বাংলাদেশের ক্রিকেট, দুশ্চিন্তা/অভিযোগ এবং আত্মসমালোচনা

ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচাইতে বাজে অবস্থা কোন ফরম্যাটে? টি-টোয়েন্টিতে, এরপর টেস্টে; ওয়ানডেতে ৬বা৭ এ থাকার মতো অবস্থায় চলে এসেছে।

আগামী দেড় বছর বাংলাদেশ সবচাইতে বেশি খেলবে টি-টোয়েন্টি এবং টেস্ট; সঙ্গত কারণেই জয়ের চাইতে হারের পরিমাণ বেশি হবে, এবং সোস্যাল মিডিয়া, খবরের কাগজে ক্রিকেট মরে গেল, বাংলাদেশ ক্রিকেট চরম ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে প্রভৃতি কনটেন্টের লেখায় সয়লাব হয়ে যাবে।

এরই মধ্যে তথাকথিত একটি বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটবে যারা এন্টি-ক্রিকেট সেন্টিমেন্টকে প্রমোট করতে থাকবে। তারা বলবে ক্রিকেট একটি ওভাররেটেড খেলা, দুই-এক ম্যাচ জিতেই ফ্ল্যাট-জমি দিয়ে ক্রিকেটারদের জাতীয় হিরো বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। ২০ বছর হয়ে গেল টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার, এখনো আফগানিস্তান বলে-কয়ে হারায়, এরকম একটা খেলার পেছনে বিভিন্ন পেশার মেধাবী মানুষেরা যেভাবে সময় অপচয় করে এতেই দেশ অর্থনীতি এবং ইনোভেশনে পিছিয়ে পড়বে।

তাদের এইসব লেখা ২০০-৩০০ শেয়ার, শত শত কমেন্টে ভাস্বরিত থাকবে।

আরেকদল এমেচার ক্রিকেট দর্শক বোর্ডের দুর্নীতি-পরিকল্পনাহীনতা, পাপনের স্বেচ্ছাচার, সুজনের অসংখ্য পদ দখল করে রাখা, নির্বাচক হিসেবে নান্নুর অযোগ্যতা, ঘরোয়া ক্রিকেটে সীমাহীন অনিয়ম শেষে সৌম্য-লিটন-সাব্বিরকে কেন বারবার সুযোগ দেয়া হয়, পাইপলাইনে কেন প্লেয়ার তৈরি হচ্ছে না প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শেষে এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে বিষয়ে মাস্টারপ্ল্যান ওপেন সোর্স হিসেবে ফেসবুকে দিয়ে দিবে৷

আদতে এরা প্রত্যেকেই ‘people with complaining mental attitude’; মাঠে খেলা দেখতে গেলে কিছু দর্শককে দেখা যায় নানারকম ব্যানার নিয়ে আসে, ক্যামেরা দেখলেই বুনো উল্লাসে মেতে উঠে। খেলা দেখতে নয়, তাদের মাঠে যাওয়ার মূল মোটিভেশন ক্যামেরায় মুখ দেখানো। এই গোষ্ঠীর সাথে অভিযোগপ্রবণ শ্রেণিটির পার্থক্য নেই বড়ো স্কেলে।

আমাদের সিংহভাগ মানুষ সমালোচনা বলতে বুঝে দিস্তা দিস্তা অভিযোগ। কোনো নীতির সাথে দ্বিমত হলে প্রথমে সেটির মোটিভ বা ইনটেনশন সম্বন্ধে গভীর অনুসন্ধান করতে হয়( কেন সে এমনটি করলো), সেটার সাময়িক এবং স্থায়ী ইমপ্যাক্ট চিন্তা করতে হয় এবং চিন্তাটাকে প্রতিচিন্তা দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ করে যথার্থতা নিরূপণ করতে হয়, এবং আমি যেভাবে চাচ্ছি সেটা যে বর্তমান নীতির চাইতে বেটার রেজাল্ট দিবে সেই অনুমানকে প্রমাণ করতে হয়— এই সুদীর্ঘ চেইন অনুসরণ করে চালানো আলোচনাকেই সমালোচনা বলা হয়। আমরা যা করি বেশিরভাগই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বশে দেয়া মতামত, যেগুলো ২-৩টা প্রশ্নের পরই বাতিল করে দেয়া যায়।

