বিশ্বকে বার্তা দেওয়ার জয়

জ্যাক ক্যালিস দক্ষিণ আফ্রিকাকে ছন্দে ফেরার আহবান জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ভাগ্য ভাল ম্যাচটা বাংলাদেশের সাথে। মোমেন্টাম ফিরে পাওয়াটা সহজ হবে।’

ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ছিলেন আরো এক কাঠি সরেস। বিশ্বকাপের আগে তিনি যে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন, তাতে তিনি বাংলাদেশের তেমন কোনো সম্ভাবনার কথাও দেখেননি। একটি মাত্র ম্যাচ জয়ের কথা বলেছিলেন, সেটাও আবার বাজে সময় কাটানো খর্ব শক্তির শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে।

দুঃশ্চিন্তায় টুইটারে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন জন্টি রোডস। বাংলাদেশের ব্যাটিং চলাকালে লিখেছিলেন, ‘এখন দুশ্চিন্তার সময়। দ্রুতই লড়াইয়ে ফিরতে হবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। নিজেদের সেরাটায় ফিরে এসো। ভালো জায়গায় বল করো। ইমরান তাহিরের আজ কি হলো! এটা ভালো ব্যাটিং পিচ। তবে বাংলাদেশকে বড় স্কোর করতে দেয়া যাবে না।’

শেষমেশ, জ্যাক ক্যালিসের ছন্দে ফেরার বার্তা, ম্যাককালামের ভবিষ্যৎ দেখা সত্যি হয়নি। জন্ডি রোডসের দুশ্চিন্তাটাই মিলে গেছে। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে বড় ইনিংস গড়ে ছিটকে ফেলেছে দক্ষিণ আফ্রিকাকে। বিশ্বকাপ শুরু করেছে ২১ রানের জয় দিয়ে। এই জয় বিশ্বের জন্য একটা বড় বার্তাই হয়ে রইলো। বিশ্বকাপে যে স্রেফ বাংলাদেশ দর্শক হতে নয়, নিজেদের সক্ষমতা দিয়েই টিকে থাকতে এসেছে – সেটা বাকি দলগুলোর বোঝা হয়ে গেল।

ব্যাট হাতে নেমে বাংলাদেশকে দুর্দান্ত শুরু এনে দেন দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার। ৫০ বলে ৬০ রানের জুটি গড়েন তারা। তবে ১৫ রানের ব্যবধানে প্যাভিলিয়নে ফিরেন তামিম-সৌম্য। এতে দারুণভাবে খেলায় ফিরে দক্ষিণ আফ্রিকা।

এরপর বড় জুটি গড়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে লড়াই থেকে ছিটকে দেন বাংলাদেশের তিন ও চার নম্বর ব্যাটসম্যান – সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম। গড়েন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের জুটির রেকর্ড।

তৃতীয় উইকেটে ১৪১ বলে ১৪২ রান যোগ করেন এই দু’জন। এর মাধ্যমে ভেঙে যায় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিমের রেকর্ড । ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পঞ্চম উইকেটে ১৪৩ বলে ১৪১ রান করেছিলেন মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিক।

আটটি চার ও এক ছক্কায় ৮৪ বলে ৭৫ রান করেন সাকিব। অন্যদিকে আট চারে ৮০ বলে ৭৮ রান করেন মুশফিক। মুশফিকের আগেই সাজঘরে ফেরা মারমুখী মেজাজে শুরু করা মোহাম্মদ মিঠুন ২১ বলে করেন ২১ রান। তার ছোট্ট ইনিংসে ছিলে দু’টি চার ও একটি ছক্কা।

দলীয় ২৫০ রানে ৫ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। তখন ইনিংসের ৪৭ বল বাকী ছিলো। সেই অবস্থায় ৩০০ রানের ওপর ইনিংসটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকলেও সেটা উড়ে যায় মোসাদ্দেক হোসেন ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ব্যাটে।

দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারদের উপর চড়াও হন দু’জন। ফলে ৪৮ তম ওভারেই ৩০০ রানের মাইলফলক ছুয়ে ফেলে বাংলাদেশ। ৪৯ তম ওভারের শেষ বলে আউট হন মোসাদ্দেক। মাহমুদউল্লাহ’র সাথে ষষ্ঠ উইকেটে মাত্র ৪১ বলে ৬৬ রান যোগ করেন মোসাদ্দেক। আউট হওয়ার আগে মোসাদ্দেক করেন ২০ বলে ২৬ রান। ইনিংসে ছিল চারটি চার।

আট নম্বরে নামা মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে পরবর্তীতে ইনিংস শেষ করেন রিয়াদ। তাঁর ৩৩ বলে অপরাজিত ৪৬ রানের সুবাদে ৫০ ওভারে ৬ উইকেটে ৩৩০ রানের বড় সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহ’র ইনিংসে ছিল তিনটি চার ও একটি ছক্কা ছিলো। মিরাজ তিন বলে পাঁচ রান করে অপরাজিত থাকেন।

বিরতির পর, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা – দু’দলই সমান তালে লড়ছিল। তবে, শেষের দিকে ক্রমাগত উইকেট তুলে নিয়ে লড়াইটা জমিয়ে তুলেন বাংলাদেশের দুই পেসার মুস্তাফিজুর রহমান ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। একে একে ডেভিড মিলার, ভ্যান ডার ডুসেন, অ্যান্ডাইল ফেলুকওয়াও, জেপি ডুমিনিরা সাজঘরে ফিরে যান।

৪৮ তম ওভারের প্রথম বলে অষ্টম উইকেটের পতন হয় প্রোটিয়াদের। বোর্ডে রান তখন ২৮৭। সেখান থেকে আর টেল এন্ডারদের পক্ষে ম্যাচ বের করা সম্ভব ছিল না। রাবাদা-তাহিরদের চেষ্টা কোনো কাজেই আসেনি।

২০০৭ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যখন দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিয়েছিল তখন সেটা বিশ্বের চোখে ছিল কেবলই একটা ‘অঘটন’। ২০১১ বিশ্বকাপে সাকিবরা তো মিরপুরে এই দলটার বিপক্ষেই ৭৮ রানে অল আউট হয়ে বসে। সেই বাস্তবতা গেল আট বছরে উড়ে গেছে কবে। এখন এমন জয় তাই খুবই স্বাভাবিক। আর ম্যাচ জিতে ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিয়ে সাকিব তো বলেই দিলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপে এসেছি নিজেদের প্রমাণ করতে!’

সেই প্রমাণের শুরুটা একদম শুরুর ম্যাচ দিয়েই করলো বাংলাদেশ!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।