বাংলাদেশ: আন্ডারডগ? না আন্ডাররেটেড?

বাংলাদেশের জন্য এবারের বিশ্বকাপটা অন্যরকম একটা ব্যাপার হতে যাচ্ছে। কারণ, এবারই প্রথমবারের মত বিশ্ব জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছে দলটি। গেল পাঁচটি বিশ্বকাপে প্রতিবারই ‘আন্ডারডগ’-এর তকমা নিয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ। তবে, এবারই তার ব্যতিক্রম হতে চলেছে সম্ভবত। কে জানে, বিশ্বকাপে সবচেয়ে চমকে দেওয়া দলটি হয়তো মাশরাফিরাই হবে।

  • দলের শক্তিমত্তা

মিডল অর্ডার বাংলাদেশ দলের সবথেকে বড় শক্তি। রয়েছে মুশফিকুর রহিমের মতো আদর্শ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান। সাথে আছে ‘বিগ ম্যাচ প্লেয়ার’ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সাকিব আল হাসান তার ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় মিডল অর্ডারে খেলে আসছেন। তবে এ বিশ্বকাপে তিনি খেলবেন তিন নম্বরে।

এছাড়া রয়েছে মোসাদ্দেক হোসেন এবং সাব্বির রহমানের মতো দুই স্ট্রোক মেকিং ব্যাটসম্যান, ছোটখাটো ইনিংস দিয়ে এরা দলকে বড় সাহায্য করে দিতে পারে। মোহাম্মদ মিঠুনের মতো স্ট্রাইক রোটেট করে খেলা ব্যাটসম্যানও আছে এ পজিশনে। টপাটপ উইকেট পড়লে তার এই সিঙ্গল বের করে খেলা কতটা কার্যকর হয়, সবশেষ এশিয়া কাপে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

লেট মিডল অর্ডারে যেমন মাশরাফি বিন মর্তুজা, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের মতো ছক্কা হাঁকানোর খেলোয়াড় আছেন, তেমনি মেহেদী হাসান মিরাজের মতো চাপ সামলে অবস্থা বুঝে ব্যাট করার মতো খেলোয়াড়ও আছে। টপ অর্ডারের তিনজন যদি কোনোভাবে ১২০ রান তুলে দিতে পারে, এই শক্তিশালী মিডল অর্ডার সেই রানকে ৩০০-৩২০ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে। এবারের ওয়ার্ল্ড কাপের অন্যতম সেরা মিডল অর্ডার হলো বাংলাদেশের।

দ্বিতীয় শক্তিশালী দিক হলো ম্যাচের মিডল অভার এবং ডেথ অভারের বোলিং নিয়ন্ত্রণ। মাশরাফি, সাইফউদ্দিন, সাকিব, মিরাজদের মতো দলে একাধিক বোলার আছে, যারা নিখুঁত লাইন-লেন্থ মেন্টেইন করে একটানা বল করে যেতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ম্যাচটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া যায়।

এছাড়াও মোহাম্মাদ সাইফউদ্দিন ডেথ অভারে ভালো স্লোয়ার এবং ইয়র্কার দিতে পারেন, সাথে রয়েছেন ডেথ অভার স্পেশালিস্ট মুস্তাফিজুর রহমান! স্লোয়ার এবং অফ কাটার মিলিয়ে-মিশিয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানকে বোকা বানাতে তার জুড়ি মেলা ভার। বলা বাহুল্য, ডেথ অভারে বিগত তিন/চার বছরে বাংলাদেশের ইকোনমি সবথেকে ভালো।

  • অভিজ্ঞতা

এবারের আসরে ম্যাচ খেলার দিক থেকে দ্বিতীয় অভিজ্ঞ দল বাংলাদেশ। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা, সহ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, ওপেনার তামিম ইকবাল এবং ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম, এরা সবাই এর আগে দলীয় সর্বোচ্চ তিনটি করে বিশ্বকাপ খেলেছেন। অলরাউন্ডার মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ এবং ফার্স্ট বোলার রুবেল হোসেন খেলেছেন দুটি করে। এছাড়া ওপেনার সৌম্য সরকার এবং ব্যাটসম্যান সাব্বির রহমান খেলেছেন একটি করে বিশ্বকাপ। বাকি সাতজন এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে পা রাখছেন।

