আমার শিক্ষক আইয়ুব বাচ্চু!

সবাই তাঁর গান লিখছেন ওয়ালে ওয়ালে। চলছে এলিজি। মনে হচ্ছে একটা দেশ থেমে গেছে, নিথর হয়ে গেছে। দুর্গোৎসবের দেশ এখন প্রাগৈতিহাসিক শোকে মুহ্যমান! কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু অতি অকালে চলে গেলেন। ৫৬ কী আর এমন বয়স এবি ভাই!

স্মৃতিকথা লিখি একটা। একদম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

গানের জগতে যিনি গান শেখান, তাঁকে ওস্তাদ বলা হয়। বলা হয়, গুরু বা গুরুজি। এগুলো শিক্ষকরেই সমার্থক শব্দ। সে হিসেবে শিরোনাম পড়ে কারও মনে হতেই পারে, তিনি বুঝি আমার ‘গানের গুরু’ ছিলেন!

ঘটনা তা নয়। আমার ব্রাত্য, অধম, ক্ষুদ্র হরিজনকে এবির মতো লোকের চেনারই প্রশ্ন নেই।

কারও কাছে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে কিছু শিখলেই তিনি আপনার শিক্ষক হতে পারেন। সেই হিসেবে এ জগতে প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরেও আমার শিক্ষক অসংখ্য। বয়োজ্যেষ্ঠরা যেমন শিক্ষক, বয়োকনিষ্ঠরা শিক্ষক।

ঘটনাটা বলি।

২০০৮ সালের ঘটনা হবে হয়তো। তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে পড়ি। একদিন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে বিকেলের দিকে যাচ্ছিলাম বটতলা কিংবা হলের দিকে। পায়ে হেঁটে। দেখলাম জাবির শহীদ মিনার চত্বরে এলআরবির দলবলসহ আইয়ুব বাচ্চু গানের জন্য ভিডিও রেকর্ড করছেন।

জাবির শহীদ মিনারে কেউ কেউ সিঁড়ি পর্যন্ত খালি পায়ে

ওঠেন। কেউ কেউ একদম শহীদ মিনার চত্বরের কংক্রিকেটের উঠানেই জুতো খুলে ওপরে ওঠেন। দুঃখজনক হলো, কেউ কেউ বেদিতেও জুতো নিয়ে ওঠেন। যার যেমন মর্জি আর কী!

মনে পড়ে, এ বিষয়ে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সর্বকনিষ্ঠ সহোদর আমাদের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. হিমেল বরকত লিখেছিলেন , ‘এ পাপ তোমার আমার’ শীর্ষক একটি লেখা, আমাদের ‘বটতলা’ পত্রিকায়।

তবে, ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে পরীক্ষার্থীদের কিংবা তাদের অভিভাবকদের, জাবির শহীদ মিনারকে ‘পানির ট্যাঙ্কি’ মনে করে বেদিতে জুতো নিয়ে ওঠার ইতিহাসও আছে!

এটা কারও জ্ঞাত ভুল বলা যাবে না। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনারের স্থাপত্যের নকশাটাই এমন যে, কেউ আগে থেকে ‘এটাই সেই শহীদ মিনার’, বিষয়ক জ্ঞান না রাখলে বিব্রত হওয়া ছাড়া উপায় নেই!

ফলত, জাবির শহীদ মিনারের মান রক্ষার ব্যাপারে বরাবরই একটা অংশ সচেতন থাকেন ক্যাম্পাসে। আমরা সিনিয়রদের দেখেই ব্যাপারটা শিখেছি।

আইয়ুব বাচ্চুর দল যেহেতু ‘নো শু জোনে’ জুতো পায়ে দাঁড়িয়েই গান গাইছিলেন, মনে হলো উনাদের ব্যাপারটা জানানো উচিত। তখন বয়স অনেক ছোট ছিল, জ্ঞান-বুদ্ধি-প্রজ্ঞাও কম ছিল। বলব কি না বলব না, এটা ভাবতেই দশ মিনিট ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। দেশের বড় তারকা, তার ওপর জাবির অতিথি, কী থেকে কী মনে করেন, এরকম একটি মধ্যবিত্তীয় দোটানায় ভুগতে শুরু করলাম।

আমি যদি যাই, তাহলে দুটো বিষয় হবে। এক, সচেতনতার দায়িত্ব পালন হবে। দুই, একদম সামনাসামনি এবি দর্শন হবে!

