বল টেম্পারিং কি ও ‘মাঠের দক্ষ কারিগরেরা’

একদিন খেলার মাঝে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ খান আফ্রিদিকে আপেল খেতে দেখা গেল! কিন্তু না! ভিডিও ফুটেজে দেখা গেল ওটা আসলেপেল ছিল না, বরং ওটা ক্রিকেটের বলই ছিল!

বোকার মত কেউ ক্রিকেটের বল কামড়ায়? হ্যাঁ, আফ্রিদি কামড়ায়। কারন এটার পিছনেও রহস্য আছে। নতুবা হুদাই শক্ত চামড়ার বল কামড়াতে যাবে কেন।

বল টেম্পারিং। হ্যাঁ, গত কদিন ধরে ক্রিকেট পাড়ায় এই জিনিসটা নিয়ে শোরগোল পেকে গেছে বেশ। কিন্তু বল টেম্পারিংয়ের ব্যাপারে অনেকেরই ধারনা কম। কিভাবে এটা করা হয়, কেনইবা করা হয়, কি এমন ফায়দা আছে এতে; যার কৌতুহলের শেষ নাই। ইন্টারনেট ঘেটে, ইউটিউব দেখে এবং কিছু ক্রিকেট জ্ঞান থেকে বল টেম্পারিং নিয়ে এখানে কিছু আলোচনা করব।

  • বল টেম্পারিং কি?

সোজা কথায় বল টেম্পারিং হলো বলের অবস্থা পরিবর্তন করা। কৃত্রিম কোনো বস্তু, পদার্থ বা শরীরে কোনো অঙ্গ দিয়ে বলের আকার, আকৃতি, অবস্থা পরিবর্তন করাই হল বল টেম্পারিং যেটা কিনা আইসিসির আইনে সোজাসাপটা বলা আছে। মোটকথা বলের আকৃতি পরিবর্তন করাই হল বল টেম্পারিং যেটা কিনা আইসিসির নিয়মের বহির্ভূত।

  • টেম্পারিং কেন করা হয়?

সুইং আদায় করাই টেম্পারিংয়ের প্রধান লক্ষ্য। এই ধরুন পুরাতন কোনো বলকে নতুনের মত কিংবা নতুন বলের আকার বিকৃতি করে পুরাতন বলের মত করে বাড়তি সুইং আদায় করার জন্যই প্রত্যেক কারিগরই সুদক্ষ ভাবে এই টেম্পারিংয়ের কাজটি করে থাকেন।

  • কি কি উপায় অবলম্বন করা হয় টেম্পারিংয়ের জন্য?

যে সমস্ত কারিগরেরা বল টেম্পারিং করে থাকেন তারা কিন্তু চতুর প্রকৃতির লোক। এরা ভালো ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি দারুণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন হয়। তবে হাজারো বুদ্ধিমান লোক হলেও ক্যামেরা কিংবা আম্পায়ার কিংবা বড়কর্তাদের কাছে ধরা খায়নি এমন লোক খুব কমই আছে। টেম্পারিং করতে গিয়ে ধরা খেলে তার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যাবস্থা আছে। কেননা এই জিনিসটা ক্রিকেটে বৈধ নয়।

এই টেম্পারিং করতে গিয়ে বুদ্ধিমান ক্রিকেটারেরা বিভিন্ন পথ অবলম্বন করে। এইযে গত কদিন যাবৎ ক্রিকেট পাড়ায় স্মিথ-ব্যানক্রফট যে শোরগোল ফেলে দিলেন, সেখানে দেখা গেল ব্যানক্রফট হলুদ রংয়ের কিছু একটা ব্যাবহার করে বল টেম্পারিং করলেন। এটা ছিল একরকম শিরিষ কাগজ। অনেকে আবার তীক্ষ্ন কাঁচকে বেছে নেয়। যদিও এই কাঁচ ব্যাবহার করা খুবই ভয়ানক। কেননা যে কেউই এটার দ্বারা আহত হতে পারেন এবং ক্রিকেট মাঠে নিজের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে পারে।

তবে টেম্পারিংয়ের জগতে বহুল প্রচলিত পন্থা হচ্ছে ট্রাউজারের জিপারে বল ঘষে বলের আকৃতি পরিবর্তন করে ফেলা। হামেশাই এই জিনিসটা ক্রিকেটে দেখে যায়, কখনো সেটার প্রভাব কম হয় আবার কখনো সখনো বেশি। সুযোগ পেলে কোনো ক্রিকেটার যে এটা করতে বাকি রাখেনা সেটা প্রত্যেকেরই জানা।

