দিন রাখে কথা আসে ফিরে, তুমি তো আসলে না আর

আমরা তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। প্রতিদিন বিকেল বেলা কলেজ মাঠে খেলাধুলা করি, কলেজে সদ্য ভর্তি হওয়া একনতুন ছেলেও আসে গিটার নিয়ে প্রতিদিন, তিন-চারজন বন্ধুকে নিয়ে কলেজের রোয়াকে বসে জামিয়ে গান গায়, অ্যাকুস্টিকের টুংটাং শব্দে একদিন কানে ভেসে আসে –

হাসতে দেখ গাইতে দেখ

অনেক কথায় মুখর আমায় দেখ

দেখো না কেউ হাসির শেষে নীরবতা

বোঝে না কেউ তো চিনলো না

– বলে ভীষণ একটা টান দেয়, মনে হয় বুকে যেন  কিছু একটা সে বিধে।

একই গান, একই সুর, সেই বিকেল বেলা প্রতিদিন শুনি, খেলতে গেলে মা কিংবা বোনের সাথে কোথায় বের হলে।

গুনগুন করে গাইতে থাকি, পাচ-ছয় লাইন এর বেশি লিরিক্স বুঝতে পারিনা। অনেক খোঁজ করেও গানের হদিস মেলেনা, সাহস করে তাদের জিজ্ঞেস করা হয়না কার গান। একে ওকে জিজ্ঞেস করি, কেউই জানেনা।

কম্পিউটার, সিডির দোকান, পাড়ার বরফ ওয়ালা কারো স্পিকারেই বেজে উঠেনা, হাসতে দেখো। একটা সময় মেনে নিতেই হয় গানটা তাদেরই  লেখা।

গিটার হাতে সেই ছেলেটা আমাদের বাসার সামনে দিয়েই যাওয়া আসা করে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে তার যাওয়া আসা দেখি সময় মিলে গেলে, আজও তার ঝাপসা স্মৃতি মনে পড়ে।

তারও কতদিন পরে মনে নেয়, কানে ভেসে আসে পরিচিত দরাজ কণ্ঠে একজন গাইছে, হাসতে দেখো, গাইতে দেখো।

আমার শৈশবের চিত্রপটে আঁকা মাথায় ব্যান্ডানা, চোখে সানগ্লাস, ডোরাকাটা এক টি-শার্টের আইয়ুব বাচ্চু। স্টুডিওতে বসে গাচ্ছেন, ‘এক আকাশের তারা তুই একা গুনিস নে।’ কখনো আবার গিটার নিয়ে হেলেদুলে, ‘একা একাকি থাকা যায়’ কিংবা ‘আমি বারোমাস তোমায় ভালোবাসি’।

বিয়ে কিংবা কোন অনুষ্ঠান, পিকনিক, সিডি, কম্পিউটারের দোকান চারিদিক তখন শুধুই আইয়ুব বাচ্চু।

আমাদের খেলাধুলায়, ক্লাসে, ব্রেকে  আইয়ুব বাচ্চু। বন্ধুদের ক্ষ্যাপাতেও আমরা লিরিকে  নাম জুড়ে দিয়ে গাইতে থাকি। রাস্তায় একা হাটতে থাকা ছেলেটিও জোরে গেয়ে উঠে চারিদিকে বাজতে থাকা গানগুলো।

কখনো আমার প্রিয় হয় শেষ দেখা কখনো তাজমহল, কবিতা, মেয়ে, যুগে যুগে, সেই তুমি, বেলাশেষে, ফেরারী মন, এখন অনেক রাত, বাংলাদেশ, নীরবে, আমিও মানুষ, সিনেমার প্লেব্যাক কিংবা টিভিসির ৩০ সেকেন্ডের জিঙ্গেল, ‘উ প্রিটি  গার্ল ইউ আর স্টিল মাইন।’

আমরা বড় হয়েছি তার গানের সাথে। আমাদের বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে তাঁর গান আর অ্যালবামের সংখ্যা। কখনো নিজ ব্যান্ডের, কখনো সলো কখনো আবার মিক্সড অ্যালবাম। কোনটারই চাহিদা কম ছিলো না।

তবে অপেক্ষায় থাকতাম মিক্স অ্যালবামেরই। এক ফিতায় এলআরবি, মাইলস, নগরবাউল, প্রমিথিউস, সোলস, অবসকিউর, চাইম পাওয়া ছিলো অনেক কিছু।

মিক্সড অ্যালবামে প্রথম সারিতে প্রথমে তার ছবি দেখে, অন্যদের চেয়ে আইয়ুব বাচ্চুর ছবিটা একটু বড় দেখে প্রিয় শিল্পীকে নিয়ে অহংকার জমতো।

ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার আগে ৮-১০ সাল পর্যন্ত মনে পড়ে একেকটা গান কালেক্ট করার পিছনের একেকটা গল্প।ইলেট্রিসিটি না থাকা রাতগুলোতে তাঁর গানগুলোই  ইলেট্রিসিটি ছিলো আমাদের পাড়ার ছেলেরদের কাছে।

