বাংলা সিরিয়াল দর্শকের দৃষ্টিপাত

বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশে টেলিভিশন পণ্যটি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ভারতীয় সিরিয়ালগুলির প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। হাল আমলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছে যারা ইউটিউবকে টেলিভিশনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে, তবে দেশের সামগ্রীক দর্শকশ্রেণির সাপেক্ষে এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটিকে নির্দ্বিধায় উপেক্ষা করা যায়।

ভারতীয় সিরিয়ালের ভোক্তাশ্রেণির প্রভাব বুঝতে কয়েকটি সোস্যাল ফেনোমেনাতে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে –

১. সর্বশেষ ২০ বছরে ‘ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন’- শব্দবন্ধের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয় পেপার-পত্রিকা আর টকশোগুলোতে৷ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ধারণাটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংস্কৃতির সাথে স্বকীয়তা আর নিজস্বতা বোধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই বোধ যখন অনুপস্থিত থাকে, কেবলমাত্র ভাষা, পোশাক আর আঞ্চলিকতা দিয়ে দেশীয় সংস্কৃতি বিচার করা যায় না, যদিও সেই গোঁজামিল দেয়ার চেষ্টাটাই বেশি করি আমরা।

একটা উদাহরণ ভাবা যাক।

আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর পূর্বে হিন্দি শোলে সিনেমার বাংলাদেশি সংস্করণ ‘দোস্ত দুশমন’ মুক্তি পেয়েছিল এবং বেশ দর্শক বন্দনা অর্জন করেছিল।

‘দোস্ত দুশমন’ কি বাংলাদেশি সংস্কৃতিকে ধারণ করে, কিংবা একে কি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আওতায় ফেলা যায়? আমাদের সুশীল সমাজ একে বলবেন সাংস্কৃতিক বিনিময়। কিন্তু বিনিময় ধারণায় তো আদান এবং প্রদান দুটোই থাকে, অবিকল অনুসরণ করার মধ্যে প্রদানের জায়গাটা ঠিক কোথায়? তবু একে হয়তো আগ্রাসন বলা হবে না, কারণ যে আমলে এটি নির্মিত হয়েছিল সেই সময়ে দেশের ৯০% মানুষের কাছেই হয়তোবা দেদারছে হিন্দি সিনেমার প্রবেশগম্যতা ছিল না। প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধির পর কেউ যদি দোস্ত দুশমন দেখার আগ্রহই বোধ না করে, এবং মূল শোলে সিনেমা দেখে তার প্রশংসা করে তখন সেই প্রবণতাকে আমরা আগ্রাসন সাব্যস্ত করি।

তার মানে ‘আগ্রাসন’ একটি পক্ষপাতমূলক ধারণা, যখন মেধা আর যোগ্যতায় পেরে না উঠে গুণগত মানে এগিয়ে থাকা কোনোকিছুর প্রতি ভাষা, স্থান আর অভ্যাস এ ভিন্নতার অভিযোগ আরোপ করে তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেয়ার উপায় হিসেবে একে ব্যবহার করতে চাওয়া হয়।

২. স্টার জলসায় প্রচারিত ‘বোঝে না সে বোঝে না’ সিরিয়ালটি বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আগে-পরে মিলিয়ে বাংলাদেশে কোনো ভারতীয় সিরিয়াল এতোটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা চট করে বলা মুশকিল। প্রতি রোজার ঈদেই ভারতীয় বিভিন্ন নায়িকার নামে পোশাক বিক্রি হতো (কারিনা, ক্যাটরিনা, প্রীতি জিনতা প্রমুখ); এটাও এক ধরনের হুজুগে সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু মাত্র ৩-৪ বছর আগে রোজার ঈদে ‘পাখি ড্রেস’ (‘বোঝে না সে বোঝে না’ সিরিয়ালের নায়িকার নাম) যেভাবে মার্কেট দখল করে নেয় তা পূর্বাপর সকল হুজুগকে পিছনে ফেলে দেয়। পাখি ড্রেস না কিনে দেয়ায় বিষপান, ডিভোর্স, এমনকি অভিমানে আত্মহত্যার সংবাদও মূলধারার পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে।

