ইনজুরি তাঁকে প্রস্ফুটিত হতে দেয়নি

মোহাম্মদ শরীফ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ছাড়লেন। করোনার দিন শেষে প্রিমিয়ার লিগ আবার শুরু হলে খেলার চেষ্টা করবেন, যদি কোনোভাবে সুযোগ মেলে। লিগ না হলে, তাঁর খেলোয়াড়ী জীবনের এখানেই ইতি।

বাংলাদেশের বাস্তবতায়, ঘরোয়া ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়া এমন কিছু নয়। কিন্তু শরীফের কাছে এটি হয়তো ছিল জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত। কারণ, ঘরোয়া ক্রিকেট, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট ছিল তার অক্সিজেনের মতো। এতটা উৎসাহ ও নিবেদন দিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে, বাংলাদেশের আর কোনো ক্রিকেটারকে দেখিনি আমি।

তার জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা তো সেই কত বছর আগেই শেষ। তিনিও জানতেন। তবু প্রতিটি ক্রিকেট মৌসুম শুরুর সময় তাঁর মতো রোমাঞ্চিত মনে হয় আর কেউ থাকত না।

বাংলাদেশের কন্ডিশন ও উইকেট, আরও নানা প্রতিকূল বাস্তবতায় পেসাররা বাধ্য হয় বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে। শরীফ এখানেই খুঁজে নিতেন সবচেয়ে বেশি আনন্দ। দিনের পর দিন, ম্যাচের পর ম্যাচ, মৌসুমের পর মৌসুম, বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটের প্রতি তার যে প্যাশন, বাংলাদেশের ক্রিকেটে সেটির তুলনীয় কিছু দেখিনি।

সবচেয়ে ভালো লাগত, ঘরোয়া ক্রিকেট যেভাবে উপভোগ করতেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মতো সিরিয়াসনেস, স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হোক বা লোয়ার অর্ডার, সব উইকেটে বাঁধনহারা উদযাপন, মাঠে-প্র্যাকটিসে-ড্রেসিং রুমে সবসময় প্রাণবন্ত উপস্থিতি, সব মিলিয়ে বোঝা যেত, এসবই তাঁর জীবন।

এসব দেখেই কয়েক বছর আগে তার একটি ইন্টারভিউ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্রিকেটকে প্রচণ্ড ভালোবাসি, ক্রিকেট খেলার মত আনন্দ আর কিছুতে পাই না। জাতীয় দলে নেই বলে কি সেই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করব? নিজেকে তাই এভাবে গড়ে নিয়েছি আমি। ছোট ছোট ব্যাপারগুলিতে খুঁজে নেই বড় আনন্দ। এখনও অনুশীলনে সিরিয়াস থাকি। মাঠে প্রতিটি বলে নিজেকে উজার করে দেই। প্রতিটি উইকেটে এখনও ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেটের মতোই আনন্দ পাই।’

নিবেদনের পুরস্কারও পেয়েছেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর ৩৯৩ উইকেট, ১৫ বার ৫ উইকেট, পেস বোলিংয়ে দুটিই বাংলাদেশের রেকর্ড। তার চেয়ে বেশি ম্যাচও (১৩২) খেলেনি বাংলাদেশের কোনো পেসার। লিস্ট ‘এ’, প্রথম শ্রেণি, দুটিতেই করেছেন হ্যাটট্রিক। ব্যাট হাতেও বরাবরই ছিলেন লড়িয়ে। তিন হাজারের বেশি রান করেছেন। সেঞ্চুরি-ফিফটি তো আছেই, তার অনেক ছোট ছোট ইনিংস বা লড়াই দলকে উদ্ধার করেছে অনেকবার।

এই সময়র ক্রিকেট অনুসারীদের অনেকের জানা নেই, বাংলাদেশের ক্রিকেটে কতটা সম্ভাবনা হয়ে এসেছিলেন শরীফ! ২০০০ সালের নভেম্বরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। তার প্রথম দুই শিকার বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দুই মহীরূহ, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও আকরাম খান। অভিষেকে নিয়েছিলেন চার উইকেট। অভিষেক মৌসুমে ৪৯টি। তখন পত্র-পত্রিকায় দেখতাম, তাকে নিয়ে কত হইচই!

চার মাস পরই টেস্ট অভিষেক। অফিসিয়ালি বয়স ১৫ বছর ১২৮ দিন। তার চেয়ে কম বয়সে টেস্ট খেলেনি ক্রিকেট ইতিহাসে আর কোনো পেসার। বয়স নিয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলা যায় বাংলাদেশের বাস্তবতায়। তবে প্রতিভা নিয়ে সংশয় ছিল না। বিশেষ করে পুরোনো বলে ছিলেন দারুণ কার্যকর। কিন্তু পিঠের ইনজুরিসহ একের পর ইনজুরি তাঁকে প্রস্ফুটিত হতে দেয়নি। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই সময় তাঁর চিকিৎসাও খুব ভালো হয়নি।

যাই হোক, শরীফ তবু খেলে গেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আক্ষেপ পাশে সরিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন। ২০ বছরের সেই পথচলা অবশেষে থামলো।

বিদায় বেলায় এখানেও অবশ্য সঙ্গী আক্ষেপ। ৪০০ উইকেট হবে, খুব আশা ছিল তার। ৪ হাজার রানও। রানটা অনেক দূরে ছিল, উইকেটের মাইলফলক কাছেই। কিন্তু ইনজুরি আর নানা কারণ মিলিয়ে এই মৌসুমে প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলতেই পারেননি, গত মৌসুমে পেরেছিলেন কেবল একটি। তাই বুঝে গেছেন, সাত উইকেটও আছে অনেক দূরের পথ। অনিশ্চিত পথে খুঁজিয়ে এগোতে চাননি।

তার বিদায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি অধ্যায়েরও সমাপ্তি। জানি না, দেশের তরুণ পেসারদের কতজন তাঁকে আদর্শ মনে করেন। তবে ক্রিকেটে প্রতি মমতা, ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রতি কমিটমেন্ট, সব মিলিয়ে ক্রিকেট দর্শনের জায়গায় তিনি প্রতিটি উঠতি ক্রিকেটারের জন্য হতে পারেন অনুসরণীয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের একজন একান্ত অনুসারী হিসেবে, বিদায় বেলায় আপনাকে টুপি খোলা অভিনন্দন, ফাইটার!

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।