ধরা পড়লে অনেক যাতনা, ধরা না পরলেই বজায় থাকে চেতনা!

বল টেম্পারিং ধরা পড়লে হইচই হবে। আলোড়ন উঠবে। শাস্তিও হয়ত হবে। খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু চারদিকে যেভাবে ‘ছ্যা ছ্যা’ পড়ছে, ‘সব গেল’ বা ‘ক্রিকেট রসাতলে গেল’ কিংবা ক্রিকেটের চেতনায় পদাঘাত বলে যেভাবে রব উঠছে, তাতে হাসি পাচ্ছে। টেম্পারিং কি নতুন কিছু? এই প্রথমবার হলো! এটাই কি শেষবার?

অবশ্যই এটা অবৈধ। অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু ক্রিকেটের স্পিরিট নিয়ে অতি কচলানোকে আমার কাছে স্রেফ ভণ্ডামি মনে হয়।

বল টেম্পারিং যুগে যুগে নানা রূপে আসছে। অনেক অনেক ম্যাচেই হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। এটা ক্রিকেট বিশ্বে ‘ওপেন সিক্রেট।’ মাঝেমধ্যে এভাবে সিক্রেটের আড়াল থেকে বানক্রফটের মতো ‘ওপেন’ হয়ে ধরা পড়ে। তখন ‘চেতনা চেতনা’ রব ওঠে। অথচ করে প্রায় সব দলই। ধরা পড়লে হইচই, ধরা না পড়লে শিল্প।

কখনও বোতলের ছিপি, কখনও পকেটে বালি, কখনও ট্রাউজারের জিপার, কখনও মিন্ট, ললিপপ, চুইংগাম বা এ ধরণের কিছু, কখনও স্পাইক, মাটিতে বল আছড়ানো বা ঘষা, কিংবা না জানা আরও অনেক উপায়ে টেম্পারিং হয়ে আসছে। আর নখ দিয়ে খোটানোর চিরন্তন পথ তো আছেই। হয় প্রায় সবসময়ই। ধরা পড়ে এক-দুইবার।

নিখুঁতভাবে টেম্পারিং করতে পারাকেও একটি শিল্প হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। সব দলেই বল শাইন করার জন্য দু-একজন স্পেশালিস্ট থাকেন। পাশাপাশি সুনিপুন ভাবে টেম্পারিং করার বিশেষজ্ঞও দু-একজন থাকেন। তাদের আলাদা কদরও থাকেন। বাংলাদেশ দলে খুব ভালো ভাবে বল শাইন করার কোনো স্পেশালিস্টই নেই। বল শাইন করতে পারাটা দারুণ এক স্কিল। যেটা আমরা এখনও রপ্ত করতে পারিনি। বৈধটাই ভালোভাবে পারি না, কাজেই টেম্পারিংয়ের চেষ্টার প্রশ্নই আসে না। ওটা আরও বড় স্কিল।

অনেক দলেই এত নিখুঁত ভাবে টেম্পারিং করেন যে করার সময় ধরা পড়েন না। করার পরও আম্পায়ার বল দেখে বোঝেন না। তখন সেটাকে নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবেই ধরে নেয় দলগুলি। প্রতিপক্ষও সমীহ করে, কিভাবে এত ভালোভাবে করতে পারল! নিয়মিত বিপিএল খেলেন একজন ইংলিশ অলরাউন্ডার আছেন, যিনি টেম্পারিং শিল্পের প্রায় পিকাসো হয়ে গেছেন। ক্রিকেট দুনিয়ায় তিনি বিখ্যাত এই কাজে (কুখ্যাত নয়, কারণ তার এটাকে গুণ বলেই ধরে নেওয়া হয়, ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোয় অনেক দলই তাকে চায় বাড়তি এই গুণর কারণে)।

মাইক আথারটন ১৯৯৪ সালে করলেন। লর্ডসে পকেটে বালি নিয়ে বল ঘষলেন। ধরা খেয়ে বললেন যে, হাত শুকাতে পকেটে বালি রেখেছিলেন। নিশ্চয়ই তার বাসায় টনে টনে বালি থাকত। গোসল করে গা শুকাতেন বালিতে! যাহোক, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেননি। ২ হাজার পাউন্ড জরিমানা হলো। তার পরও দোষ স্বীকার করেননি। এখন অবশ্য কমেন্ট্রি বক্সে ক্রিকেটীয় চেতনার বুলি আওড়ান।

২০০৬ সালে ওভালে টেম্পারিংয়ের দায়ে পাকিস্তানকে পেনাল্টি দেওয়া হলো ৫ রান। সেটা নিয়ে কত কাহিনী হলো। খুব বেশি দূরে না যাই। গত ৫ বছরে এক ফাফ দু প্লেসিই দুই দফায় টেম্পারিংয়ের দায়ে শাস্তি হজম করেছেন। ২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে ট্রাউজারের জিপারে বল ঘষে ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ জরিমানা গুণলেন।

সেই দলের অধিনায়ক গ্রায়ে স্মিথও আজ চেতনার গান গাইছেন। গত বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মুখে ললিপপ নিয়ে সেটির রস মাখিয়ে বলের কন্ডিশন বদলানোর চেষ্টা করে আবার ধরা খেলেন ডু প্লেসি। এবার ম্যাচ ফির পুরোটা জরিমানা। শাস্তি হলেও একবারও দু প্লেসি দায় স্বীকার করেননি।