ক্রিকেট মাঠে স্মার্ট টেম্পারিং নিদর্শনের ভিতরে চুইংগাম বা চকলেটের ব্যাবহার বেশ পরিচিত। এখনকার স্মার্ট ক্রিকেটে স্মার্ট টেম্পারিংয়ের জন্য যে কাউকেই এটা ব্যাবহার করতে হবে। মুখে যদি মিস্টি চকলেট কিংবা চুইংগাম নিয়ে চিবানো হয় তাহলে মুখে এক ধরনের ঘন লালা তৈরি হয়। ওই লালা বলের উপর প্রলেপ দিয়ে বেশ কয়েকবার ঘষাঘষি করলে বলের এক প্রান্ত চকচকে হয়ে ওঠে। এতে করে টেম্পারিংটা আরো ভাল হয়।

পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদি অবশ্য অভিনব এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। আপেলের মত বলকে কামড়িয়ে তিনি টেম্পারিংয়ের নতুন এক পদ্ধতি খুজেঁ পেয়েছিলেন। বোকার মত কাজটি করলেও সঙ্গে সঙ্গেই আম্পায়ারের হাতে ধরা খেয়ে যান আফ্রিদি, যার বদৌলতে ২ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধও হতে হয়েছিল তাকে।

টেম্পারিংয়ের আরো কিছু পদ্ধতি আছে যার ভিতরে ‘নখ’ ব্যবহার করা অন্যতম। মুলত হাতের আঙ্গুল বা নখ দিয়ে বলের সিম (ক্রিকেট বলের ওপরটা তৈরী হয় দুই টুকরো একট চামড়াকে জুড়ে দিয়ে। এই জুড়ে দেওয়ার জায়গায় দুই প্রস্ত ভারী সেলাই থাকে। একেবারে মাঝ বরাবর যে সেলাইটা থাকে, তাকে বলে সিম) ঘষে টেম্পারিং করা হয়। বেশকিছু তারকা ক্রিকেটার এই পন্থা অবলম্বন করেছেন। ২০০২ সালে শচীন টেন্ডুলকার পোর্ট এলিজাবেথ টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এমনভাবে বল টেম্পারিং করেন। এই ঘটনার পর তাকে ম্যাচ ফী’র ৭০ শতাংশ ও ১ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

অন্তর্বাস বা রুমালও বল টেম্পারিংয়ের একটা অস্ত্র। অন্তর্বাসের সঙ্গে বল ঘষে বলের আকৃতি পরিবর্তন করেছেন অনেকেই। বিরাট কোহলি এই পদ্ধতি ব্যাবহার করেছেন। কোহলি সেদিন এটার পাশাপাশি চুইংগামের লালা এবং ট্রাউজারের জিপারও ব্যাবহার করেছিলেন। এছাড়া অনেকে রুমাল দিয়েও কাজটা করে থাকে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে আরো ভাল টেম্পারিংয়ের জন্য অনেকে আবার ভেজা রুমাল ব্যাবহার করে এমনকি ভেজা অন্তর্বাস পরেও মাঠে নেমেছিল!

দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনার প্যাট্রিক সিমকক্স আবার অন্য এক উপায় খুজে পেয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিমকক্স একবার বলকে বগলের ঘাম ও চুলের সঙ্গে ঘষে বলের আকৃতি পরিবর্তন করেছিলেন। এরপর ব্যাবহার করেছিলেন হাতের নখও!

১৯৯৪ সালে মাইক আর্থারটন পকেটে করে বালি নিয়ে এসেছিলেন টেম্পারিংয়ের জন্য। তিনি নাকি বল শুকাইতে পকেটে করে বালি নিয়ে এসেছিলেন। যদিও তিনি স্বীকার করেনি। তবে জরিমানা গুনতে হয়েছিল ২ হাজার পাউন্ড। আবার ২০০২ সালে জিম্বাবুয়ে ও ২০০৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বল টেম্পারিংয়ের দায় উঠেছিল শোয়েব আখতারের উপর। সেদিনও শোয়েবের ম্যাচ ফি’র ৭৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হয় এবং দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।

বল টেম্পারিংয়ের মত ন্যাক্কারজনক কাজ করেছেন রথী থেকে মহারথীরা। ২০০০ সালে কলম্বোতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে ম্যাচ ফি’র ৫০ শতাংশ কর্তন করা হয় পাকিস্তানি তারকা পেসার ওয়াকার ইউনুসের। ২০১৪ তে একই অভিযোগে ভার্নন ফিল্যান্ডারকে ম্যাচ ফি’র ৭৫% জরিমানা করা হয়। তার ঠিক ৯ মাস আগে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের বর্তমান দলপতি ফাফ দু প্লেসিসকেও জরিমানা করা হয়। ডু প্লেসিসের নামে মোট দুবার এই অভিযোগ ওঠে। ২০১৬ সালে শেষবার বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে তার ম্যাচ ফির ১০০ শতাংশ জরিমানা করা হয় এবং ২টি ডিমেরিট পয়েন্ট যুক্ত হয়।