  • তুরূপের তাস

অধিনায়কত্বে মাশরাফি বিন মর্তুজার বিচক্ষণতা এই দলের প্রধান ‘এক্স-ফ্যাক্টর’। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তে ক্যাপ্টেন ম্যাশ যদি পাঁচটি বিপজ্জনক ডিসিশন নেন তার তিনটিতেই তিনি সফল হতে পারেন। এছাড়া সঠিক পরিকল্পনা করে, সতীর্থদের মধ্যে উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণার সঞ্চার করে প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।

বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জয় এসেছে তাঁর অধিনায়কত্বে (৪৪ টি)। অধিনায়কত্বের পাশাপাশি তার বোলিং অভিজ্ঞতাও টিমের বেশ কাজে দিবে। এবারের ওয়ার্ল্ড কাপ খেলবেন এমন খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক (প্রথম মালিঙ্গা, তৃতীয় সাকিব)।

অভিজ্ঞতার বিচারে বর্তমান বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ব্যাটিংয়ে ছয় হাজারের কাছাকাছি রান এবং বোলিং প্রায় আড়াইশো উইকেট, সাকিবের মতো এমন অসাধারণ অলরাউন্ডার অতীতে এ পৃথিবী হাতেগোনা কয়েকজনকেই পেয়েছে। বোলিংয়ের দশ অভারের কোটা সবসময় পুরণ করে দিবে, তিন নম্বর পজিশনে ব্যাটসম্যানের অভাব দূর করবে, আবার ফিল্ডিংয়েও নিজের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিবে – এমন জেনুইন অলরাউন্ডার সব দলে থাকে না।

ইংল্যান্ডে এর আগে তিনি বহুবার খেলেছেন, এখানকার কন্ডিশন তিনি ভালোভাবেই জানেন। সবথেকে বড় বিষয় হলো ব্যাটিং হোক বা বোলিং, বাংলাদেশ টিমের গেমপ্ল্যান সাজানো হয় সাকিব আল হাসানকে কেন্দ্র করে। সুতরাং সাকিব তার সেরাটা দেওয়া মানেই প্ল্যান ১০০% সাকসেসফুল হওয়া।

ড্যাসিং ওপেনার তামিম ইকবাল, গড়ের দিক থেকে তিনি বর্তমানে বিশ্বের সেরা ওপেনার। তার সাথে রয়েছে ইনফর্ম সৌম্য সরকার। নিজেদের দিনে এরা দুজন যেকোনো বোলিং লাইনআপকে তুলোধনা করে ছাড়তে পারে। রয়েছেন একজন মুশফিকুর রহিম, তিনিও গড়ের দিক থেকে বর্তমানে সেরা উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। বিশ্লেষকেরা তার মধ্যে একজন আদর্শ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানের গুণাগুণ খুজেঁ পান। তার মতো অতীতে মাত্র পাঁচজন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানকে এবিশ্ব দেখেছে, যারা ওয়ানডে তে পাঁচহাজারি ক্লাবের সদস্য।

রয়েছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো ফিনিশার। আইসিসি ইভেন্টে তার তিনখানা সেঞ্চুরি রয়েছে। দল বিপদে পড়লেই তার ব্যাট কথা বলে। এবারের বিশ্বকাপে তিনি অন্যতম সেরা ফিনিশার।

সবশেষ তুরূপের তাস মুস্তাফিজুর রহমান। বৈচিত্র্যময় স্লোয়ার এবং পাঁচরকমের অফ কাটার দিয়ে তিনি একাই যেকোনো ব্যাটিং লাইনআপকে ধসিয়ে দিতে পারেন। বাঁ-হাতি এই পেসারকে ঠেকাতে এবার প্রতিটা দল আলাদাভাবে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।