দু প্লেসির দুই বারের মাঝে ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে টেম্পারিং করে ধরা খেয়ে জরিমানা দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকারই ভার্নন ফিল্যান্ডার। বলদ আফ্রিদি তো বলকে আপেল ভেবে কামড় বসিয়েছিলেন।

আরও অনেক উদাহরণ আছে। টেম্পারিংয়ের অভিযোগ নানা সময়ে উঠেছে আরও রথি–মহারথিদের বিপক্ষে। অনেকবার প্রমাণ হয়নি। বেশির ভাগ সময়ই টেম্পারিং থেকে যায় সবার অগোচরে। তাতে সত্যটা বদলে যাচ্ছে না। টেম্পারিং হয়ে আসছে, হয় এবং সামনেও হবে। ধরা খেলে এভাবেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে। তবে চেতানার ধোয়া তোলাটা হাস্যকর।

কেপ টাউনের ঘটনায় আমি অবাক হয়েছি, যেভাবে এটা করা হয়েছে। সিরিশ কাগজ হোক বা টেপ, এভাবে একটা হলুদ টুকরো নিয়ে বল ঘষার চেষ্টা, এতগুলো ক্যামেরার সামনে, অস্ট্রেলিয়ার মত দল এই বোকামি করল, এজন্য অবাক হয়েছি। করার আরও অনেক পথ আছে। প্রায় সব দলই করে।

স্মিথ-ব্যানক্রফট যেভাবে স্বীকার করেনিলেন, সেটাতে আরও বেশি অবাক হয়েছি। ক্রিকেট ইতিহাসে এটা বিরল। স্বীকার করাকে ইতিবাচক-নেতিবাচক কিছুতে ফেলছি না, তবে নি:সন্দেহে নতুন মাত্রা দিয়েছে। স্বীকার না করায় হয়ত দু প্লেসির নেতৃত্ব বেঁচে গেছে গত বছর, লিডারশিপ গ্রুপের দায় স্বীকারের পর স্মিথের নেতৃত্ব টিকবে কিনা সন্দেহ।

স্মিথ যদিও বলেছেন, তার নেতৃত্বে এবারই প্রথম হলো, আর হবে না। দুটিই হাস্যকর কথা। এবারই অবশ্যই প্রথম নয়। এবার শেষও নয়। অন্যরূপে ঠিকই করা হবে। বর্তমান-সাবেক ক্রিকেটারদের অনেকে যারা সমালোচনা বা চেতনার কথা বলছেন, তারাও করেন। তারাও জানেন। স্রেফ মওকা পেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খুব এক চোট মজা নিচ্ছেন। সেটাও দোষের কিছু নয়। এমন হাতি গর্তে পড়লে মজা নেওয়া হবেই।

 

বল টেম্পারিং আইন বিরুদ্ধ কেন, এটা নিয়েও কিন্তু অনেক প্রশ্ন আছে। অনেকেই বলেছেন, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় টেম্পারিং বৈধ করে দিতে। বিশেষ করে এই যুগে, যেখানে বোলারদের হাত-পা নানা ভাব শেকলে আটকানো এবং খেলাটা অনেক বেশি ব্যাটসম্যান বান্ধব। স্যার রিচার্ড হ্যাডলি, ওয়াসিম আকরামের মত বোলিং গ্রেটরাই শুধু নন, এমনকি স্যার ভিভ রিচার্ডস, ব্যারি রিচার্ডসের মত সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যানরাও নানা সময়ে টেম্পারিংকে বৈধতা দেওয়ার দাবী জানিয়েছেন। বিশ্বাস হচ্ছে না? একটু সার্চ দিয়ে দেখুন, কয়েক সেকেন্ডে পেয়ে যাবেন।

আবারও বলছি, যেহেতু আইন বিরুদ্ধ, সেক্ষেত্রে শাস্তি হবে এবং হওয়াই উচিত। ক্রিকেটাররা এবং ক্রিকেট কর্তারা খুব গুরুত্ব দিয়ে নেবেন, অনেক বড় বড় কথা বলা হবে, দৃষ্টান্তমূলক কিছুর দাবী তোলা হবে। সবই ঠিক আছে। কিন্তু টেম্পারিং বন্ধ হবে না। ছিল, আছে ও থাকবে। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু ‘চেতনা গেল’ বলে গলা ফাটানো খুবই হাস্যকর।

টেম্পারিং এমন কিছু, যেটি ধরা পড়লে অনেক যাতনা, ধরা না পরলেই বজায় থাকে চেতনা!

__________

একজন ক্রিকেট সাংবাদিক হয়ে এরকম কেন বলছি, দয়া করে এসব প্রশ্ন করবেন না। এটা আমার কাজের জায়গায় করা অফিসিয়াল রিপোর্ট, ফিচার বা অ্যানালাইসিস নয়। ফেসবুক সাংবাদিকতার জায়গা নয়, সেটা কখনও করিও না। এটা স্রেফ নিজের ভাবনা, যেটিকে আমি মনে করি বাস্তব সম্মত।

– ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।