ম্যাচ প্রিভিউ: বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা

কাল বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশের। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ চলাকালে ক্লাস সেভেনে পড়তাম, প্রতিটি ম্যাচই মনোযোগ দিয়ে দেখেছি। ১৬ বছর পর আবারো বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখছি মানিকগঞ্জে বসে, হিউম্যান ল্যাব এ কাজের ব্যস্ততা কম থাকায় এবার অন্যান্য আসরের তুলনায় বেশি ম্যাচ দেখতে পারবো, তবে প্রতি আসরেই বাংলাদেশের ম্যাচ সবগুলোই দেখি।

১৯৯৯ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ অল আউট হয়েছিল মাত্র ১১৬ রানে। সেই সময়ের বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্ট্যান্ডার্ডে এই রানে কেউ আশাহত হয়নি, কিন্তু ২০১৯ এ এসে কোনো ম্যাচে যদি তারা ২২৭ রানেও অল আউট হয় সেটাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখবে নিশ্চিত। মেন্টালি আমরা টাফ নই, প্রায়ই ব্যাটিং কলাপ্স করে, প্রতিপক্ষ বোলার একটা ভালো স্পেল করলে, কিংবা ব্যাটসম্যান একটু অ্যাগ্রেসিভ ব্যাটিং শুরু করলে আমাদের প্লেয়াররা নার্ভের কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে। যেহেতু দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি এটা, নয় ম্যাচের অন্তত দুইটাতে বাংলাদেশের ১৯৩-এর নিচে গুটিয়ে যাওয়ার আশংকাকে অমূলক মনে হচ্ছে না।

সেই সম্ভাব্য দুই ম্যাচের একটা যদি আগামীকালই হয়, বিশ্বকাপটাই এলোপাতাড়ি কাটবে। ২০১১ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে শেওয়াগের সেই ১৭৫ এর দায় মেটাতে হয়েছে ৫৮ আর ৭৮ রানে অল আউট হওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথম ২ ম্যাচের একটাতে জিততেই হবে।

সাউথ আফ্রিকা বললে যে দলটি আমার মাথায় আসে সেখানে ক্যালিস, ডোনাল্ড, গিবস, পোলক, কারস্টেন, ক্লুজনার থাকে, আরেকটু এগিয়ে গেলে পাই স্টেইন, ডি ভিলিয়ার্স। কষ্ট করে আমলা, ডু প্লেসিস, রাবাদা, ডি কককেও সেখানে স্থান দেয়া যায়৷ কিন্তু সাম্প্রতিক ফর্ম, ফিটনেস, ইমপ্যাক্ট বিবেচনায় এটা স্পষ্ট, দিন এগিয়েছে আর দক্ষিণ আফ্রিকা ভয়ঙ্কর থেকে এক সাধারণ মানের দলে পরিণত হয়েছে।

স্টেইন অনেক দিন ধরেই ইনজুরির কারণে আসা-যাওয়ার মধ্যে আছে, বয়সের কারণে বোলিংয়ের ধার কমে গেছে, সর্বোপরি টেস্টের মতো ইফেক্টিভ ওয়ানডেতে তাকে মনে হয়নি কখনো। ফলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের স্টেইন জুঁজু না পেয়ে বসলে সে ম্যাচে বিশেষ ইমপ্যাক্ট রাখতে পারার কথা নয়।

সে তুলনায় রাবাদা আর এনগিদিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলবো। রাবাদার ইয়র্কার আর ফোর্থ স্ট্যাম্প চ্যানেলের ডেলিভারিগুলো বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের টেকনিকাল দুর্বলতার সুযোগ নিবে। আমাদের ব্যাটসম্যানরা ড্রাইভ খেলে জায়গায় দাঁড়িয়ে, যে কারণে নিশ্চিত থাকে না শটটা চার হবে, নাকি গালি- ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে অথবা স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বসবে।

এনগিদির স্লোয়ারে বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তো রয়েছেই। আমি এই বোলার দুজনকেই হুমকি মনে করছি। ইমরান তাহির, ফেলাকায়ো কে নিয়ে বিশেষ সমস্যা বোধ করার কথা নয়, বরং যদি ডুমিনি খেলে তার নিরীহ স্পিনে মুশফিক আর সাকিবের ভালনারেবল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে৷ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আরেকটি মরণঘাতি শট সুইপ; কখনোই কনফিডেন্ট থাকে না শটটাতে চার হবে নাকি লেগবিফোর বা বোল্ড হবে। সুইপের মতো ইফেক্টিভ এক শটে কেন এই অনিশ্চিয়তা এটা একটা ইন্টারেস্টিং গবেষণা টপিক হতে পারে৷