অতএব, সাহস সঞ্চয় করে গেলাম।

বিনয়ের সঙ্গে বললাম, বাচ্চু ভাই, কিছু মনে করবেন না। এটা তো শহীদ মিনার। আমরা শহীদ মিনারের এই জোনটাতে জুতো পায়ে উঠি না।

উনি, সঙ্গে সঙ্গে বিব্রত হয়ে বললেন, ‘ওহ, স্যরি, স্যরি, আমরা আসলে খেয়াল করিনি। আমাদেরই ভুল। থ্যাংঙ্কু ধরিয়ে দেওয়ার জন্য।’ উনি সবাইকে বললেন, ‘এই সব তাড়াতাড়ি নামা নিচে।’

এবার আমি বোধহয় ‘বড় তারকার অমায়িক ব্যবহারে’র কারণে একটু অতি আবেগে, নতুবা তাঁর প্রতি মুগ্ধতায় কিংবা অতি আতিথেয়তায় জীবনের অন্যতম বড় একটি ভুল বাক্য অপ্রয়োজনে বলে ফেললাম! যে ‘বোল্ডনেস’ নিয়ে গিয়েছিলাম, মুহূর্তেই যেন তা কাগজের মালার মতো ছিঁড়ে গেল!

আমি কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই এটা বুঝেছি আর মনে মনে অনুযোগ করেছি, এটা আমি কী বললাম! সারা জীবন এই বাক্যটার জন্য আমার আফসোস হয়েছে, হবেও। কিন্তু, কথা একবার বলে ফেললে তো সেটা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, এটাই মুশকিল!

– বললাম, ‘না, না, ঠিক আছে বাচ্চু ভাই, আপনি ওপরে থাকতে পারেন।’

সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার কথাটা ধরে নিয়ে ভুল সংশোধন করে দিলেন।

– বললেন, ‘না, না, তা কী করে হয়। এটা শহীদ মিনার। শহীদদের সম্মান করা আমাদের সবারই দায়িত্ব। আমরা নিচে দাঁড়িয়েই গান করব।’

হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম। নিজের বলা কথাটার জন্য তখন চোখমুখ লাল হয়ে আছে। শুধু এটুকু প্রবোধ দিচ্ছিলাম, বড় তারকাদেরও যে বিনয় থাকে, এটা আইয়ুব বাচ্চু শিখিয়ে দিলেন আজকে।

আহ, আমার সেই শিক্ষক আজ চলে গেলেন!

তাঁর হয়তো মনেও নেই ঘটনাটা। আর কোনদিন মনে করতেও আসবেন না। এলআরবি ব্যান্ডের যাঁরা সেদিন ছিলেন, তাঁরা যদি কোনদিন স্মৃতিচারণ করেন এ বিষয়ে, তাহলে হয়তো সেদিনের কথা জানা যাবে সবিস্তারে।

জাবিতে আমাদের ছাত্রজীবনে বেশ কয়েকবার কনসার্ট করেছেন। কনসার্ট বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত তেমন উচ্চাভিলাষ নেই। কিন্তু, মানুষের আনন্দোৎবে শরিক হতে ভালো লাগে। বাচ্চুর কনসার্টেও গিয়েছি ক্যাম্পাসে। কিন্তু, সব গান, সব সুর, সব কথা ছাপিয়ে যখনই তাঁকে দেখি বা শুনি, ভেসে ওঠে শহীদ মিনারের সেই ক্ষণিকের দৃশ্য!

নব্বই দশকে বড় হওয়া প্রজন্ম আমরা। নব্বই দশকের ৯৯ শতাংশ ছেলে-মেয়ে এই মানুষটার গান শুনে বড় হয়েছে।

গত ২ অক্টোবর নব্বই দশকের আরেক যুগস্রষ্টা রকশিল্পী জেমসের জন্মদিন গেল। জেমসের জন্ম ১৯৬৪-তে, এবির ১৯৬২-র ১৬ আগস্ট। জন্মদিনে ফেসবুকে জেমস বন্দনা চলছিল। সেদিনও আমার আলাদা করে শুধু জেমস নয়, এবির কথাও মনে পড়ছিল। লেখা হয়নি কিছুই।

বাংলা আধুনিক গানের পটপরিবর্তন হয়েছে মূলত নব্বইয়ে, সুমন-অঞ্জনের হাত ধরে, বিশেষত সুমনের কৃতিত্ব কিংবদন্তিতুল্য। যেমন কথা, তেমন সুর, তেমন তাঁর পাণ্ডিত্য। পশ্চিম বাংলার সুমন-অঞ্জন-নচিকেতার জনপ্রিয়তাতুল্য যদি কিছু বাংলাদেশের সঙ্গীতজগত গড়ে তুলে থাকে, তাহলে সবার আগে আসবে দুটি নাম — জেমস ও আইয়ুব বাচ্চু!

আমরা নব্বই দশকের শৈশব-কৈশোরে এই শিল্পীদের আঙুল ধরেই গান ভালোবেসেছি! তাঁদের গানই আমাদের গতিময় সময়কে বড় করেছে! আমরা কেউ কেউ হয়ে উঠেছি, সম্ভাবনাময় ‘বাথরুম সিঙ্গার’!

