বাংলাদেশ ক্রিকেট: আবেগ ও পেশাদারিত্বের দ্বৈরথ

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৩ সাল; ঈদুল আযহার তৃতীয় দিন। বলা বাহুল্য বাংলাদেশে তখনো ভালাবাসা দিবসের দামামা সেভাবে বেজে উঠেনি। তখনো আমার প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বকাপের স্রোতের ভেলায় আমিও কিঞ্চিত গা  ভাসিয়েছিলাম । দুপুরের খাবারের সময় আমি খাবার নিয়ে টেলিভিশন এর সামনে বসে গেলাম বাংলাদেশ বনাম শ্রীলঙ্কার ম্যাচ দেখার জন্য।

টসে হেরে ব্যাটিং এ বাংলাদেশ। আগের ম্যাচের ব্যাটিং জুজু তখনো বিদ্যমান, যেখানে কানাডার  অখ্যাত বোলার ৫ উইকেট হাসিল করেন। শুরুতেই পর পর তিন বলে হান্নান সরকার, আশরাফুল ও এহসানুল হকের( একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গড় ৯.৫) ড্রেসিং রুমে প্রত্যাবর্তন। চতুর্থ বলে সানোয়ার হোসেন (একদিনেরআন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গড় ১১.৬) একটি বাউন্ডারি হাকালেন, কিন্তু পঞ্চম বলেই কুপোকাত। সেদিনের চামিন্দা ভাসের সেই  রেকর্ড গড়া স্পেলটাই আমার ভিতরে ক্রিকেটের প্রতি এক অন্য রকম ভালোবাসা  তৈরি করে যেটা এখনো সমানভাবে বিদ্যমান।

সেদিনের সেই গ্লানিময় পরাজয় মুখ দিয়ে কোন গালি বের করেনি, বরং ভিতরে গড়েছে কিছু করার তীব্র বাসনা। সেই বিশ্বকাপের পর থেকেই নিয়মিত বাংলাদেশের খেলা দেখা আর খোঁজখবর নেয়া হয়। ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ, প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফর, পাকিস্তান সফর, মুলতান ট্রাজেডি, ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের সাথে খেলা সবই স্মৃতির মানসপটে জ্বলজ্বল করে। বাংলাদেশের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ যাত্রার সমাপ্তি ও চলমান শ্রীলঙ্কা সিরিজে ব্যর্থতার পর, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন দাবি উঠেছে- ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটে আবেগ আর নয় আর নয়, আবেগ হটালে হবে বিশ্বজয়।’ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রত্যাশিত ফলাফল না পেলে মুণ্ডপাত নতুন কিছু নয়, তবে এবার তা বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুরাগীদের গাণিতিক এবং কৌশলগত  বিশ্লেষণে নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপের খেলার সম্ভাবনা বেশি তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। সেবার হতাশ হলেও বাংলার বাঘেরা ১৯৯৯ সালে ঠিকই জায়গা করে নেয় ক্রিকেটের বিশ্ব আসরে। তারপরেই শুরু হয় টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির তোরজোর। যদিও সে সময় বাংলাদেশ কোচ গর্ডন গ্রিনিজ তখনি টেস্ট খেলার অপরিণামদর্শীর কথা বলে নির্ধারিত চুক্তির একদিন আগে নাক্কারজনকভাবে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে এডি বারলো ও সাবের হোসেনের চেষ্টায় বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস লাভ করেন।

তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির পিছনে বড় অবদান ছিল খেলাটার প্রতি দর্শকদের আবেগ, ভালবাসা এবং নিঃস্বার্থ সমর্থন; যেটা প্রত্যক্ষভাবে ক্রিকেটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।ক্রিকেটের অভিবাবক সংস্থা আইসিসি ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে যথাক্রমে বাংলাদেশ ও কেনিয়াতে মিনি বিশ্বকাপের আয়োজন করে যার অন্যতম কারণ ছিল দুই উঠতি দেশের ক্রিকেটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা।

কেনিয়া সেখানে পাস মার্ক অর্জন করতে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশ লেটার মার্ক অর্জন করতে সমর্থ হয়। সমর্থকদের ভালবাসা এবং আবেগ এমনই অকৃত্রিম ছিল যে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রেকর্ড টানা ৪৫ ম্যাচ পরাজয়েও তাতে কোন ভাটা পড়েনি।

