কোচ পাল্টানোর সংস্কৃতি ও বিসিবি নামের লোকাল বাস!

চান্দিকা হাতুরুসিংহের আচমকা প্রস্থানের পরে যেমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছিল, এবার অবস্থাটা ঠিক এতটা বেগতিক নয়। হাতুরুসিংহের বিদায়ের খবরটা স্বপ্নেও ভাবেবি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। তাই তিনি চলে যাওয়ার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মরিয়া হয়ে কোচ খোঁজার জন্য মাঠে নামতে হয় সংস্থাটিকে। আর স্টিভ রোডসকে তো পরিকল্পনা করেই ছেটে ফেলেছে বিসিবি।

হাতুরুর বিদায়ে চাওয়া ছিল, যে শূন্যস্থানটা যেনো পছন্দের কোচ দিয়েই পূর্ণ হয়। রিচার্ড পাইবাস আর ফিল সিমন্স তাদের পরিকল্পনা বিসিবির কাছে জমা দিয়েছিলেন। তবে ভারতকে বিশ্বকাপ জেতানো গ্যারি কার্স্টেন, নিল ম্যাকেঞ্জি আর জিওফ মার্শের নামও বাতাসে ভাসছিল। এদের মধ্যে সিমন্সকে নাকি ক্রিকেটাররা পছন্দও করেছিলেন। পল ফারব্রেসের নাম জোরেসোরে শোনা যাচ্ছিল বিসিবির কর্তাব্যক্তিদের মুখে। কিন্তু, তিনি ‘না’ বলে দেন প্রকাশ্যে।

এরপর অভিনব এক কাণ্ড ঘটে। কোচ নির্বাচনের দায়িত্ব পান গ্যারি কার্স্টেন। তিনি ঢাকায় দু’দিন থেকে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, নির্বাচক ও স্থানীয় কোচদের সাথে দফায় দফায় মিটিং করে একটা প্রেসক্রিপশন দিয়ে যান। সেই প্রেসক্রিপশন মেনে কোচ হিসেবে সাসেক্স থেকে আসেন স্টিভ রোডস। ব্যাটিং কোচ হন নিল ম্যাকেঞ্জি।

স্টিভ রোডসের বাংলাদেশ যুগ বেশিদিন স্থায়ী হল না। বিশ্বকাপের মাঝপথেই পরিকল্পনা হয়েছিল তাঁকে সরানোর। বোর্ড কিংবা খেলোয়াড় – কেউই রোডসে বিশেষ একটা সন্তুষ্ট নন। বিশেষ করে তার ওল্ড স্কুল ঘরানার মানসিকতা, ম্যাচ রিডিং ক্ষমতার অভাব, কমিউনিকেশন স্কিল – কোনোটাই নাকি আন্তর্জাতিক মানের নয়। তাই, পরিশ্রমী হওয়ার পরও রোডস টিকতে পারলেন না।

শ্রীলঙ্কা সফরটা খালেদ মাহমুদ সুজন চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু, অদূর ভবিষ্যতেই নতুন কোচের পথে হাঁটবে বিসিবি। সে পদের জন্য অনেক নামই আসছে। কেউ বলছেন পাকিস্তানের সাবেক ফিল্ডিং কোচ ও স্টিভ রিক্সন। বর্তমানে তিনি শ্রীলঙ্কায় একই পদে আছেন। তবে, শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট (এসএলসি) তাঁর মেয়াদ আর বাড়াচ্ছে না। আলোচনায় জোরেসোরে আছে চান্দিকা হাতুরুসিংহের নামও। বোর্ডের একটা বড় অংশ হাতুরুসিংহেকে ফেরাতে চায়। আবার এর বিরুদ্ধপক্ষও আছে। তবে, সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান মাসখানেকের মধ্যেই হয়ে যাওয়ার কথা।