২০০৬ সালে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইনজামাম উল হকের একই অভিযোগে ৪ ম্যাচ নিষিদ্ধ হন। ২০১০ সালে স্ট্রুয়ার্ট ব্রড ও জেমস অ্যান্ডারসন অভিযুক্ত হন দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। সেবার অ্যান্ডারসন মুখের লালা ব্যাবহার করেছিলেন। ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পিটার সিডল বল টেম্পারিং করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেটা ধরা পড়েনি। পরে অবশ্য আইসিসির নজরে আসে ব্যাপারটা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এমন ন্যাক্কারজনক কাজটি করতে বাদ যাননি ‘দ্যা ওয়াল’ নামে খ্যাত রাহুল দ্রাবিড়ও!

তবে এবার স্মিথ বেনক্রাফট যেটা করল সেটা ছাপিয়ে গেছে ক্রিকেটের সকল ন্যাক্কারজনক ঘটনাকে। শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে স্টিভেন স্মিথকে এবং নিষিদ্ধ হতে হল ১ ম্যাচের জন্য। অপরদিকে জরিমানা গুনতে হয়েছে ক্যামেরুন বেনক্রাফটকেও! এ ঘটনার শাস্তির সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ধারনা করা হচ্ছে স্মিথ ওয়ার্নারা নিষিদ্ধও হতে পারে আজীবনের জন্য!

নানান ধরনের প্রথা অবলম্বন করে এই কাজগুলো লুকিয়ে করে থাকেন তারা। কিছু ঘটনা তুলেও ধরা হয়েছে। তবে এগুলো ছাড়া আরো কিছু পদ্ধতিও অবলম্বন করেছেন অনেকে। অনেকে কোমল পানীয়ের ছিঁপি পকেটে রেখে তার উপর বল ঘষে টেম্পারিং করেন। অনেক বুটের নিচের স্পাইক দিয়ে বলের উপর চেপে বসে এটা টেম্পারিং করেন। আবার কেউ কেউ জেল, ভ্যাজলিন পর্যন্তও ব্যবহার করেছেন!

এক ইংলিশ ক্রিকেটার বল টেম্পারিংয়ের জন্য সিরিজ কাগজ ব্যাবহার করেছেন। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে যাকে প্রায়শই দেখা যায়। এই অভিনব পদ্ধতি তিনি ভিন্ন ভিন্ন ধাপে ব্যাবহার করার মাধ্যমে বিশ্বের বুকে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন। কখনো সখনো দেখা গেছে আঙুলে ব্যান্ডেজ নিয়ে নেমে পড়েছেন ফিল্ডিং করতে। আর ওই ব্যান্ডেজের সঙ্গে লাগানো আছে সিরিজ কাগজ যেটা দারুন এক বুদ্ধির বহিপ্রকাশ। সুযোগ পেলেই আঙুলের ব্যান্ডেজের সঙ্গে বলকে একটা ঘষা দিলেই খেল খতম। মাঝে এমন কাজ করলে সেটা দারুণ কাজে দেয়।

রিভার্স সুইং নামে এক ধরনের ডেলিভারি আছে ক্রিকেটে। এটা একজন পেসারের জন্য রকেট ল্যান্সারের সমমানের। আর যদি সেই ডেলিভারিটা রিভার্স সুইং ইয়র্কর হয় তাহলে তো একটা উইকেট পাওয়ার জন্য হাফ চান্স। আর এই ডেলিভারীটা দেওয়ার জন্য বল টেম্পারিং দারুণ কাজে লাগে। যার বদৌলতে বল টেম্পারিং যেন দারুন এক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

এগুলো সবই কৌশল। নানান চিন্তার মানুষজন নানান পদ্ধতি অবলম্বন করে। এগুলোর জন্য যদি আপনি জনৈক ক্রিকেটারের বুদ্ধির তারিফ না করেন তাইলে তার প্রতি আপনার অবিচার করা হবে। পরীক্ষায় কিন্তু সকল নকল করতে পারেনা। যারা নকল করতে জানে তারা কিন্তু খুবই বিচক্ষণ প্রকৃতির বলেই নকলটা বের করে খাতায় লিখেও ফেলে। এটা একজন মানুষের এক্সট্রা অর্ডিনারি মেধার নমুনা। তেমনি যিনি ক্রিকেট মাঠে বল টেম্পারিং করেন তিনিও একই রকমের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যাক্তি। সবাই এটা করতে পারেনা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।