বেশি রান দেওয়ার নেপথ্য কারণ: দক্ষতা নাকি পরিকল্পনায় ঘাটতি!

বিশ্বকাপে আমরা তিনটি ম্যাচ জিততে পেরেছি এবং সবগুলোতে সাকিব ম্যান অফ দা ম্যাচ। তাই সাকিবকে অনেক গুলো প্রেস কনফারেন্স করতে হয়েছে। সাকিব বরাবরই স্পষ্টভাষী। আবেগে বশীভূত হয়ে কখনো মিথ্যা স্বপ্ন দেখায় না, মিথ্যা বলেও না। যা সত্যি তাই বলে, কারো খারাপ লাগলো কি ভালো লাগলো তার ‘থোড়াই কেয়ার’ সাকিব করে।

ক’দিন আগে এমনই এক প্রেস কনফারেন্সে সাকিব বললো, ‘হতে পারে আমাদের এক্সপ্রেস পেসার নেই, রিষ্ট স্পিনার নেই, কিন্তু  আমাদের বোলিং ইউনিট ওডিআই এর জন্য যথেষ্ট স্মার্ট।’ যেহেতু সাকিব বলেছে তাই মেনে নিয়েছিলাম তবে এবার কি সাকিব সত্যি বললো?

এবার প্রসঙ্গে আসা যাক।

প্রশ্ন হলো, এই যে আমরা প্রায় সব ম্যাচে রানের বন্যা বইয়ে দেই, এটা কেন হচ্ছে? আমাদের বোলিং স্কিল কি প্রশ্নবিদ্ধ? ৫০ ওভারে ৩০০+ দেয়া কি সাধারণ ঘটনা?

খুব সহজে যদি এক কথায় উত্তর দেয়া যায়, ইংল্যান্ডের গত ৪ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হ্যা। এটা মোটামুটি স্বাভাবিকের আওতায় পড়ে এমন একটা ব্যাপার। পাকিস্তানও একমাস আগে টানা ৪ ম্যাচে ৩০০+ রান দিয়েছে।

কথা হলো, আমরা তো ৩০০ দেই না, আমরা ৩৮০ দেই এবং খুব সুক্ষভাবে  দেখলে তা অবশ্যই আমাদের বোলিং স্কিল এবং বোলিং প্ল্যান দুটোকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করবে।

স্কিল দিয়ে শুরু করি, প্রতি ম্যাচে এতো রান দেবার সবচেয়ে বড় কারণ হলো শুরুতে আমাদের উইকেট না নিতে পারা। এ বছর আমরা ১৩ টি সম্পূর্ণ ওয়ান ডে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ খেলতে পেরেছি। যার তিনটা নিউজিলান্ডের মাটিতে, চারটা আয়ারল্যান্ড এবং ৬টা এই বিশ্বকাপে অর্থাৎ ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের মাটিতে খেলেছি। মোদ্দাকথা সব ম্যাচ হয়েছে বিদেশের মাটিতে যেখানে স্পিন সহায়ক উইকেট সচরাচর দেখা যায় না।

একটা দুশ্চিন্তাদায়ক পরিসংখ্যান বলি, এই ১৩ টি ম্যাচে প্রথম ১০ ওভারে আমরা উইকেট নিয়েছি মাত্র ৯ টি। মানে ১৩ ম্যাচে ১৩০ ওভারের প্রথম পাওয়ার প্লে-তে আমরা উইকেট পেয়েছি মাত্র ৯ টি!

যার মধ্যে আবার দু’টি সাকিবের নেয়া, যা সে এই বিশ্বকাপে নিয়েছে ফার্স্ট চেঞ্জ বোলার হিসাবে এবং একটি রান আউটও হয়েছে। মাশরাফি, সাইফউদ্দিন, মুস্তাফিজ, রুবেল, মিরাজ, রাহি এমনকি সাকিব সবাইকে দিয়ে ইনিংসের শুরু করা হয়েছে এর মধ্যে, যা অবশ্যই দোষের না। প্রতিপক্ষ এবং পরিবেশ বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন অপশন দিয়ে বোলিং করানো হয়েছে।