৩. মা-খালা-ভাবী- মামী-চাচী সম্পর্কীয় গোষ্ঠী, যারা পুরোদস্তুর হোম-মেকার; চাকরি করেন না, তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে এককালে পোশাক-গহনা, স্বামী-সন্তানের সামাজিক অবস্থান, পরচর্চার মতো বিষয়গুলোর আধিক্য পাওয়া যেত। সর্বশেষ ৫-৬ বছরে যদি এই শ্রেণিটির আলোচনার বিষয়বস্তুকে আমলে নেয়া হয়, সেখানে বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। সেখানে চলে এসেছে ফেসবুকে নিজের আর খাবারের ছবি দেয়ার গল্প, তার চাইতেও বেশি বিভিন্ন সিরিয়ালের চরিত্রগুলো নিয়ে মন্তব্য।

৪. চল্লিশোর্ধ্ব বহু পুরুষ যারা কিছুটা ঘরমুখী, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের কাছেও ভারতীয় সিরিয়ালের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এদের অনেকেই টেলিভিশনে টকশো আর নিউজ বেশি দেখতো এককালে, সময়ের পরিক্রমায় আগ্রহ অন্যদিকে প্রবাহিত হয়েছে।

৫. ক্লাস এইটের নিচে পড়ুয়া শিশুদের ( অর্থাৎ অনুর্ধ্ব ১৪ বছর), বিশেষত ঢাকার বাইরে থাকে যারা, তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কার্টুন বা ক্রিকেট-ফুটবল দেখার পাশাপাশি নিয়মিত সিরিয়াল দেখে।

৬. কলেজ বা ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণ-তরুণী এবং নব্য পেশাজীবীদের কিছু অংশ ভারতীয় সিরিয়াল এবং এর দর্শকদের ট্রলের পাত্র গণ্য করে। সিরিয়ালের কনটেন্ট, মেকিং, এক্টিং সবকিছুতেই তারা তামাশা খুঁজে পায়। ভারতীয় সিরিয়াল দেখা আনপ্রোডাক্টিভ এবং আনস্মার্টনেস হিসেবে বিবেচনা করে, যদিও এদের বৃহত্তম অংশই ফ্রেন্ডস, শার্লক হোমস, বিগ ব্যাং থিওরি, গেম অব থ্রোনস জাতীয় টিভি সিরিজ দেখে সানন্দে এবং সগর্বে তা শেয়ার করতে কুণ্ঠিত হয় না সচরাচর।

যে কারণে টিভি দর্শকদের একাংশ ভারতীয় সিরিয়াল দেখে, ইংরেজি সিরিজগুলো দেখার ক্ষেত্রেও কারণ যে প্রায় অভিন্ন, সেই সত্য অনুধাবন এবং স্বীকার করে নেয়ার ক্ষেত্রে ইতস্ততাবোধ কাজ করে। পক্ষান্তরে, হীনম্মন্যতা বোধ থেকে অনেক সিরিয়াল দর্শকই স্বীকার করতে রাজি হন না তারা নিয়মিত জি-বাংলা আর স্টার জলসা উপভোগ করেন৷

একটা সময় পর্যন্ত আমিও জি-বাংলা, স্টার জলসা গোষ্ঠীর প্রতি করুণা বোধ করতাম। পাত্র-পাত্রীদের গেট আপ, ক্যামেরার এঙ্গেল এবং স্টোরিলাইন হাস্যরসের যোগান দিত। এবং এসব সিরিয়ালের লাখ লাখ দর্শকদের চিন্তাহীনতা আর রুচির নিম্নমুখীতায় বিরক্ত হতাম।

কিন্তু, ২০১৩ তে এসে উপলব্ধি করি লাখ লাখ মানুষ যে বস্তুর আকর্ষণে বিভোর হয়ে আছে, তার অভ্যন্তরীণ কার্যকারণ বোঝার চেষ্টা না করে নিঃসংকোচে তাদের গবেট আখ্যা দিয়ে আদতে নিজে একজন জাজমেন্টাল প্রকৃতির নির্বোধ এবং স্বল্পদর্শী মানুষে পরিণত হয়েছি; আমাকে ভিন্ন পারসপেক্টিভ বুঝতে হবে।

