের বিপক্ষে তার কী-প্লেয়ার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু এই দলের ব্যাটসম্যানরা টেকনিকালের চাইতে পাওয়ার হিটিংয়ে নির্ভরতাপ্রবণ।

প্রশ্ন ১১: সামগ্রীকভাবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নেই কেন মনে হচ্ছে?

ব্যাখ্যা: প্রথম প্রশ্নেই এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। দুটো বড়ো দলের বিপক্ষে জয়, দুটো সমশক্তির বিপক্ষে জয়ের বিপরীতে, পিছিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে হার- এটাই সম্ভবত পারফরম্যান্স কার্ড হতে যাচ্ছে। ধারাবাহিক সাফল্য দেখানোর জন্য যে সলিডারিটির প্রয়োজন সেখানে আমরা যোজন ব্যবধানে পিছয়ে আছি।

ফলে ৪ টি ম্যাচ জয়কেই বিশ্বকাপের চূড়ান্ত সাফল্য ধরা যেতে পারে। ৯৯ তে ২ টি, ২০০৩ এ শূন্যটি, ২০০৭ এ ৩ টি, ২০১১ তে ২ টি, ২০১৫ তে ২ টি – বিশ্বকাপের আসরগুলোতে এটাই জয়ের পরিসংখ্যান আমাদের। দেখা যাক এবার সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে কিনা।

অতিরিক্ত প্রশ্ন- বাংলাদেশ কেন ১৯৯৬ এর শ্রীলঙ্কা হতে পারবে না?

ব্যাখ্যাঃ ইতিপূর্বেই তার ব্যাখ্যা দিয়েছি। এমনকি এটাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ দল মানতেও আপত্তি আছে আমার। আমি এখনো ২০০৭ এর দলটিকেই ইতিহাসের সেরা মনে করি।

সেই দলে রফিকের মতো ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার ছিলো, শাহরিয়ার নাফিসের মতো ওপেনার, ছন্দে থাকা মাশরাফি, চতুর বোলার সৈয়দ রাসেল, আফতাব-আশরাফুলের মতো গেমচেঞ্জার, তামিম-সাকিব-মুশফিকের মতো দুরন্ত তরুণ, রাজ্জাকের মতো এটাকিং বোলার, এই দলে উল্লিখিত পঞ্চপাণ্ডব আর আংশিক রুবেল-মুস্তাফিজ ব্যতীত কী আছে আর?

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।