২০১৭’র শেষ ভাগে বিসিবির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল হাতুরুর চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার ধরন। সেটা নিয়ে টানা তৃতীয় বিদেশি কোচ মেয়াদ পূর্ণ হবার পূর্বেই দায়িত্ব ছাড়েন। সাকিবের টেস্ট থেকে বিরতি আর এর জের ধরে দক্ষিন আফ্রিকায় দলের ভরাডুবির ভার বইতে না পেরেই হাতুরুসিংহে দায়িত্ব ছেড়েছিলেন বলে বিসিবি প্রধান তখন জানিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ থেকে রোডসের বিদায়টাও সুখকর হল না। বোঝাই যাচ্ছে কোচকে যত ঘটা করে চাকরিতে বিসিবি নিয়োগ দেয়, বিদায় বেলায় বরাবরই শুরুর মত সেই সুসম্পর্কটা বজায় রাখা সম্ভব হয় না।

৫ বছরের চুক্তি শেষে জেমি সিডন্স যখন ক্রিকেট দলের দায়িত্ব ছাড়েন এরপর থেকে আর কোনো বিদেশী কোচ তার মেয়াদ শেষ করেননি। জেমি সিডন্সের পরে আসেন স্টুয়ার্ট ল। নয় মাস দায়িত্ব পালনের পরে তিনি পারিবারিক কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। এরপর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আসেন রিচার্ড পাইবাস।

ক্রিকেট দলের টেকসই উন্নয়নে তার পরিকল্পনা যখন বিসিবি ডিরেক্টরদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয় তখন তার দায়িত্ব গ্রহনের পাঁচমাসের মাথায়ই দায়িত্ব ছাড়েন। অগত্যা বোলিং কোচ শেন জার্গেনসেনকেহেড কোচ করা হয়। ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে পরে দলের ভরাডুবির বোঝা আর মিডিয়ার চাপ সইতে না পেরে পদত্যাগ করেন তিনি।

এরপর ২০১৫ পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে দলের কোচ হিসেবে আসেন চান্দিকা হাতুরুসিংহে। ২০১৫ এ দলের অসাধারণ পারফরমেন্স এর ফলে তার দায়িত্ব বাড়িয়ে ২০১৯ পর্যন্ত করা হয়। এরপরেই তার আর বিসিবির মধ্যকার দূরত্ব বাড়তে থাকে। সাথে যোগ হয় টি টোয়েন্টি থেকে মাশরাফির আচমকা অবসর ঘোষণা, প্রেস কনফারেন্সে মুশফিকের কন্ঠে ক্ষোভ ঝরে পড়া, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মমিনুলের অন্তর্ভুক্তি, যা ধীরে ধীরে তাকে মানসিকভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে দেয়। আর যার ফলশ্রুতিতে তার এই আচমকা পদত্যাগ। যদিও বিসিবির ভেতরের সূত্র ধরে জানা গেছে, মিডিয়ায় বোর্ড প্রধানের দ: আফ্রিকা সফরে ব্যর্থতার কারণ জানতে চাওয়াই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল। সেসব নিয়ে ওই  আমলে বেশ আলোচনাও হয়েছিল।

হাথুরুসিংহের পদত্যাগ দলকে বেশ বেকায়দায় ফেলে দিলেও, এবার স্টিভ রোডসের বিদায়ে দল বরং খুশিই। কারণ, নতুন কোচ বাংলাদেশকে নতুন কোনো খেলার ধরণ বা ট্যাকটিক্সে অভ্যস্ত করে রেখে যাননি। তবে, এটা ঠিক যে নতুন কোচের খেলার স্টাইল, ট্যাকটিক্সের সাথে খেলোয়াড়দের খাপ খাওয়াতে বেশ সময় লেগে যেতে পারে, এদিকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেরও আর বেশি সময় নেই!

