ষড়যন্ত্র খুঁজে বড় ক্রিকেট জাতি হওয়ার নজীর নেই!

ভাবতে ভালোই লাগে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেটে আমরা পরাশক্তি হয়ে উঠেছি। এমনই শক্তিশালী, আইসিসিসহ গোটা ক্রিকেট বিশ্ব মিলে জোটবদ্ধ হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে আমাদেরকে নীচে নামাতে!

ভাইরে, এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ এখনও পর্যন্ত প্রতিপক্ষ দল, সমর্থক, বিশ্লেষকদের বেশির ভাগের কাছ থেকে যথেষ্ট সম্মান ও সমীহ পেয়েছে। ক্রিকেটাররা সেটি অনুভব করছেন এখানে প্রায় প্রতি পদক্ষেপে। আমরা যারা কাছ থেকে দেখছি এখানে, তারাও টের পাচ্ছি। তো দল যে সম্মান আদায় করেছে, এরপর আমরা দয়া করে ক্রিকেট জাতি হিসেবে নিজেদের হাস্যকর প্রমাণ না করি, নাকি?

ভুলে যাবেন না, আমাদের ভাগ্য আমাদের হাতেই ছিল। নিউ জিল্যান্ডকে আমরা বাগে পেয়ে হারাতে পারিনি। শ্রীলঙ্কার ম্যাচটা আমাদের সম্ভাব্য জয়ের ম্যাচ ছিল। কিছুটা নিজেদের দোষে, কিছুটা কপালের দোষে আমাদের আজ অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে কিন্তু এটাও অনেকটা অনুমিত ছিল। আগেও বলেছি, দলের লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো। নিউ জিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ থেকে অন্তত একটি জয়। তার পর অন্যান্য ম্যাচের ফল থেকে যদি ভালো কিছু হয়, যদি সুযোগ হয় শেষ চারের…। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর পর যদি নিউ জিল্যান্ডকেও হারাতে পারতাম, তাহলে পরে শ্রীলঙ্কা ম্যাচের বৃষ্টির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যেত। আমরা সেটা পারিনি। দোষ কি অন্যের?

২০১৫ বিশ্বকাপ, ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আমাদের কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল খেলা পথে বড় ভূমিকা ছিল বৃষ্টির। এবার উল্টো রূপ হয়তো দেখতে হচ্ছে। সবসময়ই আমাদের পাশে থাকার ঠিকাদারি প্রকৃতি মনে হয় নেয়নি!

নেয়নি বলেই অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকা মানেই দোষ চাপানোর সুযোগ পাওয়া? নিজেদের হতাশা তাদের গালাগাল করে ভুলে যাওয়া? প্রকৃতির মতো অন্যরাও তো আমাদের পাশে থাকার ঠিকাদারি নেয়নি!

কালকে ধোনি যখন উইকেটে যায়, ১০.৫ ওভারে ১১২ রান লাগে। এই ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেটের যুগেও, দুই পাশে দুইজন আন্দ্রে রাসেল ব্যাট করলেও কয়বার জিতবে দল? গত ২০ বছরে, ১০ বছরে শেষ ১০ ওভারে একশর বেশি তাড়া করে কয়বার জিতেছে কোনো দল? এটা কম্পিউটার গেম নয়। ভারত জিততে পারত প্রথম ১০-১৫ ওভারে আরও বেশি ইন্টেন্ট শো করলে। জিততে পারত রোহিত আরও অন্তত ৫-৭ ওভার টিকলে। শেষ ১০ ওভার হারের মূল কারণ নয়।

অবশ্যই ধারাভাষ্যকক্ষে যারা ছিলেন, বিশ্লেষক যারা কথা বলছেন, তাঁরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো বোঝেন। ধোনির ইন্টেন্ট নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু সবকিছুরই তো অন্য আরেকটা ছবি আছে। ইন্টেন্ট দেখাতে গেলে দুটি ব্যাপার হতো। হয় ভারত আরও কাছে যেতে পারত, নয়ত আরও বড় ব্যবধানে হারতে পারত। তো, তারা কেন ঝুঁকির পথে যাবে?

কালকে যদি ভারত ৬০-৭০ রানে হেরে যেত, রান রেট কমত না অনেক? তার পর শেষ দুই ম্যাচে যদি বাজেভাবে হারে, তাদের বাদ পড়ার ঝুঁকি থাকে না?

ধোনি নিশ্চয়ই এত বছর খেলে এইটুকু বোঝার মতো স্মার্ট! কালকে ভুবনেশ্বর ছিল নাম ভারতের টেইল ছিল অনেক লম্বা। ধোনি আউট হলে তারা ৭০-৮০ রানে হারতেই পারত।

আর সব ক্রিকেটীয় ব্যখ্যার বাইরে, ধোনি বা ভারত তো যৌথ প্রযোজনার সিনেমা বানাতে নামেনি। বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের চতুর্মুখী স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখে সার্কের মহান লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে নামেনি। তারা নিজেদের জন্যই খেলবে!

ভারত কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ পেলে সবার আগে ইংল্যান্ডকে বাদ দিতে চাইবে। ইংল্যান্ড শিরোপা জয়ের পথে বড় বাঁধা , আমরা নই।

আইসিসি কমার্শিয়াল কারণে দুই নম্বরি করতে চাইলে বাংলাদেশকে অবশ্যই টিকিয়ে রাখতে চাইবে। আমাদের উন্মাদনার তুলনা কেবল ভারতের সঙ্গেই চলে। তারা কেন আমাদের বাদ দিতে চাইবে?

তো, গালাগাল তো বহুদূর, খুব হাহুতাশ করার কারণ দেখি না। এখনও অনেক কিছু বাকি আছে। পাকিস্তান ম্যাচটি আমাদের সম্ভাব্য জয়ের ম্যাচ, সেটি জয়ের আশা করি। প্রবলভাবেই করি। ভারত ম্যাচে, শক্তি-সামর্থ্যের তুলনামূলক বিচার বলে, দুই দলই সামর্থ্য অনুযায়ী খেললে আমরা হারব। যদি আমরা নিজেদের সেরাটা দেই বা ছাড়িয়ে যাই, ওরা যদি কিছু ব্যাপার ঠিকঠাক করতে না পারে, আমরা জিততে পারি।

তো পাকিস্তানকে যদি হারাতে পারি প্রত্যাশা মতো, যদি ভারতের সঙ্গে দারুণ কিছু হয় বা লড়াই হয় তীব্র, তার পর আমরা সেমিফাইনালে থাকি বা না থাকি, মাথা যথেষ্ট উঁচুই থাকবে!

সময় এসেছে, আমরা মাথা উঁচু করতে শিখি। অন্যদের ছোট করে নিজেরাই ছোট হতে হয়। গালিগালাজ বা ষড়যন্ত্র খুঁজে বড় ক্রিকেট জাতি হওয়ার নজীর আছে বলে জানা নেই।

একটা দেশ ততটাই বড় বা ভালো, যতটা ভালো দেশের মানুষ। একটা ক্রিকেট জাতিও ততটা বড় , যতটা বড় বা বোধসম্পন্ন তাদের দর্শক, সমর্থক। দল বড় হচ্ছে, আমরাও বড় হই, নাকি?

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।