আজ অনলাইনে পড়লাম রত্না নামের জনৈক এথলেট ক্রিকেটকে বেশি এক্সপোজার দেয়ার জন্য সাংবাদিকদের কটাক্ষ করেছে। কটাক্ষের এক অংশে সে উল্লেখ করেছে সাকিবের অলরাউন্ডার র‍্যাংকিংয়ে এক নম্বরে ওঠা এবং এশিয়া কাপে মেয়েদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া ক্রিকেটে কোনো অর্জন নেই। কে এই রত্না সে সম্বন্ধে ধারণা নেই, তবে তার মতামতের প্রেক্ষিতে তার যে আয়োডিনের অভাব আছে সে সংক্রান্ত অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় সামান্য ক্লেশেই।

আইসিসির সদস্যভুক্ত দেশের সংখ্যা বোধহয় ১০৬ ( সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে), এর মধ্যে টেস্ট স্ট্যাটাসধারী দেশের সংখ্যা মাত্র ১২টি। বাংলাদেশ সেই এলিট ক্লাবের স্থায়ী সদস্য। বাংলাদেশের অন্য যে কোনো খেলা এর কাছাকাছি যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করুক আগে, তারপর সাফল্য পরিমাপ করার কথা চিন্তা করা যাবে; বাকি খেলাগুলো তো আমলে নেয়ার মতো অবস্থাতেই নেই।

এই যে ফুটবল নিয়ে এতো হাহাকার, আবাহনী-মোহামেডানের সোনালি অতীতের মিথ, সেই ফুটবল তার সেরা সময়ে কী এমন আহামরি অর্জন করেছে গ্লোবাল কনটেক্সট এ? বিশ্বকাপ খেলা তো বহু দূরে, বাছাই পর্বেই গণ্ডায় গণ্ডায় গোল হজম করে এসেছে। সাফে সোনা জেতা, এটা তো আইসিসি ট্রফিতে ২-১ টা ম্যাচ জেতা পর্যায়ের চাইতেও তুচ্ছ বা সেই পর্যায়ের। ফুটবলের গ্লোবাল কনটেক্সট এ সাফ আসলে কতটুকু অবস্থান দখল করে আছে?

অথচ বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদ ফুটবল ফেডারেশনের মামা লাগে, যে কারণে তাদের আবদারের বাহাদুরিতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেটকে নির্বাসিত করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মিরপুরে। ২০০০ সালের দিকে কেমন ছিল মিরপুর স্টেডিয়াম, বড়োদের কাছে জেনে নিয়েন। বঙ্গবন্ধু নামটাতেই সমস্যা ছিল কিনা জানি না, নইলে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম থেকে ক্রিকেট চলে যাওয়া অন্যতম প্যাথেটিক একটি সিদ্ধান্ত। কমলাপুরেও ফুটবলের জন্য মাঠ বানানো হয়েছিল ( মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম), তবু ফুটবলের উছিলা কমে না।

আমরা শুনতে পাই মানিকগঞ্জে বিশাল স্টেডিয়াম হবে, পূর্বাচলে ক্রিকেট স্টেডিয়াম হবে, কোনোটারই বাস্তবায়ন হয়নি, মাঝখান থেকে স্টেডিয়াম হয়েছে ঢাকার বাইরে কেরানিগঞ্জে। সেখানেও কি খেলা হয়? ম্যাচ তো সেই ঘুরেফিরে ফতুল্লায় আর বিকেএসপিতে।