ব্যাটিংয়ে গেম চেঞ্জার ডুপ্লেসি। দক্ষিণ আফ্রিকা যদি আগে ব্যাটিং পায় আমলা, ডিকক এরাও অনেক বড়ো প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে। নতুন আসা ডুসেনের টেম্পারমেন্টও যথেষ্ট ভালো। যদিও ৪৩৪ চেইজ করে জেতা দল সাউথ আফ্রিকা, তবু চেজিং তাদের কুপোকাত করার অন্যতম কৌশল। সুতরাং টসে জিতলে নির্দ্বিধায় ব্যাটিং নিতে হবে।

অনুশীলন ম্যাচে সৌম্য যেভাবে বুমরাহ’র বিপক্ষে স্ট্রাগল করেছে এটা দেখে আশাহত হয়েছি। পেস বোলিং উড়িয়ে দেয়ার জন্য সে-ই আমাদের ট্রাম্পকার্ড, সে এরকম নড়বড়ে হলে একটা ভীতিকর মেসেজ তৈরি হয়। এবারের বিশ্বকাপে সৌম্য নিজেকে একজন তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে সেই আশা রইলো। তামিমের যদিওবা হালকা ইনজুরি রয়েছে, তবু সে খেলবে সম্ভবত। সে না খেললে ম্যাচের অর্ধেক মোমেন্টাম আগেই প্রতিপক্ষের কাছে চলে যাবে।

আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ থেকেই সাকিবের বোলিংয়ে কিছুটা লুজনেস লক্ষ্য করছি, প্রস্তুতি ম্যাচেও তার রেশ ছিল। তবু ব্যাটসমান সাকিবের চাইতে বোলার সাকিবের প্রতি আমার আস্থা অনেক বেশি। সাকিবকে ওপেনিং স্পেলে অথবা প্রথম চেইঞ্জ বোলার হিসেবে দেখতে চাই কালকের ম্যাচে।

হেড কোচ স্টিভ রোডস এর গেইমপ্ল্যান বিশেষ পছন্দ হয় না আমার। তিনি মিরাজ আর সাইফুদ্দিনের ব্যাটিং এবিলিটির কারণে দুজনকেই একাদশে রেখে বোলিংটাকে একেবারেই শিশুতোষ বানিয়ে ফেলেন। যে দলের সাত নম্বর পজিশনে একজন জেনুইন ব্যাটসম্যান খেলানো হয় তারা আট আর নয়ে মিনি অলরাউন্ডার খেলিয়ে কীভাবে বড়ো ম্যাচ জিতবে এটা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি।

হতে পারে আমার অনুমান ভুল। সেই ভুলটা হাতে নাতে দেখতে চাই। মিরাজ আর সাইফুদ্দিনকে একত্রে খেলিয়ে এখনো পর্যন্ত উপরের সারির কোনো দলের বিপক্ষে জয় আসেনি, বিপক্ষ দল পাকিস্তান বা উইন্ডিজের মতো এলোপাতাড়ি ব্যাটিং না করলে আসার সম্ভাবনাও দেখি না৷ তবু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এই পাঁচ দলের বিপক্ষে এক চাকাবিহীন গাড়ি দিয়ে ম্যাচ যদি জেতা যায়, অপেক্ষায় থাকতে দোষ কী!

আমি এটা নিয়ে বিস্তর ভেবেছি। আমাদের জয়গুলো আসে প্রচণ্ড টিমওয়ার্কের জোরে। যে কারণে জেনুইন ব্যাটসম্যান, জেনুইন বোলার, বা জেনুইন অলরাউন্ডার ছাড়া আমরা ম্যাচে ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে পারি না৷ মিনি অলরাউন্ডার দিয়ে আমরা ম্যাচে ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে পারবো তখনই যদি সাত নম্বর পজিশনটা তার জন্য ছেড়ে দিই।

এমনকি আমাদের উইকেটরক্ষকও আগে ব্যাটসম্যান, পরে উইকেটরক্ষক। কিন্তু মিনি অলরাউন্ডার ৮ আর নয়ে আসায় আমরা দু’জন জেনুইন বোলার মিস করি৷ মুস্তাফিজ বাদে আমাদের বোলাররাও এমন আহামরি মানের নয় যে চার জন থ্রেট বোলার নিয়ে পঞ্চম বোলারের কাজটি পার্ট টাইমার দিয়ে চালিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

মিরাজকে ওয়ানডে বোলার হিসেবে আমার তেমন ইফেক্টিভ মনে হয় না, সে কন্ডিশন অনুযায়ী ২-১ ম্যাচে একাদশে থাকতে পারে, অটোচয়েজ হতে হলে তাকে মাহমুদুল্লাহ বা সৌম্যের মতো ব্যাটিং অলরাউন্ডার হতে হবে। সাইফউদ্দিন কাজ চালানোর মতো বোলার, যদি কখনো চার পেস বোলার খেলায় তাহলে সে অস্ট্রেলিয়ার স্টয়নিস বা ভারতের হার্দিক পান্ডিয়ার বোলিং রোল প্লে করতে পারে।