হ্যাঁ, রবীন্দ্র সঙ্গীত বা নজরুল সঙ্গীত বা লালনগীতি তখনও সবাই শুনত, আগে যেমন শুনত কিংবা এখনও যেমন শুনে। শচীন কত্তা, আরডি বর্মন, কিশোর কুমার, মোহাম্মদ রফি, লতা মাঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, আব্বাস উদ্দিন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, কনিকা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, ভুপেন হাজারিকা, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, আব্দুল হাদী, সুবীর নন্দী… নব্বইয়ে তাঁরাও সচল। মুরুব্বিরা শুনছেন। আমাদেরও শোনা হয়ে যাচ্ছে সমান্তরালে।

কিন্তু, অডিও ক্যাসেট প্লেয়ারটা যখন নিজের আঙুলের অধিকারে আসছে, তখন হয়তো সুমন-অঞ্জন-নচিকেতা-বাচ্চু-জেমস-সঞ্জীব চৌধুরী বাজিয়ে দিয়ে শুনে নিচ্ছি মন মাতানো সব গান।

সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে তাঁরা তখন গিটারকে জনপ্রিয় করে ফেলেছেন। পশ্চিম বাংলার যাঁরা গাইছেন গিটারটা তাঁদের হাতে একটু মৃদু, যেহেতু তাঁরা ব্যান্ড করছেন না, আধুনিকই রেখেছেন ধারাটাকে। শুধু বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রে হারমোনিয়ামের জায়গাটা নিয়েছে গিটার।

কিন্তু, বাংলাদেশের জেমস-এবির হাতে ‘বাংলার গিটার’ এক অনন্য মাত্রা পেয়ে গেল। দারুণ গতিময় সে ছন্দ। যেমন গায়কী, তেমন কথা, তেমন সুর, তেমনই গতি। আবার, হেভি মেটাল মিউজিকের অবোধ্য প্রতাপও নেই। মিউজিক যেমন বাজছে, তেমনি গানটাও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ওদিকে, জগতের সবকিছু গতিময় হয়ে যাচ্ছে। আজম খানের হাত থেকে ব্যাটনটা নিয়ে জেমস-এবি তখন বাংলা ব্যান্ডকে গতির ঝড় তুলে রীতিমতো এক উত্তুঙ্গ ‘পাবলিক ডিসকোর্স’ বানিয়ে ফেললেন। গিটার আর গানের সংমিশ্রণে ছড়িয়ে গেলেন গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে!

আর এটা তো সর্বজনবিদিত, গানের জগতের মানুষেরাই বলেন, গিটারে ‘এবি ইজ সেকেন্ড টু নান ইন বাংলাদেশ।’ জেমস হয়তো গায়কীতে সেরা, কিন্তু, গিটার বাজানোটাকে একদম শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘ওয়ান এন্ড অনলি’ আইয়ুব বাচ্চু!

এই তো সেদিন বাংলাদেশ জেমসের জন্মদিন উদযাপন করল। আর সেই বাংলাদেশকেই তাঁর আরেক কিংবদন্তি সন্তান আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুকাল দেখতে হলো! বড় অদ্ভতু এসব মায়ার খেলা! দুই নক্ষত্রের এক নক্ষত্রের পতন হলো!

কাকতালীয় হয়তো, মাত্র তিনদিন আগেই, ইউটিউবে হঠাৎ করে একটা গান চোখে পড়ল। ‘সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে’… কিন্তু কে গেয়েছে তা লেখা নেই, কোন অনুষ্ঠানে গাওয়া সেটারও নামগন্ধ নেই। স্বাভাবিকভাবেই আইয়ুব বাচ্চুর নামটাই আগে মনে আসল। অনেক দিন ধরে গানটা শুনি না। ভাবলাম, শুনি।

ঢুকে দেখি, আইয়ুব বাচ্চু নন! প্রতিযোগিতার নামক এক রিয়ালিটি শো-তে এক প্রতিযোগী গাইছে। এক মিনিটও শুনতে পারলাম না। কোথায় বাচ্চু, আর কোথায় এই ছোকড়া! বিচারকরা দেখি তবুও স্বভাবসুলভ গিনিপিগের মতো ইতিবাচক ছন্দে মাথা দুলিয়েই যাচ্ছেন!

ওহে বিচারক, একজন আইয়ুব বাচ্চু শত বছরে একবার আসেন। ক্ষণজন্মা হন। আর মানুষের অঢেল-অতল ভালোবাসা নিয়ে চলে যান। আইয়ুব বাচ্চুর গান গাইলেই কেউ ‘এবি’ হয়ে যায় না। এবি একজনই!

অন্য কোথাও, অন্য কোন সোনালী গানের দেশে আপনার ‘রূপালি গিটার’টা বুকে জড়িয়ে ভালো থাকবেন প্রিয় শিল্পী, আমার এক মুহূর্তের শিক্ষক কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।