সেই ভাবনা থেকে সর্বশেষ ছয় বছরে জি-বাংলায় প্রচারিত প্রায় সবকয়টি সিরিয়ালের সাবজেক্ট ম্যাটার সম্বন্ধে খোঁজ রাখার চেষ্টা করেছি, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসা মানুষ, চা এবং ডাব খাওয়া সূত্রে পরিচয় হওয়া মানুষ, সামাজিক অনুষ্ঠানে একত্রিত হওয়া মানুষ – এদের স্যাম্পল হিসেবে বেছে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছি সিরিয়াল মানুষ কেন দেখে, এবং তার প্রেক্ষিতে আমার অনুসিদ্ধান্ত হলো, মানুষ খুব কম ক্ষেত্রেই চিন্তা করে সে কেন সিরিয়াল দেখে আনন্দ পায়, মূল কারণ জানবার বিশেষ আগ্রহও কাজ করে না তার/ তাদের মধ্যে।

সিরিয়াল কেন দেখেন বা এতে ভালো লাগার কী আছে, সেই জিজ্ঞাসায় সরলীকৃত যে উত্তরগুলো আসে, তাকে তিনটি প্রবণতায় রাখা যেতে পারে।

১. বাংলাদেশের নাটকগুলো দেখার মতো নয়। একই টাইপ ফাতরামি, ঘুরেফিরে একই অভিনেতা-অভিনেত্রী। আর বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা বা প্রহসন তো থাকেই।

২. জি-বাংলার সিরিয়ালগুলোতে নারী ক্ষমতায়নকে অত্যন্ত প্রাধান্য দেয়া হয়। নিজের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো নায়িকার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে দেখে ভালো লাগে।

৩. সিরিয়ালগুলো প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রচারিত হয় বলে ২-৪ পর্ব দেখার পর অভ্যাসে পরিণত হয়, সাতটা বা আটটা বাজলেই নির্দিষ্ট সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা তৈরি হয়। ভালো লাগে কিনা তা নিশ্চিত না হয়েও দেখার অপেক্ষা বাড়তে থাকে।

তবে, এই সকল উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারিনি আমি, এগুলোকে একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ মনে হয়েছে। সিরিয়াল দর্শকের মনস্তত্ত্ব বুঝতে আমাদের আরো গভীরে ঢোকার চেষ্টা করা উচিত।

টেলিভিশন কারা দেখে এটা নিয়ে আমার দীর্ঘদিনের কৌতূহল ছিল। আমরা যখন নিম্ন-মাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র ছিলাম সেই বয়সের শিশু-কিশোরদের জন্য টেলিভিশনের সুনির্দিষ্ট কয়েকটা প্রোগ্রামই বরাদ্দ থাকতো বড়োজোর। সেখানে রবিনহুড, সিন্দবাদ, স্পেলবাইন্ডার জাতীয় বিদেশী সিরিয়াল, কিংবা রেসলিং, ট্রাভেল শো, ক্রিকেট/ফুটবল খেলা, ক্ষেত্রবিশেষে ইত্যাদি, আনন্দ মেলা, শুভেচ্ছা, ছায়াছন্দ জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো স্থান পেত৷ অর্থাৎ সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩-৪ ঘন্টা টেলিভিশন দেখার অনুমতি মিলতো।

পক্ষান্তরে, অধিকাংশ বাসাতে টেলিভিশন চলে সপ্তাহের সাতদিনই। সেই সময়ে গার্মেন্টস এ নারীশ্রমিকের হিড়িক সেভাবে না থাকায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেশিরভাগ বাড়িতেই কাজের বুয়া থাকতো। টেলিভিশনের মূল দর্শক ছিল তারা। গৃহকর্ত্রীরও হাতে অখণ্ড অবসর। অফিস শেষে ঘরে ফেরার পর ঢাকার বাইরের গৃহকর্তাদের হাতেও পর্যাপ্ত সময় অবশিষ্ট থাকতো৷

সময়ের পরিক্রময়ায় বুয়ার সংখ্যা কমে গেলেও গৃহকর্তা এবং গৃহকর্ত্রীদের ভূমিকায় পরিবর্তন আসেনি তেমন। আগে তবু সামাজিক আড্ডা এবং একে অপরের বাড়িতে যাওয়া-আসার চল ছিল, মানুষ সেখান থেকেও বিমুখ হয়ে আত্মকেন্দ্রিক জীবনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