তবে, একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে, দল ভালো খেললে সাত-খুন-মাফ আর হারতে শুরু করলেই কোচের ঘাড়েই সব দোষ চাপানোর সংস্কৃতি থেকে বেরোতে হবে। অন্যথায় ব্যাপারটা কেবল দলের জন্যেই ক্ষতি ডেকে আনবে না, বোর্ডকেও অপেশাদার তকমা লাগিয়ে দিতে পারে। বিসিবির কোচকে নিয়ন্ত্রনের ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া উচিত, কিংবা এমন একজনকে খুঁজে বের করা যিনি কিনা এসবকে খুব ভালোভাবে সামাল দিতে জানেন।

এক্ষেত্রে ছোট্ট একটা সমস্যা আছে। নতুন কোচ যদি বিদেশি হন তাহলে খেলোয়াড় চিনতে, তাদের খেলার ধরণ বুঝতে আর সাথে বিসিবির পাওয়ার হায়ারার্কির সাথে মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হয়। আগের বিদেশি কোচেরা অল্পবিস্তর সাফল্য পেলেও বিদায়বেলার অভিজ্ঞতা বেশিরভাগের সাথেই খুব সুখকর নয়। সমস্যাটা সমাধান মিলতে পারে দেশি কোচে।

দেশি কোচ হলে খেলোয়াড়দের সাথে মিশে যেতে পারতেন সহজেই, একেবারে শুরু থেকেই বিসিবির গলিঘুঁজিও বেশ ভালোই চেনা থাকতো। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে, আমাদের কি আদৌ কোনো বিশ্বমানের কোচ আছেন যিনি ম্যান ম্যানেজমেন্টে পারদর্শী আবার ধুরন্ধর ম্যাচ ট্যাকটিশিয়ান?

এসব জটিল জিগসও পাজলের সমাধানেই নিহিত আছে বিসিবির মঙ্গল, দেশের ক্রিকেটের মঙ্গল। অন্যথায় বিপদ আসন্ন। কিভাবে এই পাজলের সমাধান করতে হবে? দেশি কোচ বানানোর প্রক্রিয়াটা বিসিবিকেই শুরু করতে হবে। যেভাবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ড্যারেন লেহম্যানকে বানিয়েছে, বা বানিয়েছে জাস্টিন ল্যাঙ্গার বা রিকি পন্টিংদের – সেভাবে।

ব্যাপারটা কঠিন না খুব। কোচ হতে আগ্রহী সাবেকরা আইসিসির কোচিং কোর্সগুলো নিজেদের উদ্যোগেই করেন। বাকি থাকলো সুযোগ পাওয়া। তাঁদের প্রথমে বয়সভিত্তিক দল, বিপিএল বা ঢাকা লিগে সুযোগ দিতে হবে। সেখান থেকে যারা প্রশংসিত হবেন তাদের কাজে লাগাতে হবে এইচপি-তে, ‘এ’ দলে বা যুবদলে। প্রয়োজন বুঝে জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ দলে দুই একজনকে সুযোগ দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। এই কাঠামোতে দুই একজন বিদেশি দলের কোচিং স্টাফ দলেও ঢুকে যেতে পারেন। হোক সেটা আইসিসির সহযোগী কোনো দেশ। এভাবেই তো বড় বড় কোচের জন্ম হয়। হুট করে কাউকে জাতীয় দলের হোড কোচ বানিয়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এত স্বস্তা না!

বিসিবিকে তাই লোকাল বাসের মত প্যাসেঞ্জার পরিবর্তন করলেই চলবে না। সাথে নিজেদের কাঠামোর মধ্যেও ‘নিজেদের লোক’ বানানোর একটা শক্ত প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে।

এর ওপর এখন বিশ্বমানের কোচরা মূলত আইপিএল-বিগ ব্যাশসহ সারা বিশ্বের ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টগুলোতে কাজ করে বাকিটা সময় পরিবারকে সময় দিতে চায়। তাতে তাদের সময় কম দিতে হয়, আয় হয় বেশি। আধুনিক ক্রিকেটের যুগে তাই ভাল বিদেশি কোচ আর সোনার হরিণ খুঁজে পাওয়া একই কথা।

– ক্রিকবাজ অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।