‘বাঙালি যেনো হঠাৎ করে বদলে গেল’

বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের উপ-কম্যান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন একজন পরিবেশবিদ (সাবেক পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর)। তবে, তাঁর আদি ও অকৃত্রিম পরিচয় তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা’। ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে ভর্তি হন, ১৯৬৯-১৯৭২ ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কি দারুন উন্মাতাল এক সময়ে তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন ভাবলে রোমাঞ্চিত হই! ২৫ এবং ২৬ মার্চ, তিনি ফজলুল হক হল এবং কার্জন হলে অবরুদ্ধ ছিলেন। ২৭ মার্চ ভোরে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন অজানার উদ্দেশ্যে। সেই দু’রাত একদিকে প্রচণ্ড আতঙ্ক আর অন্যদিকে যা কিছু আছে তাই নিয়েই লড়াই করার মনোবল নিয়ে কাটিয়েছেন তাঁরা।

১৯৬৯-১৯৭২ সালের পুরো অভিজ্ঞতা তাঁর রচিত ‘যুদ্ধদিনের গল্প ও স্মৃতির কৈশোর’ বইতে আছে। গেরিলা ১৯৭১ পরিবার কৃতজ্ঞ, স্বল্পভাষী, বিনয়ী ও স্নেহময় মানুষটির কাছে। ইতিহাসের একটি অসামান্য ঘটনা এ লেখায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। আজ এতগুলো বছর পর আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনা, স্রেফ মলোটভ ককটেল নিয়ে একটি পূর্ণ সজ্জিত সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হবার। একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন সেই বীরত্ব দেখিয়েছেন। যদিও ককটেল ব্যবহার করা হয়নি আর। ২৫ মার্চের কালরাত তিনি কাটিয়েছিলেন কার্জন হলের ছাদে। অবিশ্বাস্য বর্ণনার কিছু অংশ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে বীর মুক্তিযোদ্ধার লেখাটিই আমরা তুলে ধরছি পাঠকদের জন্য।

__________

একজন মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির পাতা থেকে: অবরুদ্ধ ঢাকা বিশবিদ্যালয়ে কাটানো ২৫ এবং ২৬ র্মাচ, ১৯৭১

গুলিস্তানের দিক থেকে প্রথম আওয়াজটা শুনতে পেলাম। তার পর যেন হাজারো কামানের বর্ষণ এক সঙ্গে শুরু হয়ে গেলো। আমরা হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। আর্তনাদ করে উঠলো কেউ কেউ। চোখে মুখে অন্ধকার। মৃত্যুর ভয়ালরূপ ছায়া ফেলেছে সবার চোখে-মুখে। আনোয়ার, (কর্নেল তাহেরের বড় ভাই এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপার্চায), একমাত্র আনোয়ারই সবাইকে সাহস যোগাচ্ছে। এদের সাথে মোকাবেলা করে হলেও আমাদের জয়ী হতে হবে, এরকম বলতে লাগলো সে। কিন্তু এই দানবীয় শক্তির বিরুদ্ধে আমরা লড়বো কি নিয়ে? আমরা তখন কি করবো বা কি করা উচিত ঠিক করতে পারছিলাম না। দ্রুত হেটে চলে এলাম হলের মূল গেটে। হলের বাকি ছাত্ররা, হাউজ টিউটররাও তখন এই গেটে জমায়েত। একজন হাউজ টিউটর বললেন, রাতেই সেনারা হল রেইড করতে পারে, সুতরাং ছাত্রদের হলে থাকা ঠিক হবে না। তিনি আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা বরং কার্জন হলে বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রাত কাটানোর চেষ্টা করো।

