‘আরে আমার ছেলে তো গাধা, অংক পারে না ভাবি…’

এই প্রজন্মের সবাই বেয়াদব – এটা খুবই কমন একটা অভিযোগ। এই প্রজন্মটা আসলে নাইন্টিজে জন্মানো আমাদের থেকে শুরু করে এখন যাদের বয়স ১৫ সবার বেলায় বলা এটা হয়। আমরা মূলত মিলেনিয়াল কিড হিসাবে পরিচিত। দার্শনিকরা আমাদের নিয়ে হতাশ, মনোবিজ্ঞানীরা আমাদের নিয়ে আতংকিত, সমাজ আমাদের উপর বিরক্ত, মুরুব্বীরা আমাদের নিয়ে হতবাক।

বাসায় মেহমান আসলে আমরা বিরক্ত হই। মেহমান আসলে আমাদের লুকানো নিয়ে ট্রল পেইজগুলাতে মজার মজার মিম তৈরি হয়। আমরা ঘর থেকে বের হইতে চাই না। আমাদের কোন বন্ধু সফল হইলে আমরা খুশি হই না। কেউ প্রেম করলে তাঁর গার্লফ্রেন্ডের খুঁত বের করি। অন্যকে পচানো আমাদের বিনোদনের প্রধান উৎস। বাসায় মামা, চাচারা আসলে তাঁদের সাথে যখন রুম শেয়ার করতে বলা হয়, আমরা খুব বিরক্ত হই। আমরা বলি, ‘আমার কোন প্রাইভেসি নাই।’

আমাদের দোকান থেকে কিছু নিয়ে আসতে বললে আমরা বিরক্ত হই, দাদা-দাদীদের সাথে কথা বলতে গেলে বিরক্ত হই, বাসার ইলেকট্রিক বিল দিতে বললে আমরা বিরক্ত হই, যখন ৫-৬ জন একসাথে গল্প করি, ৭০% কথা আমরা যা বলি সবই মিথ্যা। আমরা প্রচন্ড ইনসিকিওর।

আমাদের সব সময় চিন্তা হয়, ‘ওরা আমাকে কি ভাববে।’

আমি তো ফেইল করসি, ‘ওরা আমাকে কি ভাববে।’

আমি তো কোথাও চান্স পাই নাই, ‘ওরা আমাকে কি ভাববে।’

আমি তো ক্রিকেট ভালো খেলি না, তাও মাঠে যাব? ‘ওরা আমাকে কি ভাববে।’

আমি তো ছবি তুলতে পারি না, ছবিটা পোস্ট করব? ‘ওরা আমাকে কি ভাববে।’

একটু পিছনে যাই। ১৯৭৩ সালের কথা। আমার দাদীর বড় বোন এবং তাঁর হাজবেন্ড ইলেকট্রিক শকের কারণে মারা যান। উনাদের ছয় ছেলে মেয়ে। চার জন তখন ছিল স্কুলে, এক জন ঘরের দোলনায়, বয়স সাত মাস। বড় ছেলে উনাদের সাথেই মারা যান। আমার দাদী ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে আসেন, নিজের তিন ছেলে মেয়ের সাথে মানুষ করেন। আমার দাদুভাই সেই দুই মেয়েকে বাবা হিসাবে বিয়ে দেন। এক ফুপু আমেরিকা থাকে এখন, আরেকজন দিনাজপুরের সরকারী কলেজের প্রফেসর।

আরেকটু এগিয়ে আসি। ১৯৯৯ সাল, আমি ক্লাস টু-তে পড়ি। একদিন স্কুল শেষে দেখলাম আমার বন্ধু সাগরকে আন্টি থাপ্পড় মারসে। সাগর খুব কানতেসে। সাগরের অপরাধ সে তাঁর স্কুলের টিফিন অন্য বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খায়। এই কাহিনী রায়হান নামের এক বন্ধু তাঁর আম্মুকে বলে দেয়, সেই আন্টি সাগরের আম্মুকে বলে দিয়েছিলেন। আমি জানি না সাগর এখন কোথায়। কিন্তু সাগর যদি আজকে মিলেনিয়াল কিডদের যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে ‘সব কিছুতে বিরক্ত হয়’, আমি সাগরকে খুব একটা দোষ দিব না।

ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষায় আমার মামাত বোন বোর্ডে থার্ড হইসিল। এই উপলক্ষ্যে এক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে একটা পার্টি অ্যারেঞ্জ করা হয়। আমি সেই পার্টিতে এক্সট্রা মুরগীর রান চেয়ে খেয়েছিলাম। আমি বৃত্তি পাই নাই। কাজিনদের কাছ থেকে আমি ‘অত্যধিক নির্লজ্জ’ হিসাবে ব্রান্ডিং এর শিকার হলাম।

আমার মা সেই পার্টি থেকে ফেরার পর মুখ থমথম করে তিন দিন আমার সাথে এমন আচরণ করলেন, আমি এই বয়সে হইলে শিওর সুইসাইড করতাম। আমার বাবা মুখ গম্ভীর করে কথা বললেন না এক সপ্তাহ। আমি আসলেও ওই বয়সে বুঝিনি, আমি কত বড় পাপ করে ফেলেছি। স্কুলে কেউ আমার চেয়ে বেশি পেলেই আমি ভয় পেতাম। কারণ আরেকজন ম্যাথে ১০০ পেলেই আমার মার খেতে হত। আমি অন্যের ভালোতে খুশি হওয়া শিখব কোথা থেকে?