কিন্তু, তাকে খেলতে হচ্ছে স্ট্রাইক বোলার হিসেবে, বড়োজোর ফার্স্ট চেঞ্জ বোলার হিসেবে৷ এই প্লেয়িং রোলের বোলারের কাছ থেকে দলের যা চাহিদা তা সে পূরণে অসমর্থ৷ সে চার বা পাঁচ ইকোনমিতে বোলিং করে দিতে পারবে, কিন্তু ব্রেক থ্রু আশা করাটা অন্যায্য প্রত্যাশা। সাইফুদ্দিন তৃতীয় পেসার হিসেবে খেললে দলে উইকেট টেকিং বোলার থাকে কেবলমাত্র মুস্তাফিজ। এত বড়ো লোড সামাল দেয়া তার পক্ষে অসম্ভব, যেটা তার পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়বে।

পাঁচ জনের মধ্যে দু’জন উইকেট টেকিং বোলার লাগবে, দু’জন ব্যাটসম্যানকে চেপে রাখবে ( মাশরাফি, সাকিব), একজন স্পট বোলিং করবে। দু’জন মিনি অলরাউন্ডার খেলানোতে উইকেট টেকিং বোলার রুবেলের জায়গা হবে না। আজ কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রথম আলো- তিন পত্রিকায় পড়লাম বাংলাদেশ তিন পেসার নিয়ে খেলবে; তৃতীয় পেসার হিসেবে রুবেল নাকি সাইফউদ্দিন এই সিদ্ধান্তে সাইফউদ্দিন এগিয়ে আছে ব্যাটিং সামর্থ্য আর সাম্প্রতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতার সুবাদে!

খুবই হাস্যকর এনালজি। এটা অনেকটা ওপেনিং ব্যাটসম্যান পজিশনে তামিম আর ফজলে রাব্বির মধ্যে ফজলে রাব্বিকে বেছে নেয়া তার বোলিং সামর্থ্যের কারণে। যদি দুজন বোলারের ক্যালিবার একই হয়, তখন যার ব্যাটিং কিছুটা ভালো তাকে জায়গা দেয়া যেতে পারে, কিন্তু ক্যালিবারেই যেখানে তুলনা অযোগ্য পার্থক্য, সেখানে ব্যাটিং সামর্থ্য তো ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না৷ একারণেই বলি ক্রিকেট খেলা আর ক্রিকেট বিশ্লেষণ আর উপলব্ধি করা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। টকশো গুলোতে আমাদের প্রাক্তন ক্রিকেটারদের মতামতগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যায় ক্রিকেট প্রজ্ঞার কি নিদারুণ ঘাটতি, আর হাস্যকর সব এন্টারপ্রেটেশন!

ফলে কোচের এই নেগেটিভ গেমপ্ল্যান টুর্নামেন্টজুড়েই ভুগাবে বাংলাদেশকে। জানি না কত তম ম্যাচে গিয়ে তার আত্মবোধন হবে, তবে যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল৷ এমনিতেই প্লেয়ার বাই প্লেয়ার তুলনা করলে অন্যান্য দলের চাইতে বেশ খানিকটা পিছিয়ে, সেখানে স্পেশালিস্ট প্লেয়ারের বদলে মিনি অলরাউন্ডারের আধিক্য রেসটাকে আরো একপেশে বানিয়ে দেয়।

ম্যাচ প্রেডিকশন

  • বাংলাদেশ আগে ব্যাটিং, তামিম খেলছে এবং সৌম্য ফ্লপ করেনি- এমন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৫৯, দক্ষিণ আফ্রিকা ৪১। বাংলাদেশের স্কোয়াডে দুজন মিনি অলরাউন্ডার। বাংলাদেশ ৪৭, দক্ষিণ আফ্রিকা ৫৩।
  • বাংলাদেশ আগে ব্যাটিং, মুশফিক ৭৯+ স্কোর করেছে, মিডল অর্ডারে ১৭৩+ জুটি হয়েছে, এবং স্কোয়াডে মিনি অলরাউন্ডার মাত্র এক জন৷ বাংলাদেশ ৭১, দক্ষিণ আফ্রিকা ২৯।
  • দক্ষিণ আফ্রিকা আগে ব্যাটিং, বাংলাদেশ দু’জন মিনি অলরাউন্ডার একাদশে রেখেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ৮৩, বাংলাদেশ ১৭। বাংলাদেশ একজন মাত্র মিনি অলরাউন্ডার রেখেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা ৬৭, বাংলাদেশ ৩৩।
  • বাংলাদেশ আগে ব্যাটিং, এবং প্রথম ১১ ওভারে দুই উইকেট পড়ে গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা ৬১, বাংলাদেশ ৩৯।
  • দক্ষিণ আফ্রিকা আগে ব্যাটিং, মুস্তাফিজ প্রথম স্পেলে দু’টি উইকেট তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশ ৫৩, দক্ষিণ আফ্রিকা ৪৭। দুজন মিনি অলরাউন্ডার খেলালে, বাংলাদেশ ৪৯, দক্ষিণ আফ্রিকা ৫১।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।