আত্মকেন্দ্রিকতা অজান্তেই মানুষের মধ্যে একঘেয়েমিতা বাড়িয়ে দেয়। ঘোরাঘুরি বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষেত্রে আত্মকেন্দ্রিকতাজনিত একঘেয়েমিরও সুবিস্তৃত প্রভাব রয়েছে।

কিন্তু ঘোরাঘুরি কাহাতক সম্ভব? প্রথমত, জীবিকার দায়িত্ব পালনে হাজিরা দিতে হয়। দ্বিতীয়ত, খরচ। মানুষকে তাই ঠিকানার দ্বারস্থ হতে হয়। ঠিকানা মানুষকে স্থবির করে দেয়। অসুস্থ্য রোগী বাদে কেউই সারাদিন শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিতে পারে না, তাহলে করণীয় কী?

একঘেয়েমিতা কাটানোর দুটো উপকরণ আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রথমটি, মোবাইল ফোন, দ্বিতীয়টি ফেসবুক। মোবাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে সময়কে ফাঁকি দেয়া যায়, একবার ফেসবুকে লগ ইন করলে চ্যাটিং, ছবি বা স্ট্যাটাসে লাইক দেয়া, বিভিন্ন গ্রুপ বা পেজ ভিজিট করতে করতেই অনির্দিষ্ট পরিমাণ সময় খরচ করা সম্ভব। তখন জীবন-যাপন নিয়ন্ত্রিত হয় ফেসবুক আর মোবাইলের নির্দেশনায়। দুটোই চরম মাত্রার আসক্তি হয়ে উঠতে পারে, যা ব্যক্তিজীবনকে ক্ষতিগ্রস্তও করে বহুলাংশে; এই আসক্তিগুলো অনেকটাই মাদকের নেশার মতো। ফলে ফোন থেকে দূরে থাকা, কিছুদিন পরপরই ফেসবুক একাউন্ট ডিএক্টিভেট করার দৃষ্টান্ত দেখা যায়৷

তুলনায় টেলিভিশনে এনগেজমেন্ট এবং ইনভলভমেন্ট কম। সন্ধ্যা ছয়টায় বসে রাত সাড়ে ১০ টায় টেলিভিশনের সামনে থেকে উঠলেও মধ্যবর্তী সময়ে খাওয়া-দাওয়া এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালনের আবশ্যকতা থাকে। সিরিয়ালগুলোর স্টোরিলাইন প্রেডিক্টেবল এবং স্লথ গতির হওয়ায় ২-৩ সপ্তাহ যদি মিস হয়ে যায়, তবু সিরিয়ালের অগ্রগতি বুঝতে সমস্যা হয় না তেমন।

সিরিয়ালগুলো দিনে প্রচারিত হয় না কেন?

দিনে অফিস বা অন্যান্যসূত্রে ব্যস্ততা থাকে, এটাই হয়তোবা উত্তর হবে। আমার ধারণা, দিনের আলো নেভার সাথে সাথেই মানুষের মস্তিষ্ক চাঞ্চল্য হারাতে শুরু করে, যার প্রভাব পড়ে তার আচরণে। বয়স্ক এবং কঠোর শৃংখলা সম্পন্ন মানুষ বাদে কেউই ১১টার আগে সচরাচর ঘুমায় না, কারো ক্ষেত্রে সেটা রাত ১২টা বা ১টায় গিয়ে ঠেকে। দেশের বহু অঞ্চলে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন হয়তো ৯টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তো সেসব অঞ্চলের মানুষেরা। এখনো অধিকাংশ মফস্বল শহরগুলোতে রাত্রি ৯টা মানে শুনশান নীরবতা নেমে আসা। তবু সেখানকার মানুষ ১১ টার আগে ঘুমানোর চিন্তা করে না। দিনটা তবু কোনোমতে পার করে দেয়া যায়, কিন্তু সন্ধ্যা থেকে রাতের প্রথমাংশ পর্যন্ত সময়টুকু, তার জন্য বিধান কী?

