বাচ্চু একটি ব্র্যান্ডের নাম

লোকটাকে আমি শুরুতে পছন্দ করতাম না। একটা বয়সে নিজের প্রিয় কারো প্রতিপক্ষকে পছন্দ না করাটাই নিয়ম ছিল। এখনকার যুগে যেমন মেসি ভক্তরা ক্রিসের ব্যর্থতা কামনা করে কিংবা ক্রিস ভক্তরা মেসির। ক্লাস সেভেন এইটে পড়া অবস্থায় আমার অবস্থানও এমনটাই ছিল। আমার প্রিয় ছিল মাইলস এবং শাফিন (এখনও তারাই এক নম্বরে)। সেই হিসেবে সেই মূহুর্তে তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এলআরবি আর আইয়ুব বাচ্চুই। তখনও জেমসের সেভাবে উত্থান হয়নি।

আইয়ুব বাচ্চুর ব্যর্থতা কামনা করলেও তার কিছু গানকে দূর্দান্ত লাগতো। সেই তুমি, ফেরারী মন, শেষ চিঠি, রুপালী গিটার কিংবা বাংলাদেশ গানগুলো শুনতাম আর ভাবতাম – ইস, এই গানগুলো যদি মাইলস গাইতো। ছোটবেলার আবেগী চাওয়া। আমার খুব কাছের একটা বন্ধু ছিল বাচ্চুর সমর্থক। সেই বন্ধুর সাথে মাইলস বনাম এলআরবি নিয়ে তর্কও লাগতো অনেক।

অনর্থক সব যুক্তিতে ভরপুর থাকতো। মাইলসের অ্যালবামের সব কয়টা গানই সুন্দর; বিপরীতে এল.আর.বির অ্যালবামের কয়েকটা গান বাদে বাকি গানগুলো শোনার অযোগ্য – এটা ছিল মাইলস প্রেমী গ্রুপের যুক্তি। অন্যদিকে বাচ্চু প্রেমীদের যুক্তি ছিল যে গানের মতো গান হলে একটাই যথেস্ট। ‘চলো বদলে যাই’ গানটা তো বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসেরই সবচেয়ে সেরা গান।

তর্ক সবসময়েই চলতো। তবে বাচ্চুর ‘কষ্ট’ অ্যালবামটা বের হবার পর সত্যিকার অর্থেই বাচ্চুর প্রেমে পড়ে গেলাম। অ্যালবামের প্রতিটা গানই অসাধারণ ছিল। বিশেষ করে ‘আমিও মানুষ’।

যদি ভুল করে তোমাকে চাই

বলো আমার কি দোষ

যদি মন ভালো বাসে তোমায়

বলি আমিও মানুষ।

এমন অসাধারণ গানের কথা ভালো না লেগে উপায় আছে? ধীরে ধীরে বাচ্চু প্রেমীদের কাছে হেরে যেতে থাকলাম। মাইলস অ্যালবাম বের করতো অনেক দিনের গ্যাপে। এছাড়া শাফিন কিংবা হামিনকে তখন মিক্সড অ্যালবামেও পাওয়া যেত না। অন্যদিকে মিক্সড অ্যালবামে তখন বাচ্চু হট কেক। প্রিন্স মাহমুদের মিক্সড অ্যালবাম গুলোতে বাচ্চুর হিট গান থাকবেই। ৯০ দশকের প্রতিটি ব্যান্ড অ্যালবামের ক্যাসেটের কপি আমার সংগ্রহে ছিল। বুঝতে পারার কথা কি পরিমাণ গান তখন শোনা হতো।

বয়সের একটা পর্যায়ে ম্যাচুরিটি আসে, আমারও আসলো। বুঝতে শিখলাম যে অনর্থক কারো ব্যর্থতা কামনা করে লাভ নেই। এর চাইতে সবার ভালো কাজগুলোকে উপভোগ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ধীরে ধীরে আমিও বুদ্ধিমান হয়ে গেলাম। বাচ্চু ভাইয়ের গানগুলোর সাথে উনাকেও ভালো লাগা আরম্ভ হলো।