হাউজ টিউটরের পরামর্শমতে অনেকেই কার্জন হলের দিকে চলে গেলো। আমরা সূর্যসেন স্কোয়াডের সদস্যরা তখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না কি করবো। একজন বললো আমরা আমাদের তৈরি মলোটভ ককটেল এবং দুটি বন্দুক নিয়ে ছাদে অবস্থান নিলে কেমন হয় (তখন দুটি বন্দুক আমাদের দখলে)। আমরা বাকিরা সকলেই তাঁর প্রস্তাবে সায় দিলাম এবং দ্রুত আমাদের গোপন আস্তানা থেকে ককটেল এবং বন্দুক নিয়ে ছাদের উপরে উঠার প্রস্তুতি নিলাম। এ সময়ে হলের একজন দারোয়ান বললো, ছাদে উঠার জন্য কোন সিঁড়ি নেই। একটা কাঠের সিড়ি আছে, ছাদে উঠতে হলে তাঁরা ঐ সিঁড়ি ব্যবহার করে। ঐ সিঁড়ি দিয়েই আমরা ছাদে উঠলাম এবং সিঁড়িটাকেও আমাদের সঙ্গে টেনে তুলে ফেললাম। আনোয়ার দলনেতা হিসেবে আমাদের কার অবস্থান কোথায় হবে, সে বিষয়ে তার পরামর্শ জানালো। তার পরামর্শ অনুসারে আনোয়ার, আমি এবং জুলফিকার (প্রাক্তন উপ-সচিব) অবস্থান নিলাম সিঁড়ির মুখে। আমাদের সাথে থাকলো কয়েকটি ককটেল এবং একটি বন্দুক। বাকি ৪ জনের দুজন, দুজন করে দুপাশে দুটি গম্বুজের নিচে। তাদের কাছে ও এরকম গোলাবারুদ থাকলো। ছাদে উঠার পর আমরা শপথ নিলাম আমাদের দেহে এক বিন্দু রক্ত থাকতেও আমরা বিনা যুদ্ধে ঐ নরপিচাশদের কাছে নতি স্বীকার করবো না এবং মরতেই যদি হয় তবে ওদের কয়েকটিকে মেরে মরবো। আমরা হবো প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রথম কাতারের শহীদ।

আমরা ছাদে উঁবু হয়ে শুয়ে প্রহর কাটাচ্ছি আর মাঝে মাঝে মাথা তুলে চারিদিকে কি হচ্ছে দেখে নেয়ার চেষ্টা করছি। চারিদিক থেকে বিকট আওয়াজ এবং আর্তনাদের শব্দ কানে আসছে আর আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাচ্ছি। মাঝে মাঝে পাল্টা বন্দুক বা রাইফেলের আওয়াজও শুনতে পাচ্ছিলাম। মধ্যরাতের পর পর পুরাতন ঢাকার দিকে শুধু আগুন আর আগুন দেখতে পাচ্ছিলাম। হঠাৎ সব আওয়াজকে ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এবং তারই সাথে একেকটা বিকট আওয়াজের সাথে সবকিছুর শেষ। আমরা আতঙ্কের সঙ্গে প্রহর গুনছি কখন না ঐ নরপিচাশরা আমাদের হলে ঢুকে পড়ে। এমনি আতঙ্কের মধ্যে আমাদের সময় কাটতে লাগলো। রাত্রি তখন ভোরের দিকে। আমার মনে হচ্ছিল, বোধ হয় দিনের আলোতে ওরা ঐ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাবেনা। কিন্তু যখন দেখলাম ফজরের আজানের ধ্বনি ছাপিয়ে তাদের কামানের শব্দের বিকট আওয়াজ আরো বেড়েই চললো, তখন বাঁচার সেই ক্ষীণ আশাও মিলিয়ে গেলো। সারা রাত ধরে তাদের আক্রমণের ধারা এমন ছিল যে প্রথম কি একটা যেনো ছুড়ে পুরো এলাকাকে আলোকিত করে তারপরে চালায় নির্বিচারে গুলি। ভোরের আলো মাত্র ফুটছে তখনই দেখলাম দুটি ট্যাংক আমাদের পাশের রাস্তা দিয়ে গুলি ছুড়ে ছুড়ে পুরনো ঢাকার দিকে যাচ্ছে। আমরা তখন ছাদে থাকা আর নিরাপদ মনে করলাম না। নিচে নেমে এলাম।