বাসায় মানুষ আসলে আমাদের ডেকে এনে তাঁদের সামনে অপমান করা হতো, ‘আরে আমার ছেলে তো গাধা, অংক পারে না ভাবি। একদম পড়ে না বুঝলেন, লজ্জাও নাই।’ বাসায় মানুষ আসলে আমি লুকাব না? বিরক্ত হব না?

সকাল সাতটা থেকে টিচারের বাসা, বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত ১০ টা। খেলাধূলা বাদ দিলাম, বাসায় পড়ার জন্যও সময় নাই। কে জানি বাবা মা দের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, ‘বেশি বেশি টিচার দিলে রেজাল্ট ভালো হয়।’

এরপর শুরু হল, ‘তোর পিছে মাসে ১৫০০০ টাকা খরচ করলাম, তুই ফেইল করলি? তোর জন্য আমরা কি না করসি, তোর লজ্জা করে না?’ আমাদের চেয়ে ইন্সিকিওর আর কে হবে?

আমাদের কোনদিন ঘর থেকে বের হতে দেয়া হয়েছে? মাঠেই তো যেতে দেয়নি। আজকে বাজার করতে না পারলে দোষ কার? অফিসে মেইন্টেইন করতে না পারলে দোষ কার হয়? আমার যে বন্ধু স্কুলে ফার্স্ট হইত সে বুয়েটের মেয়েদের উত্যক্ত করে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ প্রমানিত হইসে কিছুদিন আগে। এই দোষ কার?

একটা বাচ্চা যখন জন্ম নেয় সে একটা মাটির দলা। তাঁকে গড়ে তোলা তাঁর বাবা মা এবং সমাজের দায়িত্ব। বাবা মা বয়সে বড় তারা সব দোষ বাচ্চাদের উপর চাপান। বাচ্চারা তো বাচ্চা তারা তো বাবা মা’র দোষ দিতে পারে না। আর যদি ভুলে বলে ফেলে, ‘তোমাদের জন্য আমার এই অবস্থা…’ তাইলে তো হয়েছেই।

সায়েন্সের নিয়ম অনুযায়ী বাচ্চা ভুল করলে সেটা বাবা মা’র শেখানোর ভুল। সিস্টেমটা এমন হবার কথা। কিন্তু যেহেতু বাচ্চা সমাজে নিজের প্রেস্টিজ ইস্যু তাই বাবা মা রা কোনদিন কোন ভুল করেন নাই। সব সময় আমরা দেখসি সব ভুল ছিল সন্তানদের। সায়েন্সের সিস্টেমই এই সমাজ উল্টায়ে দিসে।

ক্যাসিনোর বোর্ডে বাচ্চাকে বাজি রেখে দূর্বল, ভীরু এসব বাবা মা’রা বছরের পর বছর নিজেদের ভুল ডিসিশান এবং ব্যার্থতা আড়াল করে গেসে। তাঁদের ভুলের এবং চূড়ান্ত স্বার্থপরতার ফলাফল আজকে আমাদের এই বেয়াদব এবং অকর্মণ্য হওয়া। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হইল, এই ব্যাপারগুলা সবাই জানার পরেও বলে না কারণ একইভাবে আমরা শিখে আসছি, ‘বাবা মা যা করে, সন্তানের মঙ্গলের জন্যই করে।’ বাবা মা মানুষ না? তাঁদের ভুল হয় না?

আমি এখন একটা কথা বলব যেটা আসলে অনেক বাজে শোনাবে কিন্তু কথাটা সত্য। একটা বাচ্চা তাঁর মায়ের সাথে সবচেয়ে বেশি কানেক্টেড থাকে। একটা মা যদি শিক্ষিত না হয়, সেই বাচ্চা কোনদিন স্বাভাবিক শৈশব পায় না।

৯০-এর মায়েদের শিক্ষার লেভেলটা কই ছিল? কয়জন মা ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত? এসব মায়েরা স্কুলে যেতেন, দেখতেন ফাস্ট বয় পাঁচটা টিচারের কাছে পড়ে, আমার ছেলেকেও পড়াও। আমার ছেলে ক্যামন সেটা জানা দরকার নাই। এদের জীবনে ছিল শুধু তাঁর ছেলে। বিলিয়ার্ড বোর্ডে এই ছেলেই তাঁর এইট বল।

সব বল পড়ে যাক, এই ছেলেকে সবার শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হবে। মেয়েদের খুব বড় বড় পজিশনে যাওয়া তাই শুধু মেয়েদের নিজেদের জন্য না, একটা ফ্যামিলির জন্যও খুব দরকার। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মিলেনিয়ালদের এমন হবার পিছনে ৭০% অবদান তাঁদের মায়েদের বলে মনে করি।

ব্যাড প্যারেন্টিং কি, সেটা কিভাবে হয়, সেটার ফলাফল কি এবং সেটা কিভাবে একটা জেনারেশনের বারোটা বাজায় দেয় তার প্রমাণ হচ্ছি আমরা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।