খুব সম্ভবত ২০০০ সালের দিকে জেমসের সাথে একটা ডুয়েট অ্যালবাম আসলো পিয়ানো নামের। এই অ্যালবামের প্রতিটা গানই অসাধারণ। বিশেষ করে বাচ্চুর ‘প্রতিদান চায় না এমনও কিছু কিছু প্রেম হয়’ গানটাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাচ্চুকে পেয়েছিলাম। এতটা সফট মেলোডিয়াস গান বাচ্চু ভাইয়ের আগের কোন অ্যালবামে পাই নি।

আইয়ুব বাচ্চুর অনেক ওপেন এয়ার কনসার্ট দেখা হয়েছে। উনার অসংখ্য গানও প্রিয়। তবে সবচেয়ে প্রিয় গানের কথা বললে আমার কাছে দুটো গান আসবে। শক্তি অ্যালবামের নিহত নারীকে (জানিনা কেন অন্ধকারে তুমি একা, কাদো ও চোখ দুটি দু হাতে ঢেকে) আর স্টার টু অ্যালবামের সারা রাত তুমি (সারা রাত তুমি হেটেছো আমার নিঝুম স্বপ্ন পথে)।

এই দুটি গানের চেয়েও অনেক কালজয়ী গান বাচ্চু ভাইয়ের আছে। তবে যে কোন মানুষের কাছে প্রিয় হবার জন্য মোমেন্ট একটা ফ্যাক্টর। এই গান দুটো যে সময়ে শুনেছিলাম সেই সময়ের কারণেই হয়তো গানগুলো এত প্রিয়।

অপছন্দের মানুষকে ভালো লাগাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। বাচ্চু ভাই তার কারিশমার মাধ্যোমে আমাকে দিয়ে সেই কঠিন কাজটাও করিয়ে নিয়েছেন। আমাদের পরের প্রজন্মে অনেক ভালো ভালো ব্যান্ড শিল্পী এসেছেন। বাচ্চু ভাইয়ের সময়েও জেমস একটা বড় সময় রাজত্ব করে গিয়েছেন। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে ব্যান্ড সংগীত জগতের সবচেয়ে বেশি হিট গান উপহার দেওয়ার মালিক সম্ভবত বাচ্চু ভাইই।

আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয়তা কেমন সেটা একটা তথ্য দিলে কিছুটা অনুমান করতে পারবেন। মাঝে কোন একটা ঈদে সম্ভবত আরটিভির পক্ষ থেকে কয়েক রাত ব্যান্ড দল নিয়ে লাইভ প্রোগ্রাম করা হতো (এখনও হয়তো হয়)।

ঈদের মাঝে কাদের এত দায় পড়েছে যে রাত জেগে গান শুনবে। এক দুই ঘন্টা সম্ভবত প্রোগ্রামগুলো চলতো। এক রাতে ছিল বাচ্চু ভাইয়ের প্রোগ্রাম। অবাক বিষয় হচ্ছে দর্শকদের অনুরোধে সারারাত ব্যাপী বাচ্চু ভাইয়ের প্রোগ্রাম চললো। বাধ্য হয়ে অন্য প্রোগ্রাম গুলোর সময়সূচী পাল্টে ফেলা হলো। ব্যান্ড গান শোনার জন্য ঈদের প্রোগ্রাম পাল্টে ফেলা কি ভাবা যায় । বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা সেবারই প্রথম।

প্রতিটা মানুষকেই একটা সময় চলে যেতে হবে। কিন্তু মাত্র ৫৬ বছর বয়সেই এভাবে চলে যাওয়াটা সংগীত অংগনের জন্য একটা বিশাল ধাক্কা। আমরা যারা ৯০ দশকের প্রজন্ম তাদের সময়টাকে আনন্দ দেওয়ার পেছনে বাচ্চু ভাইয়ের ভুমিকা অনেক। আমাদের কাছে বাচ্চু ভাই মানে একটা ব্র্যান্ড। ওপারে ভাল থাকবেন কিংবদন্তি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।