আমাদের ফজলুল হক হলে তখন পানি নেই, বিদ্যুত নেই। সারা শহরেই তখন এই অবস্থা। হলে খাবার দাবারের কোন ব্যবস্থা নেই। একদিকে ক্লান্তিকর রাত্রির অবসান, অন্যদিকে ক্ষুধার জ্বালা আর কোন সময় নরপিশাচরা হলে এসে আমাদের সবাইকে মৃত্যুর বিছানায় শুইয়ে দেয় এই দুশ্চিন্তায় সবার মানসিক অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। কেউ কারো সাথে কথা বলতে পারছিনা। দিনের আলোতে কোন আশ্রয়ই আর আমাদের কাছে নিরাপদ মনে হচ্ছে না। একজন প্রস্তাব করলো, হলের প্রতিটি ফ্লোরে কোনার দিকের বাথরুম সমূহে দিনের সময়টা কাটানো নিরাপদ হবে। আরেকজন প্রস্তাব করলো, ছাদের পানির ট্যাংকি গুলো আরো নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে। কেউ কেউ তখন ঐসব নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটলো। সূর্যসেন স্কোয়াডের আমরা যারা সদস্য, আমরা প্রত্যেকে দুটি করে ককটেল সঙ্গে নিয়ে যে যার কক্ষে আশ্রয় নেয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম।

সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর হতে চললো। পাশের রাস্তায় তখনো ট্যাংকের গরগর শব্দ এবং মাঝে মাঝেই নানা অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনতে পাচ্ছি। ঐ অবস্থায় আমার বাথরুম চাপলে আমি দরজা খুলে নিচু হয়ে বারান্দার রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে হল গেটের দিকে যেই না তাকালাম, তখনই দেখি একটা জীপে করে ১০/১২ জন সৈন্য হলের ভিতরে ঢুকছে। আমার মনে হলো, ওরা যেনো সাক্ষাৎ যমদূত। লক্ষ্য করলাম, ওদের দলপতিসহ সবাই অস্ত্র তাক করে চারিদিকে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুক্ষণ পর হল গেটের দারোয়ানকে ডেকে আনলো। ঐ দারোয়ানটি ছিল বিহারী, উর্দুভাষী। দলপতি ঐ দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলো হলে কোন দুষ্কৃতিকারী আছে কিনা? দারোয়ানটি বুদ্ধি করে উত্তর দিলো, এই হলটি ভাল ছাত্রদের হল। এই হলে কোন আন্দোলনকারী থাকে না। হল বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই বাড়ি চলে গেছে।

নিজ বাসভবনে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের উপ-কম্যান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন।

দারোয়ানের উত্তরে সন্তুষ্ট হলো কিনা জানিনা, দলপতির নির্দেশে চারজন সৈন্য চারিদিকে গুলি ছুড়তে লাগলো। তাঁরা হয়তো ভেবেছিলো প্রতিরোধ আসবে। যখন দেখলো যে, কোন পাল্টা গুলি আসছেনা, তখন তারা হয়তো দারোয়ানের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করলো। কিন্তু তখনই দেখলাম অফিসারটির মেজাজ বিগড়ে গেলো। সে তখনো হল গম্বুজের শীর্ষে উড়তে থাকা বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত স্বাধীনতার পতাকার দিকে তাকিয়ে দারোয়ানকে চার্জ করতে থাকলো, এখানে যদি কোন দুষ্কৃতিকারী না থাকে তাহলে এই ‘জয় বাংলা’র পতাকা উড়ছে কেনো? তাকে তখনই ঐ পতাকাটাকে নামিয়ে আনতে নির্দেশ দিলো। দারোয়ানটি দৌড়ে গিয়ে পতাকাটি নামিয়ে নিয়ে এলে অফিসারটি ঐ পতাকাটিকে তার পায়ের তলায় দুমড়ে মুচড়ে তারপর এক সিপাহীকে বললো আগুন ধরিয়ে দিতে। আমার হৃদস্পন্দন তখন প্রায় বন্ধ হয় অবস্থা। এই বুঝি আমাকে দেখে ফেলে রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে। তখনো বেঁচে আছি পরীক্ষা করার জন্য গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম। পতাকা পোড়ানোর পর পরই দেখলাম ওরা জীপে আবার উঠে বসেছে। যাবার সময় দারোয়ানটিকে শাসিয়ে গেলো, তারা আবার আসবে। জীপসহ সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর আরো যারা বিভিন্ন কক্ষে ছিলো তাদেরকে এ খবর দিলাম। বাথরুমে যারা লুকিয়ে ছিল তাদেরকে ও খবর দিলাম এবং বললাম হলে থাকা আর নিরাপদ হবে না। আমি যা দেখলাম তা ওদের সবাইকে বললাম। সবাই দ্রুত হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিলাম।