এডি বারলো বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের একটি রূপরেখা দাড় করান ২০০০ সালে, যেটার উপর ভর করে এখনও চলছে দেশের ক্রিকেট। দুঃখের বিষয় হল, ঘরোয়া ক্রিকেট এর মান সেই রূপরেখা থেকে বেশি উন্নত তো হয়নি, বরং আরও পতিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে এই আক্ষেপ কদাচিৎ হয় যখন বাইরের মাটিতে ক্রিকেট দলের ভরাডুবি হয়। যেখানে বীজতলায় সমস্যা সেখানে যতই সার দেওয়া হোক, উচ্চফলন আশা করা অনাবশ্যক। ক্রিকেট খেলা একই সাথে শারীরিক ও মানসিক  সামর্থ্যের খেলা, যেখানে অনেক সময় মানসিক সামর্থ বেশি জরুরী।

একারণে বলা ক্রিকেট একটি অন্যতম সমতা বিধানকারী খেলা। আর এই মানুষিক সামর্থ ও পেশাদারিত্ব উন্নত হয় লংগার  ভার্সন ক্রিকেটের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে পিকনিক ক্রিকেটের তকমা  এখনো ঘোচেনি। যানজটের কারণে দেরিতে খেলা হওয়া, মধ্যাহ্নভোজ পেছানো, মধ্যাহ্নভোজে নিম্নমানের ডাল, খাসীর মাংস, সবজি সরবরাহ প্রভৃতি বিরল ঘটনা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে নিয়মিত অনুসঙ্গ।

টেস্ট স্ট্যাটাস লাভের ১৯ বছর পরেও ক্রিকেট ঢাকাকেন্দ্রিক, প্রধান আতুর ঘর শুধু মাত্র বিকেএসপি , প্রতি দলে একাধিক স্পিনার, লংগার  ভার্সন ক্রিকেটে বড় ইনিংসগুলোতে ছোটমাঠে বাউন্ডারির ফুলঝুরি এগুলোই বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসকদের দৈন্যতার প্রতীক। বাংলাদেশে ক্রিকেটাররা জাতীয় দলে আশার পর অনেক মৌলিক জিনিস শেখার সুযোগ পান, যেটা অন্যান্য পেশাদার দলগুলোর ক্রিকেটাররা ক্রিকেটে হাতেখড়ির প্রথম দিনে পেয়ে থাকেন।

ইদানিং দেখা যায়, বাংলাদেশের কিছু ক্রিকেটঅনুরাগী ক্রিকেটে পেশাদারিত্ব বলতে শুধু মাস গেলে ১৫ জন ক্রিকেটারকে বেতন দেওয়া বুঝান। তাদের আরও দাবি, ক্রিকেটারদের বেতন কমানো হোক এবং তাদের ধারনা অনুযায়ী জনগণের করের টাকায় ক্রিকেটারদের অন্নসংস্থান হয়। তাদের জ্ঞাতার্থে বলা যায় যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিশ্বের পঞ্চম ধনী ক্রিকেট বোর্ড, যেখানে আয়ের সিংহভাগ আসে আইসিসির লভ্যাংশ বণ্টন, ম্যাচ আয়োজন, সম্প্রচার এবং স্পন্সর থেকে( বিসিবির ২০১৭ সালের আয়বিবরণী অনুযায়ী)।

তদুপরি, অন্যান্য অপেক্ষাকৃত কম ধনী দেশের চাইতে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কম বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। আরও একটি বিষয় ক্রিকেটারদের চুক্তি হয় বছর ভিত্তিক, যেখানে এক বছর খারাপ করলে পরবর্তী বছরে চুক্তি নবায়ন না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রিন্ট এবং ডিজিটাল মিডিয়ার কল্যাণে ক্রিকেটারদের আয় এবং আয়কর সম্পর্কে ধারনা লাভ করা গেলেও বোর্ড সভাপতি, পরিচালক এবং কর্মকর্তাদের মাসিক ভাতা সম্পর্কে খুব বেশি অবগত হওয়া যায় না। বরং এক জাতীয় দৈনিকে বোর্ড কর্মকর্তাদের তিন মাসে  শতভাগ বেতন বাড়ার খবর প্রকাশ হয়েছিল।

জাতীয় দল বাদ দিলে, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটারগণ ২০১৩ সালের  আগ পর্যন্ত মাসিক বেতনের আওতাভুক্ত ছিলেন না। ২০১৩ সালে ১২০ জন ক্রিকেটারকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করে বেতন কাঠামোর মধ্যে আনা হয়। এরপরেও সেই বেতন নিয়মিত প্রদানে গড়িমসি করা হয়, এমনকি ২০১৭ সালে এই বেতন বন্ধ করে নামে মাত্র ম্যাচ ফি  বাড়ানোর প্রস্তাবও পেশ করা হয়েছিল।

