টেস্ট ম্যাচ পূর্ব চোরাগলি সমূহ

পাঁচ দিন দৈর্ঘ্যের কারণে টেস্ট কখনোই দেখা হয় না। যে ম্যাচ বল বাই বল দেখি না সেটাকে আমি দেখা হিসেবে স্থান দিই না। হাইলাইটস দেখে টেস্ট ম্যাচ নিয়ে আহ্লাদ দেখানো হিপোক্রেসি মনে হয়, তার চাইতে টেস্ট দেখি না এটা বলাই শুদ্ধাচার মনে হয়।

এমনকি বাংলাদেশের টেস্ট ম্যাচও বল বাই বল দেখতে পারিনি কখনো, যেটা ওয়ানডেতে একদমই মিস করি না।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট শুরু হচ্ছে আজ। খুব উচ্ছ্বাস কাজ না করলেও কিছু ভাবনা তো তৈরি হয়েছেই। সেসব নিয়ে কথা চলতে পারে।

  • চোরাগলি ১

মিরপুরের বিশ্রি উইকেটে লাট্টুর মতো বল ঘুরিয়ে উইকেট নিয়ে ম্যাচ জেতার ট্রেন্ড শুরু হয়েছে দুই বছর ধরে। টেস্টে হাবুডুবু খাওয়া একটা দল জিততে পারছে এটা অ্যাপ্রিশিয়েটযোগ্য, রেজাল্ট ম্যাটারস। কিন্তু নামমাত্র একজন পেসার নিয়ে তাকে দিয়ে ৩-৪ ওভার বোলিং করিয়ে পেসার ধ্বংসের যে ফরমুলা তৈরি করছে সাকিব, এজন্য তার প্রতি নিন্দা জানানো উচিত। অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড বাউন্সি পিচ বানালে সমস্যা নেই, আমরা স্পিনিং ট্র‍্যাক বানালে দোষ কেন, এটা অত্যন্ত শিশুতোষ পর্যায়ের জিজ্ঞাসা। আপনি হোমে যে কয়টা সিরিজ খেলবেন, অ্যাওয়েতেও সমান সংখ্যক সিরিজ খেলতে হবে। হোম কন্ডিশনের সুবিধা সবাই নেয়, কিন্তু সুবিধা নেয়া আর এক্সপ্লোয়েট করা, দুটো ভিন্ন ব্যাপার।

খুবই ভাগ্যবশত এবারের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের এশিয়ান কন্ডিশনের বাইরে কোনো সিরিজ পড়েনি। তবু শ্রীলঙ্কা বা ভারতের উইকেটও কি মিরপুর বা চট্টগ্রামের উইকেটের মতো স্পিন মাইন? সেখানে অন্তত কিছুটা হলেও ভারসাম্য থাকে। কালকের একাদশে এমনকি একজন পেসারও যদি না রাখা হয়, অবাক হবো না। উপরন্তু মোসাদ্দেককে ৮ এ খেলিয়ে মিরাজ, তাইজুল, নাঈম, সঙ্গে সাকিব মিলিয়ে স্পিনার নামিয়ে দিতে পারে, কারণ মোসাদ্দেক স্পিন ভালো খেলে এবং কোয়ালিটিতে আফগানিস্তানের স্পিনাররা এগিয়ে থাকায় ব্যাটিং গভীরতা বাড়ানোর সতর্ক পরিকল্পনা নিতেও পারে। রাহিকে খেলালেও তো ৫-৬ ওভারের বেশি বোলিং করানো হবে না,ওটা করা না করা একই কথা। এমনটা ঘটলে এর চাইতে বিচ্ছিরি খেলা ২য়টি হবে না।

  • চোরাগলি ২

ক্রিকেট খেলাটা মোমেন্টাম নির্ভর। মুশফিক যদি কিপিংয়ের অজুহাতে ৬ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশের এই টেস্টে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। বাংলাদেশের টপ অর্ডারে খেলবে সৌম্য, সাদমান, মমিনুল। তিনজনই স্পিনের বিপক্ষে মারাত্মক রকম দুর্বল, এরকম তিনটি নড়বড়ে উইকেট শুরুতেই বিপদের মুখে ঠেল দিলে মোমেন্টাম আফগানিস্তান নিয়ে নিবে। ৪ নম্বরে যদি লিটন বা মিঠুনকে খেলানো হয় সেই প্রেসার সামাল দেয়ার মতো ম্যাচিউরিটি তাদের হয়নি। সাকিব আর মুশফিক যদি ৫,৬ এ খেলে ততক্ষণে ইনিংসের লেজে গোবরে অবস্থা।

