ফিকশনের মায়াজাল ফ্যাক্টের উত্তাপে পুড়ে ছাড়খার!

বাস্তবতাকে অতিরঞ্জিত করলে মিথ তৈরি হয়। সেই মিথে আরো কড়া রঙ মাখিয়ে মানুষ তার বর্তমানের না পাওয়া ভুলে থাকতে চায়। এই চেষ্টা তাকে আসলেই শান্তি দেয় এবং সে ভুলে যায় যে, মিথের বাইরে তার একটা জীবন আছে, সেই জীবনে দৈনন্দিন টানাপোড়েন আছে, অভাব আছে, ব্যক্তিগত যন্ত্রণা আছে, সামাজিক বাধা আছে এবং আরো পারিপার্শ্বিক জটিলতা আছে।

রঙ মাখানো মিথ মানুষকে আলোড়িত করে। এক ধরনের নেশার ঘোরে মানুষ সেই মিথে মন ডোবায় এবং ভাবতে থাকে সে ভালো আছে। এভাবে নানা অপ্রাপ্তির হতাশা ভুলে মানুষ ভালো থাকে।

এতে দোষের কিছু দেখি না। মানুষের মন বরং এমনই; মানুষের মন ফ্যাক্টের চেয়ে ফিকশনে বেশি মজা পায়। তৃপ্তি পায়। ফ্যাক্টে অনেক কিছু নিজের হাতে থাকে না বা প্রায় সব কিছুই অন্য অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। কিন্তু ফিকশনে নিজের মতো করে ভাবা যায়।

ফিকশনে কল্পনা করা যায় সাব্বির রহমান একের পর এক ছয় মেরে ভারতকে গুঁড়িয়ে দিবে। মুস্তাফিজুর রহমান কাটারের পর কাটারে বিপর্যস্ত করবে পাকিস্তানকে। মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বের ম্যাজিক মলিন করে দেবে অস্ট্রেলিয়াকে, সাকিব আল হাসান একাই ম্লান করে দেবেন ইংল্যান্ডকে।

সমস্যাটা সৃষ্টি হয় তখন, যখন ফ্যাক্ট যে আছে, সেটাই আমরা বেমালুম ভুলে যাই। ফিকশনের মতো বাস্তব গড়া সম্ভব না। কিন্তু কাছাকাছি কিছু হয়তো মানুষের কাছে ধরা দিতে পারে, যদি মানুষ সেটার আশায় ছোটে। সেটার জন্য ক্লান্তিহীন চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

সত্যি কথা হলো, ফিকশনের ঘোরেই হোক আর কিছু যৌক্তিক ফ্যাক্টের কারণেই হোক, আমরা মনে করেছিলাম এই বিশ্বকাপ আমাদের দুহাত ভরে দিবে। বিশ্বকাপের ঠিক আগে, আয়ারল্যান্ডে মাশরাফিদের অপরাজেয় ও লড়াকু উপস্থিতি আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করেছিলো। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো আমাদের দৃঢ় মনোবোলের পালে দিয়েছিলো তীব্র হাওয়া।

বিশ্বকাপের শেষে এসে দেখা গেলো আমরা তলানিতে পড়ে থাকা দলগুলোর চেয়ে সামান্য ভালো! মানে ফিকশনের মায়াজাল ফ্যাক্টের উত্তাপে পুড়ে ছাড়খার!

আমাদের মাশরাফি ছিলেন; বাংলাদেশের ক্রিকেটাকাশে যিনি অবিসংবাদিতভাবে উজ্জ্বলতম তারকা। আমাদের সাকিব ছিলেন, গুণগতমানে যার চেয়ে সেরা ক্রিকেটার এই পৃথিবীতেই তেমন নেই! ভাবা যায়!? আমাদের মুশফিক ছিলেন, পরিশ্রমের শক্তিতে যিনি সামর্থ্যকেও বাড়িয়ে নিতে পারেন। আমাদের মাহমুদউল্লাহ ছিলেন, তামিম ছিলেন; তাদের সবাইকে নিয়ে আমরা পেয়েছিলাম আমাদের ক্রিকেটের ‘সোনালি প্রজন্ম’।

এই ‘সোনালি প্রজন্ম’ ধারণাটা স্রেফ একটা সোশ্যাল ফেনোমেনা। এই ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নতুন একটা শক্তিতে রূপান্তর করেছেন, কিন্তু তা কোনো চূড়ান্ত রূপ নয়। যদিও চূড়ান্ত রূপ ব্যাপারটার কোনো ধ্রুবক সংজ্ঞা নেই। কিন্তু এটা হয়তো ঠিক যে, এই ক্রিকেটারদের কল্যাণে একটা চূড়ান্ত রূপের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই রূপটা আসলে কী, তার কোনো উত্তর নেই। সুতরাং এরাই যে ‘সোনালী প্রজন্ম’- তা বুক ফুলিয়ে বলার সুযোগ কম।

যা হোক, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বিশ্বকাপে কেমন খেলেছে, পয়েন্ট টেবিলে নিজেদের অবস্থানই তা বলে দিচ্ছে। অন্তত বাইরের পৃথিবী বিষয়টিকে এভাবেই দেখবে।

এটা সত্য যে, সাকিবের সুপারন্যাচারাল পারফরম্যান্স আমাদের জন্য দারুণ তৃপ্তিদায়ী ছিলো। মুশফিকের লড়াকু কিছু ইনিংস আমাদের রক্তে প্রত্যাশিত চাঞ্চল্য তৈরি করেছিলো, কিন্তু দিন শেষে তা তুলনীয় হবে কিছু কিছু টিলা জয়ের সাথে, যুদ্ধ জয়ের সাথে নয়।

সবেধন তিন জয় নিয়ে কাল দেশে ফিরবে বাংলাদেশ দল। ক’দিন বাদে আমরা আমরা নতুন কিছু জেতার জন্য চেষ্টা করবো। ক’দিন বাদে আমাদের নিউরনে বিশ্বকাপ ব্যর্থতার স্মৃতি মলিন হয়ে যাবে। এতে কোনো দোষ নেই। এভাবেই তো চলছে, এমনই তো হয়।

কিন্তু কথা হলো মিথ বা ফিকশনের বাইরের যে পৃথিবী, যে পৃথিবীতে ফ্যাক্টই সব, ফিকশন নয়। সেখানে যেনো আমরা কল্পনাশক্তিকে নিয়ন্ত্রিত রাখি। আমরা যেনো এমন কোনো কল্পনার হিরো না বানাই, যার সামর্থ্যে আমাদের কল্পনাকে বাস্তব করার ক্ষমতা নাই। তাহলে অন্তত ঝড়-পরবর্তী পুনর্বাসনের কাজটা সহজ হবে।

একই সাথে যে মিথ আমরা তৈরি করেছি, তা ভাঙাও জরুরি। না হলে মানবমন আবার সেই মিথে ভর করে মিথ্যে স্বপ্নের আল্পনা বুনবে এবং ফ্যাক্টের উত্তাপ এসে পুড়িয়ে দেবে সব মায়াজাল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।