হল গেটে গিয়ে শুনলাম সৈন্যরা আমাদের হলে আসার আগে শহীদুল্লা হলে প্রথম অপারেশন চালিয়েছে। ওখানে তারা ২ জন শিশু এবং ৬ জন ছাত্রকে গুলি করে মেরেছে। সারা শহরেই তখনো চলছে নারকীয় তাণ্ডবলীলা। আমরা হল থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও এই গোলাগুলির মধ্যে বের হবো কেমন করে বা কোথায় যাবো এ নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম। হল গেটে আমরা তখন ১৭ জন। হলের একজন কর্মচারী ঐ সময় আমাদের একটা তথ্য দিল। তথ্যটা এরকম যে আমাদের ডাইনিং হলের উপরে দোতলায় যে অডিটোরিয়াম রয়েছে ঐ অডিটোরিয়াম এবং ডাইনিং হলের ফ্লোরের মাঝখানে প্রায় দুই হাত উচ্চতার একটা ফাঁকা স্পেস আছে। একটা সিঁড়ি বেয়ে ওখানটায় উঠে গেলে মিলিটারীরা আবার হলে এলেও আপনাদের কোন খোঁজ পাবে না। তার পরামর্শ আমাদের মনে ধরলো। আমরা দ্রুত ওখানে উঠে পড়লাম এবং সিঁড়িটিকেও আমাদের সঙ্গে উঠিয়ে নিলাম।

বিকাল গড়িয়ে রাত্রি, আমাদের খাওয়া নেই এমনকি সঙ্গে পানিও নেই। আমাদের সঙ্গী একজনের কাছে একটি এক ব্যান্ডের রেডিও ছিল। সে খুবই কম ভলিউম দিয়ে কানে চেপে রেডিওর বিভিন্ন স্টেশন ধরতে চেষ্টা করলো। সে বললো ঢাকা সহ চট্টগ্রাম স্টেশনে উর্দুতে সামরিক ফরমান জারীর কথা বলা হচ্ছে। অন্য কোন স্টেশন ধরা যাচ্ছে না। এক সময় কলকাতা বেতার থেকে সে শুনলো যে, সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। রাত গভীর হলে আমাদের কারো কারো চোখে একটু একটু ঘুম ও লাগলো। কেননা প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে কোন দানা পানি পড়েনি পেটে, সবাই খুবই ক্লান্ত। হঠাৎ খেয়াল করলাম ঘুমিয়ে যাওয়া এক বন্ধুর নাক ডাকা শুরু হয়েছে। তখনই আরেক বন্ধু তার নাক চেঁপে ধরলো যাতে কোন শব্দ বাইরে না যেতে পারে। এমনি অবস্থায় আমরা ঐ রাত কাটালাম। ২৭ মার্চ ভোরের দিকে রেডিওতে শুনতে পেলাম চার ঘন্টার জন্য কার্ফু তুলে দেয়া হয়েছে।