কিন্তু, সমস্যা হলো অন্য জায়গায়, শুধুমাত্র এই বিশ্বকাপ বিবেচনায় বাকি সব দল প্রথম দশ ওভারে উইকেট নেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে এগিয়ে। এমনকি শ্রীলংকা যাদের ২ ম্যাচ বৃষ্টির কারণে হয় নি তারাও আমাদের থাকে বেশি উইকেট নিয়েছে প্রথম দশ ওভারে।

পরিসংখ্যানটা এখানে এজন্য তাৎপর্যপূর্ণ কারণ বাংলাদেশের বাইরে যেখানে আমরা স্পিন সহায়ক উইকেট পাই না খুব স্পেসিফিক্যালি বললে যেসব উইকেট ‘স্লো অ্যা ন্ড লো’ হয় না, সেখানে আমরা আমাদের স্পিন বোলারদের অ্যাটাকিং বোলার হিসাবে ব্যবহার করতে পারি না। তখন তারা হয়ে যায় রান আটকানোর বোলার।

আর তখন যারা অ্যাটাকিং বোলিং করবে অর্থাৎ নতুন বলে আমাদের পেসাররা অধৈ সাগরে পড়ে বলে মনে হয়। তাদের উইকেট টেকিং ডেলিভারি অথবা রান আটকানোর মতো বোলিং কোনো কিছুই চোখে পড়ে না। তাদের স্কিলের কমতিগুলো চোখের সামনে চলে আসে।

তবে আমরা যে একদম স্কিললেস একটা বোলিং ইউনিট নিয়ে খেলতে নামি তা কিন্তু ঠিক নয়। গত চার বছরে আমাদের সবচাইতে ভালো যে জিনিসটা হয়েছে তা হলো আমাদের ডেথ ওভার বোলিং। মূলত গত চার বছরে আমাদের অনেকগুলো ম্যাচ জেতার প্রধান কারণ হলো, ডেথ ওভারে মিতব্যয়ী বোলিং।

যদিও মুস্তাফিজ ছাড়া বিশ্বমানের ডেথ ওভার স্পেশালিস্ট আমাদের ছিল না। তবুও এটা না বললেই নয় যে মাশরাফির বুদ্ধিদিপ্ত ক্যাপ্টান্সির কারণে আমরা প্রায় ম্যাচেই ওপনেন্টকে একটা এভারেজ রানে আটকে রাখতে পেরেছি ।

স্লো বাউন্সার, ইয়র্কার, চেঞ্জ অফ পেস, কাটার এই চারটা জিনিস মুস্তাফিজ ভালো আয়ত্ত্ব করতে পরেছে এবং ডেথ ওভারে এই গুলো দিয়েই রান ভালো আটকে রাখতে পারে। ইদানিং কালে সাইফও খুব ভালো করছে শেষ ওভার গুলোতে। আমার কাছে ওর ভেরিয়েশন স্কিলগুলো মুস্তাফিজের চাইতেও বেশি ভয়ানক মনে হয়।

তবে হ্যা, স্কিলগুলোর এক্সিকিউশনে হয়তো সাইফ একটু পিছিয়ে। সাইফের ভেরিয়েশন গুলো হলো ইয়র্কার, স্লো ইয়র্কার, ওয়াইড ইয়র্কার, স্লো বাউন্সার, কাটার, বাম্পার (যেটাকে টেনিস বল বাউন্সার বলে অনেক কমেন্ট্রেটর), এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি লো ফুলটস বলও তার ভেরিয়েশনের অংশ।

এবার আসা যাক পরিকল্পনার ব্যাপারে।

বেশি পুরোনো রেফারেন্স টানবো না শুধু এই বিশ্বকাপের গুলো যদি দেখি প্রথম ম্যাচের পরে আর কোনো ম্যাচে মাশরাফি মুস্তাফিজকে দিয়ে ১০ ওভার করায় নি। যেখানে আমরা ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে ৩৮০+ , উইন্ডিজের সাথে ৩২০+ দিলাম সেখানে দলের বেস্ট উইকেট টেকার তার পুরো ১০ ওভার করলো না কেন তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না, অস্ট্রেলিয়ার সাথে মনে হলো মাশরাফি হিসাবে গরমিল করে ফেলেছে, রুবেল ২৫ রান দেয়াতে সৌম্যকে নিয়ে আসলো বোলিংয়ে , আসলে রুবেলের করা ওই ৪৬ তম ওভার করার কথা ছিল মুস্তাফিজের যেহেতু তখনও মুস্তাফিজের ৩ ওভার বাকি ছিল।

