বাংলা ছবির ‘মিঞা ভাই’

একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে চলচ্চিত্রজগতকে করেছেন সমৃদ্ধ। গ্রাম- বাংলা ভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম নায়ক হয়েছেন। দর্শকদের কাছ থেকে ‘মিঞা ভাই’ খেতাব পেয়েছেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ‘সুজন’। অত্যন্ত জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ফারুক।

ছাত্রকালীন সময় থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছয়দফা আন্দোলন, ঊণসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তৎকালীন সরকার একের পর এক মামলায় তাকে জড়াচ্ছিলেন, তখন তাঁর প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে যুক্ত হলেন চলচ্চিত্রে। ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ সিনেমা দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক। এরপর এলো মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অস্ত্র হাতে নিয়ে হয়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা।

স্বাধীনতা লাভের পর আবার চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু। ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ও ‘আলোর মিছিলে’-সহ নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর এলো সুবর্ণসময়। একই বছর মুক্তি পেলো ইতিহাসসৃষ্টিকারী ছবি ‘সুজন সখী’ ও ‘লাঠিয়াল’। এই দুইটি ছবিই তাঁর ক্যারিয়ার কে গতিশীল করে দেয়।

এরপর নয়ন মনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সারেং বউ-এর মত কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় নিজেকে একজন সুদক্ষ অভিনেতা হিসেবে সুপরিচিত করেন। এছাড়া দিন যায় কথা থাকে, নাগরদোলা, তৃষ্ণা, কথা দিলাম, সূর্য সংগ্রাম, দোস্তী, সিকান্দার, সখী তুমি কার, লাল কাজল, মাসুম, যন্তর মন্তর, এতিম, যাদুমহল, ছোট মা, জনতা এক্সপ্রেস, ঘর জামাই, সাহেব, বিরাজ বউ, দাঙ্গা ফ্যাসাদ, ঝিনুক মালা, শিমুল পারুল, পালকি, লাখে একটা, পদ্মা মেঘনা যমুনা, এখনো অনেক রাতের মত জনপ্রিয় ও প্রশংসিত চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে দর্শক থেকে সমালোচক সবার প্রিয় হয়ে উঠেন।

বাংলা চলচ্চিত্রে সুনির্বচনীয় নায়কদের মধ্যে তাঁকেই প্রথমে রাখা হয়। নায়ক হিসেবে ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ ছবিই ছিল ব্যবসাসফল। আশির দশকের শেষে ‘মিঞা ভাই’ নামক চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা করেন। নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করা শুরু করেন এর মধ্যে জীবন সংসার, এই জীবন তোমার আমার, পৃথিবী তোমার আমার, মানুষ মানুষের জন্য, জীবন নিয়ে যুদ্ধ, দুষ্ট ছেলে মিষ্টি মেয়ে, মনে রেখ আমায়, কোটি টাকার কাবিন অন্যতম। সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ২০০৮ সালের ‘ঘরের লক্ষ্মী’।

বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনীত বেশ কয়েকটি গান পেয়েছে কালজয়ী গানের স্বীকৃতি। বিশেষ করে ‘সব সখীরে পার করিতে’ এবং ‘ওরে নীল দরিয়া’ এই দুটি গান চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অত্যন্ত জনপ্রিয় গান। নায়িকাদের মধ্যে ববিতা ও কবরীর সাথে সফলতা পেয়েছেন বেশি। এছাড়া তিনি শাবানা, রোজিনা থেকে সুনেত্রা সবার সাথেই সফল। খান আতাউর রহমান, নারায়ন ঘোষ মিতা, আমজাদ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, চাষী নজরুল ইসলামদের মত কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকারদের একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

বাংলা চলচ্চিত্রে নায়কদের মধ্যে পুরস্কারের দিক দিয়ে সবচেয়ে দূর্ভাগা বলা হয় তাঁকে। একাধিকার যোগ্য থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হন। তবে প্রাপ্তি জাতীয় পুরস্কারের প্রথম আসরে সেরা সহ অভিনেতা হিসেবে পুরস্কৃত হন এবং সম্প্রতি পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা। একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার তিনি কিছুই পাননি আজো। বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরে তিনি একজন ব্যবসায়ী।

ফারুকের আসল নাম আকবর হোসেন পাঠান। ডাক নাম  দুলু। জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট। ব্যক্তিজীবনে ভালোবেসে বিয়ে করেন ফারজানা পাঠানকে। সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। বর্তমানে চলচ্চিত্রের সংকট নিরসনে বেশ অগ্রনী ভূমিকা পালন করছেন। ব্যক্তিজীবন ও চলচ্চিত্রজগত দুই মাধ্যমেই নিজেকে আরো বর্ণিলতর করবেন – এই প্রত্যাশা রাখি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।