এই যে রোমান সানা নামের ছেলেটা আর্চারিতে সোনা জিতেছে,মিডিয়াতে এক্সপোজার পাচ্ছে না বলে তার নিজের এবং এন্টি-ক্রিকেট সেন্টিমেন্টের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের আহাজারির অন্ত নেই, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হাতে মিষ্টি খেয়ে কলিজা জুড়িয়েছে, তাকে কেউ জিজ্ঞাসা করুক তো, কতজন দর্শকের সামনে সে পারফর্ম করেছে? কিংবা রত্না নামের সেই এথলেট, তার পারফরম্যান্সের সময় দর্শক সংখ্যা কীরকম ছিল, কয়টা টিভি চ্যানেলে সেটা দেখানো হয়েছে, প্রোগ্রামের টিআরপি কেমন?

প্রতিবছর ম্যাথ অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দল বাইরে যায়, প্রোগ্রামিং কনটেস্টেও যায়, সেখানে তাদের সাফল্য নেহায়েত মন্দ নয়। ম্যাথ অলিম্পিয়াডে গোল্ড পাওয়া ছেলেটা কি আহাজারি করবে ক্রিকেটে জিতলে বাড়ি-জমি পায়, আমি কিছুই পেলাম না, প্রধানমন্ত্রী কেন আমাকে ফোন দিলো না?

করবে না, কারণ সে জানে অলিম্পিয়াডে ভালো করে সে হয়তো উচ্চশিক্ষার জন্য নামী ভার্সিটিতে সুযোগ পাবে, তার ট্র‍্যাক আলাদা।

ব্যক্তিগত ইভেন্টগুলো কখনোই গণমুখী হয় না। টেনিস বা গল্ফ কিছুটা ব্যতিক্রম, তবু সব দেশে নয়। বাংলাদেশ টেনিস ফেডারেশনের কোর্টে যদি রজার ফেদেরার আর রাফায়েল নাদাল খেলতে আসে, গ্যালারি ভর্তি হবে তো? অথচ টেনিস ফেডারেশনের গ্যালারির আয়তন মিরপুরের গ্যালারির ১০ ভাগের ১ ভাগ হবে সর্বোচ্চ।

ক্রিকেট বা ফুটবল নিয়ে মাতামাতি করলে গবেষণা বা অর্থনীতিতে মনোযোগ দেয়া যাবে না এর চাইতে ফালতু কথা কী আর হতে পারে। ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া তারা কি ক্রিকেটে মনোযোগ দিতে গিয়ে অন্যান্য বিষয় বিস্মৃত হয়েছে? দোষটা কার তাহলে?

আকরাম খান, বুলবুল, নান্নুদের জিজ্ঞেস করে দেখুন ক্রিকেট খেলে তারা কত টাকা রোজগার করতো, এবং সেই সময়ে তারকাখ্যাতিতে মোনেম মুন্না, সাব্বির, আসলাম রা তাদের চাইতে এগিয়ে ছিল কিনা৷

ব্যক্তিগত ইভেন্টের কোনো লেগাসি হয় না, ইনডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ান্সই শেষ কথা৷ শুটিংয়ে কেউ একবছর সোনা পেল মানে আরো অনেক শুটার তৈরি হবে না। কিন্তু ক্রিকেটে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া মানে বছরের পর বছর খেলার অধিকার রাখা। আকরাম, বুলবুলরা টেস্টে স্ট্যাটাসের লগ্নে খেলোয়াড় ছিলেন, আজ কোথায় তারা? এবং বাংলাদেশের খেলা মোট ম্যাচের সংখ্যা যখন হিসেব করা হয় সেখানে তাদের পারফরম্যান্সগুলোও আর্কাইভে থাকে।

আপনি যখন কোনো ব্যক্তিগত ইভেন্টে ক্যারিয়ার গড়েছেন, এটা জেনেই গেছেন ওখানে এক্সপোজার পাবেন না। আপনি সুইমিং বা স্প্রিন্টারে আগে ১০ হাজার দর্শক আনুন। মিডিয়া তো আপনার সংবাদ এক কলামে হলেও প্রকাশ করে। রোমান সানা বা রত্নাকে নিয়ে যদি টানা ১ মাস প্রথম পাতায় বড়ো নিউজ করা হতে থাকে, আপনাদের কি ধারণা মানুষ শুটিং বা আর্চারিতে আগ্রহী হবে?