  • দূর্বলতা

যথাপযুক্ত এবং গতিশীল স্ট্রাইক বোলার না থাকা এই দলের অন্যতম বড় দূর্বলতা। এবারের আসরে বাংলাদেশই একমাত্র দল যাদের দলে কোনো জেনুইন ফার্স্ট বোলার নেই। প্রতিপক্ষ যদি কোনো পার্টনারশিপ দাঁড় করে ফেলে, সেখানে ব্রেক থ্রু আনতে বাংলাদেশের বোলিং লাইনআপের বেশ বেগ পেতে হয়। রুবেল হোসেন এক্ষেত্রে একজন ভালো অপশন, ১৪৫ কিলোমিটারের আশেপাশে তিনি গতি তুলতে পারেন। তবে তিনি বেশ খরুচে হওয়ায় সবসময় টিমে সুযোগ পাননা।

দ্বিতীয় দূর্বলতা হলো ব্যাটসম্যানের উইকেটে দ্রুত সেট হতে না পারা এবং বড় ইনিংসে অধারাবাহিকতা। প্রায় সময়ই বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে টপাটপ উইকেট পড়তে দেখা যায়। হোক সেটা প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া কিংবা আফগানিস্তান, একসাথে ২-৩ টি উইকেট পড়া ব্যাটিং লাইনআপের একটি চিরায়ত লক্ষণ। পাশাপাশি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলার পর ব্যাটসম্যানরা অতিরিক্ত ভুল শর্ট খেলায় সেই পঞ্চাশ আর একশোতে রুপান্তর হয় না।

দলের প্রায় বেশ কয়েকজনের ছোটবড় ইনজুরি সমস্যা রয়েছে। এটি দূর্বলতা না হলেও দলের জন্য খারাপ সংবাদ বটে। প্রায় দুই মাসের লম্বা সফরে দলের প্রধান পারফর্মাররা ইনজুরিতে পড়লে মানসিকতায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

  • প্রেডিকশন

এবার বাংলাদেশ তাদের সর্বকালের সেরা টিম নিয়ে বিশ্বমঞ্চে পা রাখছে। দলে বিশ্বসেরা ওপেনার আছে, বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার আছে, শীর্ষ উইকেটরক্ষক কাম ব্যাটসম্যান আছে, অন্যতম সেরা ফিনিশার আছে। এর আগে প্রতিবারই আন্ডারডগ হয়ে মাঠে নামায় বাংলাদেশের সাফল্যগুলোকে ‘অঘটন’ বলা হতো।

১৯৯৯ এর বিশ্বকাপে পাকিস্তান বধ, ২০০৭ এর বিশ্বকাপে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা বধ, ২০১১ এবং ২০১৫ এর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বধ এমন কয়েকটি অঘটনের উদাহরণ। তবে এবার এই দলটি যথেষ্ট ভয়ানক হলেও বহির্বিশ্বে এদের নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। তাই এদের আন্ডাররেটেড বলাই শ্রেয়।

বাংলাদেশ এবার যে দল নিয়ে ব্রিটিশ অ্যারেনায় যাচ্ছে, তাতে পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। ভারত শক্তিমত্তায় বেশ এগিয়ে থাকলেও বিগত কয়েকবছরে তাদের বাংলাদেশের সাথে খেলতে গিয়ে নাকের জল-চোখের জল এক হয়েছে। তাই তাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে টিম বাংলাদেশের উচিত হবে পারফরমেন্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কয়েকদিন আগেই তারা তাদের প্রথম ইন্টারন্যাশনাল ট্রফি জয় করেছে, এখন তারা জানে ট্রফি কি করে ছুঁতে হয়। আফগানিস্তান, উইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা অবশ্যই মরণকামড় দিবে, তাদের পরাজিত করতে হবে।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ২রা জুন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। বাংলাদেশ যদি তাদের সেরাটা ঢেলে দিতে পারে, তবে এবার তাদের সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার সামর্থ্য আছে। শুধুমাত্র জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

  • বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক), লিটন কুমার দাস (উইকেটরক্ষক), মোহাম্মাদ মিঠুন, সাব্বির রহমান, সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মাশরাফি বিন মর্তুজা (অধিনায়ক), মেহেদী হাসান মিরাজ, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মুস্তাফিজুর রহমান, রুবেল হোসেন ও আবু জায়েদ রাহী।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।