যাদের জীবনে শিল্প-সাহিত্যের সংসর্গ কম, কিংবা প্রযুক্তির বিচরণ সামান্য, তাদের জন্য এই ৫ ঘন্টা অতিবাহিত করাটা দুর্দান্ত চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার। কিংবা যানজটসমৃদ্ধ ঢাকা শহরে যাদের আবাস, তারা তো আরো দমবন্ধ অবস্থায় থাকে। সারাদিন বাসায় থাকা, কিংবা সারাদিন অফিস করে ৮টার পরে ঘরে ফেরা, উভয়শ্রেণীর জন্যই পরের ৩টি ঘন্টা গুরুত্বপূর্ণ। একজন সারাদিন ঘরে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে, আরেকজন বাইরে থেকে ঘরে ফিরে হাঁপাচ্ছে। দু’জনকেই শ্রান্তি দেয় টেলিভিশন।

প্রতিদিন মানুষ আগেরদিনের চাইতে একটুখানি বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়। আত্মকেন্দ্রিকতা আদতে বৃহত্তর দৃষ্টিকোণের বিচ্ছিন্নতা। মানুষ উদ্ভট এক বিচ্ছিন্নতা রোগে আক্রান্ত। মানুষ সম্ভবত নক্ষত্রের মতো বিচ্ছিন্ন থাকতে চায়, কিন্তু ঘাস হতে চায় না। নক্ষত্রের আলো তাকে মোহগ্রস্ত আর প্রলুব্ধ করে, কিন্তু ঘাসের সংঘবদ্ধতা তাকে নীচতার অনুভূতি যোগান দেয়। সংঘবদ্ধ থাকার ক্ষেত্রে সমালোচনা এবং রুচির ভিন্নতা বারবার তার পথ আগলায়।

মানুষ খুব কমই ভাবে, জীবনের কতটুকু সময় আর অবশিষ্ট আছে। যতটুকু সময় খরচ করেছি সেটা কতখানি মনের মতো হয়েছে। এইসকল আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে সংকল্পবদ্ধ করে আত্মশুদ্ধির জন্য অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু আত্মজিজ্ঞাসাকে সে ভয় পায়, নিজের কাছ থেকেও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। সেই লুকোচুরি খেলায় টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল- তিনটিই সমান কার্যকর। তন্মধ্যে টেলিভিশন প্রাচীনতম হওয়ায় তার ভোক্তাসংখ্যাও বেশি৷

কিন্তু টেলিভিশন চ্যানেলে দেখার মতো কনটেন্ট কী কী আছে? নাটক, সিনেমা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, টকশো, খেলা এবং বিজ্ঞাপন।

বিজ্ঞাপনের প্রতি মানুষ বিকর্ষণ বোধ করে, যতো আকর্ষণীয়ভাবেই তা উপস্থাপন করা হোক। কারণ, বিজ্ঞাপন দেখলেই তার মধ্যে প্রতিরোধী একটি শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠে, সে অনুভব করে তার পকেট থেকে পয়সা বের করতে চাইছে সে। খুব কম সংখ্যক মানুষই রাজনীতি সচেতন, কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শনে কার্পণ্য নেই, যে কারণে টকশো এর আলোচকদের প্রতি প্রতিযোগিতা অনুভব করে দেখার আগ্রহ হারাতে থাকে। এর চাইতেও বড়ো কারণ, টকশো এর বিষয়বস্তু একেকদিন একেকরকম থাকে, যে কারণে অভ্যস্ততা গড়ে উঠে না।

গড়মানুষ অভ্যস্ততা এবং ছক, দুটোরই প্রত্যাশা করে। সিরিয়াল মানুষের সেই শর্তের দুটোই পূরণ করে। আপনি টানা ২ সপ্তাহ যে কোনো সিরিয়াল নিয়মিত দেখুন, যতই হাস্যকর কন্টেন্ট আর মেকিং হোক, ১৫ তম দিনে সেই সিরিয়ালটি দেখবার জন্য আপনা থেকেই রিমাইন্ডার চলে আসবে, ঘড়ির কাটায় ৯ টা বাজামাত্রই আপনি টেলিভিশনের সামনে চলে আসবেন।