নাকি জমি বা ফ্ল্যাট না দেয়া থেকেই সমস্যা? এটা হলেও তো কিছু করার নেই। সক্রিয় রাজনীতিতে ন্যুনতম অভিজ্ঞতা ছাড়াই নড়াইলে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে আসা নেতাদের হটিয়ে মাশরাফি যে নমিনেশন পেল, এটা দেখেও কি বোঝেন না ক্রিকেটাররা কেন ফ্ল্যাট বা জমি পায়?

ক্রিকেটের একাধিপত্য যদি মানতে না পারেন, যদি এক্সপোজারের বেশি ক্ষিদে থাকে, হয় ব্যক্তিগত ইভেন্ট থেকে সরে ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন, অথবা এক্সপোজার পাবেন না এটা মেনে নিয়েই ক্যারিয়ার গড়ুন। তবুও ক্ষিদে না মিটলে ‘কে হবে মাসুদরানা’ তে অডিশন দিন, অথবা নোবেলের মতো জি-বাংলায় গিয়ে জেমস-বাচ্চুর গান করুন।

বিশ্বকাপের ব্যর্থতা বাংলাদেশকে ঝাঁকুনি দিয়েছে। বিশ্বকাপের আগ পর্যন্তও বাংলাদেশে ‘এ’ দল বলতে কিছু ছিল না, তারা ম্যাচও খেলতো কদাচিত।

কিন্তু বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পরে খেয়াল করে দেখুন, বিসিবির অনেকগুলো দল একের পর এক সিরিজ খেলছে। ‘এ’ দল, হাইপারফরম্যান্স দল, ইমার্জিং দল, অনুর্ধ্ব-১৯, অর্থাৎ তারা প্লেয়ার প্রস্তুত করছে। ‘এ’ দল শ্রীলংকা যাচ্ছে, হাইপরম্যান্স যাচ্ছে ভারতে, অনুর্ধ্ব ১৯ যাচ্ছে নিউজিল্যান্ডে। জাতীয় দলের চাইতেও এদের ব্যস্ততা বেশি এখন।

হার্ট ঠিকমতো কাজ না করলে পেসমেকার বসাতে হয়। বিসিবি হয়তো সেই চেষ্টাই করছে।

ঘরোয়া ক্রিকেটের মান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সবার আগে দরকার ক্লাব ক্রিকেটের দুর্নীতি কমানো। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কারণ ক্লাবগুলোতে এমন সব বিগশট ব্যক্তি জড়িত যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা সরকারের শীর্ষ পর্যায়েরও নেই। ওই জায়গায় আপনাকে বা আমাকে বসিয়ে দিলেও আমরা এর চাইতে বেটার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারবো না।

বিসিবি তার চাইতে বিভিন্ন লেভেলের দলের পেছনে খরচ করছে এটাকে বিকল্প স্ট্র‍্যাটেজি হিসেবে খারাপ বলবো না। ক্রিকেটাররা এসব জায়গায় খেলে খেলে নিজেদের প্রস্তুত করেই টপ লেভেলে আসুক।