শেষমেশ মুস্তাফিজ করলো ৪৮ এবং ৫০ তম ওভার। ওর এক ওভার বাকিই রয়ে ছিল। ইংল্যান্ডের সাথেও নিজে ৪৯ তম ওভার করলো আর মুস্তাফিজকে ৯ ওভার করে রেখে দিলো, আবার নিউজিল্যান্ড এর সাথে যখন উইকেট দরকার তখন ফিজ করলো মাত্র ৭ ওভার অথচ মুস্তাফিজ গত চার বছরে আমাদের সবচাইতে পরীক্ষিত উইকেট টেকার।

শুধু আমাদের কেন সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ, করাচি কিংস, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স পর্যন্ত মুস্তাফিজকে উইকেট টেকার হিসাবে খেলিয়েছে। আশার কথা হচ্ছে, মনে হয় অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচের পর মাশরাফি তার করা এই ভুল বুঝতে পেরেছে এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে মুস্তাফিজের ওভারগুলো ওভাবে সাজিয়েছিল যাতে মুস্তাফিজ ৪৮ এবং ৫০ নম্বর ওভার করতে পারে। খারাপ লাগে যখন প্রেস কনফারেন্স কোনো সাংবাদিক মাশরাফিকে এই প্ৰশ্ন গুলো করে না।

আরো একটা ব্যাপার না বললেই নয়, ফিঞ্চ আউট হবার পরও মাশরাফি অনেক লম্বা সময় সৌম্যকে দিয়া বোলিং করিয়েছে, এটা খুব চোখে লাগছিলো। আমরা উইকেট নিতে পারছিলাম না তাই মাশরাফি তার সর্বস্ব চেষ্টা করছিলো একটা উইকেট নেবার। সৌম্য উইকেট পেলো তার প্রথম ওভারে।

মাশরাফি তারপর সৌম্যকে দিয়ে টানা ৫ ওভার করলো, কিন্তু কেনো? যখন নতুন ব্যাটসম্যান আসে তখন তাকে তাড়াতাড়ি আউট করানোর জন্য কাপ্তান তার বেস্ট অপসন ব্যবহার করে। টেস্ট কিংবা ওয়ানডে অথবা টি-টোয়েন্টি সব জায়গায় এটাই ক্রিকেটের একটা মৌলিক বিষয়।

কিন্তু মাশরাফি টানা সৌম্য এবং মিরাজ দিয়ে বল করলো যত্ক্ষন না খাজা সেট হয়। নিশ্চিতভাবে মাশরাফির কাছে ওই সময় অপশন হিসাবে রুবেল, মুস্তাফিজ, সাকিবের যথেষ্ট ওভার ছিল। মাশরাফি সৌম্যকে চেঞ্জ করলো যখন সৌম্য এক ওভারে ১২ রান দিলো এবং সত্যি বলতে আগে থেকে এটাই মনে হচ্ছিলো যতক্ষণ তারা সৌম্যকে মারবে না ম্যাশ ওকে দিয়া বোলিং করবে।

দিন শেষে সৌম্য অনেক ভালো একটা ফিগার দিয়েছে সেটা অন্য কথা, কিন্তু খাজা ক্রিজে আসার পর প্রথম জেনুইন পেস বল খেলেছে তার ৪৩তম বলটায়, এই ওয়ার্ল্ড কাপে খাজা খুব বাজে ফর্ম দিয়ে যাচ্ছিলো একমাত্র এক ইনিংস-এ ৪২ ছাড়া বাকি কোনো ম্যাচে ভালো করতে পারছিলো না, ১০-২০ এর মধ্যে আউট হচ্ছিলো। আমরা প্রেসার ক্রিয়েট না করে মিরাজ আর সৌম্যর অপেক্ষাকৃত কম ভয়ানক বল দিয়ে ওকে ফর্মে ফিরার সুযোগ করে দিলাম। এটা একটা পরিকল্পনার ভুল ছাড়া আর কিছুই না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।