প্রখ্যাত কবি জালালুদ্দিন রুমি ১৩ শতকে তার তৃতীয় মছনাবি কাব্যগ্রন্থে সামজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের অবনমন বুঝাতে রূপক অর্থে একটি কথা লিখেছিলেন যে- মাছ যখন পচে তখন তা মাথা থেকে শুরু হয়, লেজ থেকে নয়।  বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি হল ঢাকা মেট্রোপলিটন ক্রিকেট কমিটি বা সিসিডিএম। সিসিডিএম বিসিবির একটি সাব কমিটি হলেও সেখানে বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন বিভিন্ন ক্লাব কর্মকর্তারা।

একই সাথে ক্লাব এবং অভিভাবক সংস্থার পদে গদিশীন হলেও কোনও এক অজানা কারণে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) বিষয়টি এক্ষেত্রে তেমন আলোচনার উদ্রেক ঘটায় না। এমনকি কখনও কখনও সিসিডিএম এবং বিসিবি মুখোমুখি অবস্থায়ও দাঁড়িয়েছে। অনুরূপভাবে বিসিবিতেও স্বার্থের সংঘাত সত্ত্বেও অনেকে একই সঙ্গে একাধিক পদে দায়িত্বরত রয়েছেন। বেশিদূর যেতে হবে না, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও লোধা কমিশন পরবর্তী যুগে শচীন টেন্ডুলকারের বিরুদ্ধে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

যদিও উপযুক্ত শর্তসমূহ (terms of reference)  শচীনকে প্রদান করা হয়নি বিধায় বিসিসিআই ন্যায়পাল বিচারপতি ডি কে জৈন সেই অভিযোগ খারিজ করেছিলেন। হাল আমলে বঙ্গ দেশে দেখা যায় সমালোচনার নামে ক্রিকেটারদের গালি এবং মুণ্ডপাত করার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক।

আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় বিভিন্ন চাপে অতিষ্ঠ ৭০ লাখ শিক্ষিত বেকার সমৃদ্ধ জাতি যখন অন্যান্য বিষয়ে বাক স্বাধীনতা প্রকাশে অক্ষম অথবা তথ্য প্রযুক্তি আইনের কাছে জিম্মি, তখন ক্রিকেটারদের উপর ক্ষোভ উগ্রিয়ে নাগরিকগণ জাতীয় ঝাল মেটান। এখানেও কালেভদ্রে অভিভাবক সংস্থার গায়ে কিঞ্চিত আঁচর কাঁটা হলেও সেখানে কিন্তু ঠিকই সেই লম্বা হাতের অদৃশ্য বেড়াজাল বিদ্যমান। রাষ্ট্রযন্ত্রও ব্যাপারটি বেশ আনন্দের সাথে উপভোগ করে।

ক্রিকেট খেলার ক্রমবর্ধমান উন্নতি এবং পেশাদারিত্ব আনয়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক প্রতিভা বাছাই, প্রতিভার পরিচর্যা এবং এর মধ্যে দিয়ে খেলোয়াড় পাইপ লাইনের বিকাশ। এরই ধারাবাহিকতায় পরম শ্রদ্ধেয় কোচ রিচার্ড ম্যাকিন্সের তত্ত্বাবধানে ২০০৪ সালে গড়ে তোলা হয় হাই পারফরমান্স ইউনিট; আজকের সাকিব, মুশফিক পরিকল্পনার  ফসল। দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে ২০০৮ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত এই ইউনিটের কার্যক্রম অত্যন্ত ম্রিয়মাণ ছিল। কিছুটা আশাবাঞ্জক হল, ২০১৬ সাল হতে সায়মন হেলমটের অধীনে আবারও এই হাই পারফরমান্স ইউনিটে প্রাণ এসেছে।

পরিশেষে, একটি ঘটনা উল্লেখ করে শেষ  করতে চাই। বল টেম্পারিং কাণ্ডে ২০১৮ সালে ক্রিকেটে পেশাদারিত্বের এক অনন্য উদাহরণ প্রতিষ্ঠান ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হয়। তদন্ত কমিটি এবং সংবাদমাধ্যমের ময়নাতদন্তে টালমাটাল ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। প্রাতিষ্ঠানিক এবং নেতৃত্ব সংকটে বিপর্যস্ত ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া যার সূত্র ধরেই ঘটে বল বিকৃতি কেলেঙ্কারি।

সেই ঘটনায় তিন ক্রিকেটার সাময়িক নিষিদ্ধ হলেও, প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড, সভাপতি ডাভিড পেভার, বোর্ড পরিচালক এবং সাবেক অধিনায়ক মার্ক টেলরসহ প্রমুখ প্রশাসকদের স্থায়ীভাবে ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে যবনিকাপত ঘটে। এটাই চূড়ান্ত পেশাদারিত্ব। বাংলাদেশের ক্রিকেটে কি কখনও নিকট অতীতে বা অদূর ভবিষ্যতে এমন দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়েছিল বা হবে?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।