সেই একই সিরিয়াল সপ্তাহে মাত্র ১দিন হয়, আপনার হাতে অপশন এতো বেশি যে তার সাথে অভ্যস্ততা গড়ে উঠবে না। কিছুদিন আগে দীপ্ত টিভিতে সুলতান সুলেমান যে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তার পেছনেও অভ্যস্ততাই বড়ো কারণ।

তার মানে এটা নয়, আপনি যে কোনো সিরিয়াল সপ্তাহে ছয় দিন চালালেই মানুষ তার প্রতি আসক্ত হয়ে একসময় অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। ‘বকুলকথা’ যতটা জনপ্রিয়, সে তুলনায় ‘হৃদয়হরণ বিএ পাশ’ বা ‘জয় বাবা লোকনাথ’ এর জনপ্রিয়তা কম কেন? ‘রাশি’ কিংবা ‘বোঝে না সে বোঝে না’ এতোটা জনপ্রিয়তা কেন পেয়েছিল? কিংবা ‘কিরণমালা’, ‘ভুতু’ – এদের দর্শকশ্রেণি বেশি হওয়ার কারণ কী?

দুটো কারণ পাওয়া যায়।

প্রথমত, নায়ক বা নায়িকাকে সুদর্শন/সুশ্রী হতে হবে, পোশাক এবং সাজগোজে পারদর্শী হতে হবে। কয়েক দর্শকের কাছে জেনেছিলাম, সুন্দর শাড়ি আর ভিন্ন ডিজাইনের গহনার খোঁজ পেতে তারা জি-বাংলার সিরিয়াল দেখে।

দ্বিতীয়ত, বল অভ্যস্ততা যথেষ্ট নয়, সাথে বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে সুপার হিউম্যান হিসেবে নায়িকাকে উপস্থাপন করতে হবে। তার একটা সিমপ্যাথেটিক অতীত থাকলে ভালো, চরিত্রের একই জায়গায় আটকে না থেকে সে ক্রমাগত উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাবে, এবং একসময় শীর্ষে আরোহণ করবে।

যে সিরিয়ালগুলো উক্ত শর্তদ্বয় যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয়, সেগুলো জনপ্রিয়তাতেও পিছিয়ে পড়ে।

আমরা মুখে বলি সময় অত্যন্ত মূল্যবান, কিন্তু আদতেই কি তা বিশ্বাস করি? সময় ব্যাপারটাকে আমরা সেভাবে আমলেই নিই না, বরং সময়ের প্রতি এক ধরনের অনীহা কিংবা ভীতি কাজ করে। এর অন্যতম কারণ, আমরা সময় খরচ করি বৈষয়িকতার পেছনে। বৈষয়িকতা দিয়ে সময়ের উপযোগিতা পরিমাপ করি বিধায় অবস্তুগত সবকিছুকেই উচ্চমার্গীয় কিংবা পাগলামি বা আঁতলামি মনে হয়, যেগুলোর ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ নেই তেমন। কিন্তু অতি বৈষয়িকতা মানুষের বিভ্রান্তি আর হতাশা বাড়ায়, নেগেটিভ এনার্জি সঞ্চারিত হতে থাকে। দিনের আলোয় সেগুলো অপেক্ষাকৃত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, আঁধার ঘনাতে থাকলেই বৈষয়িক মানুষের মধ্যে বিপন্নতা তৈরি হয়; টেলিভিশন তার জন্য এসকেপিং রুট হিসেবে আবির্ভূত হয়৷

কান্ট্রি কালচার অনুসারে এসকেপিং রুট-এ ভিন্নতা আসে মাত্র।

সিরিয়াল, মুভি, বা ক্রিকেট-ফুটবল, যা-ই দেখা হোক, টেলিভিশন বা কম্পিউটার স্ক্রিনের উপযোগিতা আদতে একই। তাই সিরিয়াল দেখা মানুষকে হেয় করা যেমন নিজের হীনম্মন্যতা, অন্যদিকে মুভি বা ক্রিকেট-ফুটবল দর্শককে মহিমাণ্বিত করাও হীনম্মন্যতার ভিন্ন ডাইমেনশনমাত্র।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।