পাইপলাইন নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিন্তিত নই। আমার চিন্তার জায়গা সিনয়র সিন্ডিকেট। সৌম্য, লিটন, সাব্বির, মোসাদ্দেক, রুবেল— এই ৫ জন ক্রিকেটারের একটি পুল তৈরি হয়েছে, যখনই দল থেকে ছাঁটাই শুরু হয় বা ব্যাপক রদবদল হয়, ঘুরেফিরে এই ৫ জনকেই অপশন হিসেবে চোখে পড়ে। পক্ষান্তরে তামিম, মাহমুদউল্লাহ, মুশফিক, সাকিব– এদের পারফরম্যান্সের কোনো রিভিউ নেই, যা-ই খেলুক দলে তারা থাকবেই। এটা সুস্পষ্ট মেরুকরণ ঘটায়। সৌম্য বা সাব্বির হয়তোবা ২সিরিজ মেয়াদ, সেটা তামিম-রিয়াদদের জন্য ৩ সিরিজ হতে পারে, পার্থক্য এটুকুই। কিন্তু বাস্তবে হচ্ছে উল্টোটা। লিটন বা সৌম্য যদি টানা ২ ম্যাচ ১০ এর নিচে আউট হয় ধরেই নেয় ৩য় ম্যাচে জায়গা হারাচ্ছি, সিরিজ শেষে দল থেকেও বাদ। পক্ষান্তরে মাহমুদুল্লাহ বা মুশফিক যদি টানা ১০-১২ ম্যাচেও ফিফটিশূন্য থাকে, কিছুটা ফিসফাস হবে, তারপর কোনো এক ম্যাচে ৪০-৪৩ রান করে ফিসফিসানি বন্ধ করে দেবে।

এটা কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলো?

আপনি পরিবর্তনের কথা বলছেন, অথচ নতুন নেয়া প্লেয়াদের বসিয়ে রাখছেন। সে তখনই সুযোগ পাবে যখন বাদের পুলভুক্ত ক্রিকেটারদের কেউ খারাপ করবে, অথবা নতুন সুযোগ পাওয়া কেউ ব্যর্থ হবে। এরা যখন ব্যর্থ হবে তখন সৌম্য-লিটন বা সাব্বির দলের বাইরে গিয়ে তেমন কিছু না করেও ফেরত আসবে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের দূরাবস্থার এটাই প্রধান কারণ। আফিফ আগের ম্যাচ একা জেতানো সত্ত্বেও পরের ম্যাচে ৭ নম্বরে নামতে বাধ্য হয়েছে, এবং এমন পরিস্থিতিতে নেমেছে যখন মাহমুদউল্লাহ আর সাব্বির চাকরি বাঁচানো ব্যাটিং করে দলের পরাজয় নিশ্চিত করে এসেছে।

আফিফ আগে নামতে পারলো না কেন? কারণ মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, সাব্বির প্রত্যেকে তার চাইতে সিনিয়র, তাদের ২৭ বলে ২৪ কিংবা ৪০ বলে ৪৭ রানের ইনিংস খেলে পরিসংখ্যান সমৃদ্ধ করতে হবে। কারণ, শেষ ১২ ইনিংসে মাহমুদুল্লাহ, মুশফিক বা সাব্বিরের রান কত সেই তথ্য হিসাব করলে ৪৭ আর ২৪ দেখাবে, ম্যাচ পরিস্থিতির সেখানে উল্লেখ থাকবে না৷ অথচ যে কোনো বিচক্ষণ কোচ আর নির্বাচক গত ম্যাচের পরই সাব্বির আর মাহমুদুল্লাহকে বাদ দিয়ে দিতো।

টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশকে জিততে হবে বুদ্ধিদীপ্ত আর বৈচিত্র‍্যপূর্ণ বোলিং দিয়ে৷ ১ ওভারে ১৫-২০ রান লাগবে, এরকম পরিস্থিতিতে ১০ বারে ৮ বারই হেরে যাবে দল। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা হয়তোবা টেনে-হিচড়ে ১২-১৩ পর্যন্ত উঠাতে পারবে। অন্য যে কোনো দেশের ব্যাটসম্যানই ২৪-২৫ রানের ওভার বানিয়ে ফেলবার সামর্থ্য রাখে। টি-টোয়েন্টি’র সীমানা খুব বড়ো থাকে না, চেষ্টা করলে ছক্কা মারা অসম্ভব নয়। কিন্তু টানা ছক্কা মারতে যে কিলার ইনস্টিংট লাগে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সেটা নেই। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা স্কুপ খেলে ফাইন লেগ দিয়ে চার মারবে, কিংবা কিপারকে ফাঁকি দিয়ে থার্ডম্যান দিয়ে চার মারবে, মাঝেমধ্যে এক্সট্রা কভারের উপর দিয়ে তুলে দিবে; লেন্থ ডেলিভারি বা শর্ট পিচ ডেকিভারিকে হাওয়ায় ভাসিয়ে গ্যালারিতে পাঠাবে সেই সাহসেরই অভাব রয়েছে৷ রিস্টে পাওয়ার নেই বলবো না, কিন্তু মারলে যে ছক্কা হবেই সেই কনফিডেন্স না থাকাতেই মূলত বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে বসে।

বিসিবি বর্তমানে যেভাবে বিকল্প দলগুলোর পেছনে পর্যাপ্ত খরচ করছে, এই ধারা আরো ২-৩ বছর অব্যাহত রাখলে টেস্ট টেম্পারমেন্টের বেশ কয়েকজন দক্ষ ব্যাটসম্যান পাওয়া যাবে আশা রাখছি।

সেই সাথে অতি দ্রুত নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং কোচকে আরো বেশি ক্ষমতা দেয়াটা জরুরী হয়ে পড়েছে। সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ এর ঘেরাটপ থেকে বেরিয়ে মোসাদ্দেক, তাইজুল জাতীয় কাউকে টেস্টে আর লিটন-মোসাদ্দেক জাতীয় কাউকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নেতৃত্বভার দিতে হবে। এতে দলের ওপর কোচের কর্তৃত্ব বাড়বে, এবং পরিবর্তন বললে সেটা সত্যিকারের পরিবর্তন হয়ে উঠবে।

শ্রীলংকা দল আস্তে আস্তে পুনর্গঠিত হচ্ছে। মধ্যবর্তী ৩-৪ বছরে তারা বেশ চরাই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। বাংলাদেশের জন্যও এরকম একটা সময় ডিউ হয়ে আছে; যত দ্রুত সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, স্ট্রাগলের সময় তত কমে আসবে।

মোসাদ্দেক বা লিটনের তো দলে জায়গাই নিশ্চিত নয়, তাই না, তাদের অধিনায়ক করতে চাওয়াটা অবিমৃশ্যকারিতা? যে ভিত্তিতে তাদের জায়গা নিশ্চিত নয়, একই ভিত্তি তো মাহমুদউল্লাহ, তামিম এদের জন্যও প্রযোজ্য, তারা তবে নিশ্চিত হলো কীভাবে?

সুতরাং ভাওতাবাজির গল্প বলা নিরর্থক। কেবলমাত্র কোচ দেখতে চেয়েছেন সেই কারণে বিপ্লব, শান্তদের দলে না ঢুকিয়ে তারা একাদশে সুযোগ পাবে সেই কনফিডেন্স থেকেই যেন জাতীয় দলে ডাকা হয় তাদের। কোচ দেখতে চাইলে তো জাতীয় দলের প্র‍্যাকটিস সেশনে ডাকলেই চলে। কেবল এই কারণে কাউকে মূল দলে নেয়া হলে জাতীয় দল তার গুরুগাম্ভীর্য হারিয়ে ফেলবে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট কোনোদিনই কেনিয়া বা জিম্বাবুয়ের পর্যায়ে যাবে না যদি আইসিসি নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে৷ তাদের টাকার অভাব ছিল, এমনকি আফগানিস্তানও ৩-৪ বছরের মধ্যে বড়ো সংকটে পড়বে যদি তাদের ক্যাশফ্লো পর্যাপ্ত না থাকে।