এরকম স্পিন যুদ্ধে কোন বিবেচনায় সৌম্যকে দিয়ে ওপেন করানোর চিন্তা করানো হচ্ছে এর কোনো ক্রিকেটিয় যুক্তি নেই। স্পিন খেলার দক্ষতায় সৌম্যের চাইতে লিটন এগিয়ে, তাকে আমি টেস্ট ওপেনার হিসেবে পছন্দ করি না, মিডল অর্ডারে দেখতে চাই। কিন্তু শুধুমাত্র এই টেস্টের কনটেক্সট এ লিটনকে ওপেনে উঠিয়ে আনা উচিত। শুনতে উদ্ভট লাগলেও, সাকিবের এই টেস্টে ৩ এ খেলা উচিত, তাতে আফগানিস্তান মোমেন্টাম নিতে পারবে না।

চার নম্বর পজিশন মমিনুল আর মুশফিকের মধ্যে ফ্লেক্সিবল রাখা উচিত, পরিস্থিতির বিবেচনায় সিদ্ধান্ত। চট্টগ্রামে মমিনুলের গড় অনেকটাই ব্র‍্যাডম্যান পর্যায়ের, তবু কোয়ালিটি স্পিন বোলিংয়ের বিপক্ষে তার নড়বড়তা ইতোমধ্যেই বহুবার দেখা গেছে; তাছাড়া টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসেই দুই দলেই অল স্পিন এটাক সমৃদ্ধ বোলিং লাইন আপ খুব বেশি দেখা যায়নি সম্ভবত। সুতরাং এই ম্যাচের জন্য পরিকল্পনা হতে হবে পুরোপুরি কাস্টমাইজড। মাহমুদউল্লাহ ৬ এ, ৭ এ মোসাদ্দেক; সৌম্যকে দিয়ে অহেতুক ওপেন করিয়ে তার কনফিডেন্স নষ্ট করার কারণ দেখি না। বাউন্সি কন্ডিশনে টেস্টে তাকে দিয়ে চলতে পারে, অন্যথায় তাকে শুধুমাত্র সাদা বলের ক্রিকেটের জন্যই প্রস্তুত রাখা উচিত; ক্যারিয়ারের ৫ বছর হয়ে গেছে, এখন তো বোঝা উচিত তাকে দিয়ে কী হবে, আর কী একেবারেই হবে না।

  • চোরাগলি ৩

বৃষ্টিবিঘ্নিত না হলে এই ম্যাচের ব্যাপ্তি বড়োজোর তৃতীয় দিনের শেষ বিকেল অথবা চতুর্থ দিন লাঞ্চের আগ পর্যন্ত। যে দল আগে ব্যাটিং পাবে তারাই এগিয়ে যাবে। আফগানিস্তানের দুই ওপেনারকে নিয়ে বিস্তর লেখা পড়েছি, বাংলাদেশ ‘এ’ দলের বিপক্ষে তাদের পারফরম্যান্স নিয়েও জেনেছি, তবু দলটা আফগানিস্তান বলেই তাদের ব্যাটিংয়ের অ্যামেচারপনার ব্যাপারে আশাবাদী আমি। জাতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই আফগান ব্যাটসম্যানদের টেস্ট টেম্পারমেন্ট অত্যন্ত দুর্বল হওয়া অনিবার্য।

তবু বাংলাদেশের স্লিপ ফিল্ডারদের দুর্বলতার সুযোগে তারা ব্যতিক্রমী কিছু ঘটিয়ে ফেলতেও পারে ( সেই সম্ভাবনাও কম; নাঈম আর তাইজুলের বোলিংয়ে লেগবিফোর হয়েই ফিরতে পারে বেশ কয়েকজন)। বাংলাদেশ যদি ব্যাটিং অর্ডার সাজানো নিয়ে অমার্জনীয় ভুল না করে এই ম্যাচে আফগানিস্তানের আসলেই সম্ভাবনা দেখি না, বরং আগে ব্যাটিং পেলে বাংলাদেশের ইনিংসে একাধিক সেঞ্চুরির দেখা পাওয়া যেতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবকিছুই এতো প্রেডিক্টেবল যে সৌম্য, সাদমান আর মমিনুল সমৃদ্ধ টপ অর্ডার দেখাটা কোহলির ভারতের হয়ে খেলার চাইতেও নিশ্চিত, এবং সে কারণেই চোরাগলিগুলো চোরাবালির মতো লাগছে। দেখা যাক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।