আমরা তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এলাম এবং একে অন্যের থেকে বিদায় নিলাম। মনের মধ্যে আবার দেখা হওয়ার আশা তখন প্রায় তিরোহিত। এমনি মানসিক অবস্থায় আমি হল থেকে শেষ বিদায়ের জন্য আমার রুমে গেলাম। আমার একটা হাত ব্যাগ ছিল, ঐ হাতব্যাগ এবং তখন আমার সম্বল ছিল মাত্র এক টাকা চৌদ্দ আনা। তাই সম্বল করে হল থেকে বেরিয়ে পড়লাম অজানার উদ্দেশ্যে। গন্তব্য অনির্দিষ্ট। তবু কেন জানি হাঁটতে লাগলাম বুড়িগঙ্গার দিকে। নারী, পুরুষ , শিশু, বৃদ্ধ সঙ্গে সামান্য পুটলা-পুটলী নিয়ে সবাই তখন রাস্তায় । শহর ছেড়ে সবাই গ্রামের পথে। সব কিছুর মায়া ত্যাগ করে শুধু প্রাণে বাঁচার তাগিদে ছুটছে সবাই। এ চলার শেষ নেই যেনো।

বীরপত্নী শ্রদ্ধেয় রুখসানা চৌধুরী এবং ডানে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্টের বীর মুক্তিযোদ্ধা উপ-কম্যান্ডার মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন (সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর)।

পথে পথে অনেক লাশ মাড়িয়ে সদরঘাটের দিকে পথ ছুটছি। রিক্সার উপর লাশ, বাড়ির সামনে লাশ, নর্দমায় পড়ে আছে লাশ। এক সময় পৌছলাম বুড়িগঙ্গার পার। দেখি নদীতেও ভাসছে লাশ। দেখি ছোট ছোট নৌকায় মাঝিমাল্লারা পারাপার করছে, যারা ওপারে যাবে। আমিও অনেকের সঙ্গে একটি নৌকায় উঠে পড়লাম। নদীর ওপারে গিয়ে আমি হতবাক। লোক লোকারন্য হয়ে গেছে ওপারের গ্রামটি। পিঁপড়ার সারির মতো লোকে আসছে। আমি কোন দিকে যাবো? আমার শরীর আর মানছিল না। প্রায় ২ দিনের অনাহারী আমি। ঠিক করলাম অল্প পয়সা যা আছে সঙ্গে তা দিয়ে কিছু খাওয়া-দাওয়া করি প্রথম। তারপর ঠিক করবো কোন দিকে যাবো। একটা চায়ের দোকানে দুটি পরোটা ও এক কাপ চা খেলাম। একটু শক্তি ফিরে পেলাম মনে হলো। তারপর যে দিকে বেশি মানুষ যাচ্ছে সে দিকেই যাত্রা শুরু করে দিলাম। পথের দু’ধারে অভূতপূর্ব দৃশ্য তখন। সকল বাড়ী ঘরের সামনে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে বাড়ির সদস্যরা যার যার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। কেউ কলসিতে পানি, কেউ মুড়ি চিড়া, কেউ তাদের গাছের পেঁপে, কলা, কেউবা দুধ। বাঙালি যেনো হঠাৎ করে বদলে গিয়েছে।

এক সময় আমরা বেশ কয়েকজন একটি গাছতলায় একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। আমার থেকে কিছু দূরে দুজন লোক নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করছিলেন। আমি শুনতে পেলাম একজন বলছেন, তিনি ভোরের দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পূর্বে তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে একটি মেসেজ পেয়েছেন যে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চের মাঝরাতে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছেন এবং ওয়ারলেসে চট্টগ্রামের নেতাদের জানিয়েছেন। চট্টগ্রামে তার এই ঘোষণা লিফলেট আকারে বিলি করা হয়েছে। আমার মনে আশার সঞ্চার হলো।

ভাবলাম, সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। মনে মনে শুরু হলো যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি।

সৌজন্যে: গেরিলা ১৯৭১

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।