বিসিবির সেই সমস্যা নেই। খরচের ক্ষেত্রে কার্পণ্য করতো, লুটপাট বেশি করতো, বিপদ আঁচ করতে পারেনি। কিন্তু আগুনের উনুনে পড়লে সেখান থেকে উঠে আসার বুদ্ধি বের করতেই হবে। কারণ ক্রিকেটের হাইপ উঠে গেলে লুটপাটের সুযোগও সংকুচিত হয়ে আসবে। বিসিবির শীর্ষ লোকজন সব রাজনীতির মাঠ চড়ে বেড়ানো মানুষ, স্বার্থ আদায়ের বুদ্ধি তাদের যথেষ্ট থাকার কথা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই মুহূর্তে প্রায়োরিটি ২টি –

  • নেতৃত্বে পরিবর্তন
  • ফ্রেশ ব্লাডদের বেশি পরিমাণে রিক্রুট করা এবং সরকারি চাকরি নীতিতে থাকা তথাকথিত সিনিয়রদের পারফরম্যান্সের ব্যাপারে আরো ক্রিটিকাল হওয়া।

ব্যাকগ্রাউন্ড প্রায়োরিটিতে থাকবে –

  • বিকল্প দলগুলোর সিরিজ সংখ্যা আরো বাড়ানো এবং জারি রাখা

হাহুতাশ করা জনগণই ক্রিকেটের শক্তি। এরা যদিও খেলা খুব সিরিয়াসলি দেখে না, তবু এদের প্রতিক্রিয়া বিসিবিকে চাপে রাখবে। আর এন্টি-ক্রিকেট ফোর্সের জন্য একটা কথাই বলতে চাই-‘go and f**k yourself’!

আমি প্রায়ই ভাবি, বাংলাদেশের যে সমস্ত ক্রিকেটারকে প্রতিভাবান ভাবা হয় তাদের পারফরম্যান্স নেই কেন। প্রায় প্রতিবারই উত্তর আসে, তারা দলে থাকতে পেরেই সন্তুষ্ট; বিরাট কোহলি বা মিচেল স্টার্কের মতো বড়ো ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন বা সাহসই নেই, স্কিল ডেভেলপমেন্টে প্রবল অনীহা।

তখনই পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিই নিজেকে। আচ্ছা আমি তো ৭টা বই লিখে ফেললাম, আমার বই তো ৪০০ জন মানুষও পড়ে না। ৪ কোটি মানুষ আমার বই পড়বে, বুকার বা নোবেল পুরস্কার পাবো— সেই সাহস কি আমার আছে, কিংবা সে লক্ষ্যে আমি কতটুকু পরিশ্রম করি? আমার একটি লুপে আটকে পড়ার দায় কার, এবং লুপ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করি না কেন?

একটু পর নতুন প্রশ্ন আসে। আমি যে হিউম্যানল্যাব চালু করলাম মানুষ বা কোম্পানীর need analysis, problem analysis, research, psychological profiling এর কাজ করে দিতে, ১৭ মাসে যা করেছি তাতে কি আমি খুশি? অবশ্যই নই। আমি কেন খুশি হওয়ার মতো পারফর্ম করতে পারলাম না? এর দায় কার?

এসব আত্মসমালোচনার করিডোরে হাঁটতে গিয়ে আবিষ্কার করি, ক্রিকেটারদের মেন্টাল গ্রোথ- ভিশন- লেভেল আপগ্রেডেশনও একই কারণেই স্থবিরতায় ভুগে। চোখ সবই দেখতে পায় শুধু নিজেকে ছাড়া!

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সামর্থ্য এবং সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে জানি বলেই হেরে গেলে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট ম্যাচের গেমপ্ল্যান আর এটিচুডের সমালোচনা করি, ক্রিকেট গেল রব তুলি না।

ক্রিকেট কোথাও যাবে না, যাচ্ছে না, আপনার যাওয়ার তাড়া থাকলে চলে যেতে পারেন, তবু দুর্গন্ধযুক্ত বায়ুত্যাগ করে বায়ু দূষণ করবেন না কাইন্ডলি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।