মুখ সামলে কথা বলুন চৌধুরী সাহেব!

ভাই ও বোনেরা, মূল কথা হলো কি, ঢাকাই মুভির সেই আদ্দিকাল থেকে দারিদ্রতা তথা গরীবি অবস্থা একটা আদর্শ বিষয় বটে। এই ইন্ডাষ্ট্রির মশলাদার মুভির পরিচালক-প্রযোজকরা ‘গরীব’ নামক কোরামিনটাকে ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য বেশ আদর্শ উপায়েই ব্যবহার করে এসেছে। ছবির নামকরন থেকে শুরু করে গল্প, চিত্রনাট্ট্য এমনকি নির্মানশৈলীতেও তারা ‘গরীবী’ ছাপ রাখতে পেরেছে।

আর এক্ষেত্রে তারা মাথায় রেখেছে, এদেশের খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর শ্রেণীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দর্শকদের যারা তাদের বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে সিনেমাহলকেই বেছে নিয়েছে যুগের পর যুগ। সে সব আম দর্শকের সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে অর্ধশিক্ষিত আর অল্পশিক্ষিত পরিচালক-প্রযোজকরা করে গেছে নিজেদের ‘স্টান্টবাজি’।

এরা গরীব শ্রেণীর সাধারণ খেটে খাওয়া দর্শকদের তাঁদের বাস্তবতায় মুভি তৈরী না করে একধরনের ফ্যান্টাসি বিক্রি করে গেছে দিনের পর দিন। তাই ঢাকাই মুভিতে দেখা গেছে নায়ক রিকশওয়ালা হয়েও প্রেম করছে গুলশানে বসবাসকারী শিল্পপতি চৌধুরী সাহেবের মেয়ের সাথে।

চৌধুরী সাহেব তাই হুংকার দিয়ে বলে উঠতে পেরেছেন – ‘ছোটলোকের বাচ্চা তুই বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়িয়েছিস?’ প্রত্যূত্তরে নায়ক জবাব দিয়েছে – ‘মুখ সামলে কথা বলুন চৌধুরী সাহেব! আমরা গরীব হতে পারি। আমাদেরও মান-সম্মান আছে। মনে রাখবেন, প্রেম মানেনা ধনী-গরীব, রাজা-ফকির।’

ফ্যান্টাসি বিক্রি করতে করতে গরীব চরিত্রের নায়ক জসিকে লটারি জিতে কোটিপতি হবার ক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ড পাইয়ে দিয়েছে এই নির্মাতারা। এই নির্মাতারা তাদের মুভির গল্পে ধনীর ঘরের ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে গরীব ঘরে এসে ভিক্ষা করে গান গাইয়ে ছেড়ে দিচ্ছে – ‘বাবু একটা পয়সা দাও, আমি গরীব অসহায়’!

অথচ যাদের জন্য মুভি বানানো তাঁদেরকে এরকম অলীক ফ্যান্টাসিতে না ভুগিয়ে ইচ্ছে করলে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের নিজস্ব বাস্তবতায় তৈরী করা যেতো ভাল মানের বাণিজ্যিক মুভি। যেখানে দরিদ্র রিকশাওয়ালা নায়ক সমশ্রেণীর নায়িকার প্রেমের দখলের জন্য লড়াই করতে পারতো বস্তির মাস্তানের সাথে, যেখানে লটারি দিয়ে নয় নায়ককে জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে দেখানো যেতো নিজের পরিশ্রম আর কর্মগুণে।

‘গরীব’ শব্দটাকে ইচ্ছেপূর্বক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা আর তাদের বাস্তবতার বাইরে গিয়ে অবাস্তব গল্পে মুভি বানিয়ে আসলে বছরের পর বছর দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের সত্যিকারের পরিশ্রমসাধ্য জীবন, তাদের বাস্তবসম্মত আশা-আকাঙ্খাকে অপমান করেছে ঢাকাই মুভি সংশ্লিষ্টরা।

‘হে দারিদ্রতা তুমি মোরে করেছো মহান, তুমি মোরে দানিয়াছো খ্রিষ্টের সম্মান’ – এই স্পিরিটটাই আসলে ঢাকাই মুভিতে ছিলো না। ছিলো মোটাদাগে গরীব দর্শকদের টাকা শুষে নির্মাতাদের পকেটভারীর মতলব। আজ বাস্তবে ঢাকাই মুভির গরীবি দশা বা এই বেহাল হাল কেনো জানেন? এই অসততার কারণেই!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।