বারাংবার শুনে শুনে কতবারই না মুগ্ধ হয়েছি গতগানের কত লাইন –

হায় এক বার

ফিরে যদি বলতে আমায়

মুখোমুখি হয়ে

কোনও দিনও ভালোবাসিনি তোমায়

কত শ্বাশত সত্য, অতিশয় গভীর, দুর্জ্ঞেয়, দর্শন, সাহিত্যই না দিয়ে গেছে গানের ছোট ছোট লাইনে। আমাদের অনুভূতি, আমাদের না বলা কথা আমাদের হয়েই বলে গেছেন।

‘শুধু কষ্টকে সাথী করে ভেবেছি চলে যাবো বহুদূরে, তবু মন পিছু ফিরে চাই। আমার কি দোষ আমি তো মানুষ।’

গিটারে সুর তুললেন এখন অনেক রাত। আমরা যেন ঘায়েল হয়ে গেলাম, নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছি।বুকের ভিতরটা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। কি এক নিগূঢ়, তাৎপর্যময় বানী –

জীবনের অনেক আয়োজন

আমায় ডেকেছে,

তাই আমি বসে আছি

দরজার ওপাশে

এমন করে আর নতুন কিছু আর বলবেনা, কেউ বাজাবেনা। দিনদিন যার গিটারের মুর্ছনায় নতুন নতুন অনুভূতি সৃষ্টি হতো, নতুন করে তার আর হবেনা।কারো গিটার আর কখনো কথা বলেবনা। বাজবে ঠিকই, কিন্তু কথা বলতো শুধু আপনারই গিটার।

বড় হয়ে দেখেছি মাথায় কালো হ্যাট কখনো ক্যাপ। চোখে সানগ্লাস। কালো প্যান্ট, টিশার্ট আর গিটারে এক আইকনিক রোল মোডেল, একটি ট্রেডমার্ক, যেন একটি জীবন ভাস্কর্য্য।

ক্যাপ আর সানগ্লাসের ফাকগলে আধার নামতে তাঁর কপালে। সেই আধারের মতোই অনাবিষ্কৃত মনে হয়ে চেরচেনা শিল্পীকে, ভীষণ অভিমানী আর চাপা স্বাভাবের মানুষটাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়ে ছিলো আপনার কি মনে হয় আপনি যোগ্য সম্মান পেয়েছেন? অভিমানে উত্তর দেয় কিভাবে পাবো? আমরা কি কখনো কাউকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিয়েছিলাম?

অথচ আপনাকেই দেখেছি আজম খানকে কোন স্থান দিয়েছলেন, শৈশবে আপনার কারনেই আজম খানকে চেনা। নয়তো ভুলতে বসা আজম খানের সন্ধান পেতাম অনেক পরে কিংবা হয়তো তার মৃত্যুতে।

রয়ালিটি আর কপিরাইট নিয়ে আপনাকেই দেখেছি সবচেয়ে সোচ্চার, দেখেছি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ভারতীয় শিল্পীদের গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমাদের শিল্পীদের তুচ্ছজ্ঞান করা, সময় কমিয়ে আনা, আপনি অভিমান করে বললেন, ‘সব হাততালি জমিয়ে রাখুন, সন্ধ্যার পরে সেই হাততালি কাজে লাগবে! বাংলাদেশি বলে ২০ মিনিট গাইবার সুযোগ পেয়েছি! বিদেশি হইলে আরও বেশী পেতাম!’

বিচারকের টেবিলে বসে আরেক সমসাময়িক আরেক শিল্পী, বিচারকের গানে ঝরঝর করে কেদে ফেললেন! একি করে হয়! এমনই সহজ সরল ছিলেন মানুষটি, এমন সহজ সরল তার আবেগ আর অনুভূতি প্রকাশের ভঙ্গি।

গিটার হাতে যিনি এমন ক্ষ্রিপ্ততা দেখাতেন, বাস্তব জীবনে তিনি ছিলেন নিরেট ভদ্র মানুষ, অনুকরণীয় আদর্শ, শান্ত স্বভাবের, ভীষণ রসবোধসম্পন্ন আর সাদা মনের মাটির মানুষ। যেন আমাদের গ্রামের পাশের বাসার কেউ,খুব আপন কেউ।

আজীবন বোহেমিয়ান মানুষটি অভিমানে ছোট্ট বয়সে ঘর ছাড়ে, শেষে বয়সেও এসে সংসার থেকে মুক্তি  পেতে চেয়েছিলেন। কিছুদিন আগে লিখেছেন –

দূরে কোথাও যাবো

যেখানে পাহাড়ে বসে মেঘ ছোঁব

ভীনদেশি বৃষ্টিতে

ভিজে যাবো।

জমে থাকা কথাগুলো

আকাশকে জানাবো।

আবার সব ছেড়েছুড়ে দেশের মধ্যেই কোথাও হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। সকল প্রকার যোগাযোগ মাধ্যম বিচ্ছিন্ন করে, সবার থেকে অনেক দূরে যেয়ে নিজের আত্মজীবনী লিখে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন।

তাঁর সেই আত্মজীবনী, তাঁর সেই জমা থাকা কথা কেউ জানলো না। আজ তবে আকাশও যে কিছুটা বঞ্চিত হলো তাকি নিজে সে আকাশ জানে?

নাহ! আজ তিনি আকাশেই ফিরে গেছেন আকাশেই আজ তাঁর বাড়ি, আকাশই কি আজ তবে অহংকারে টিপ্পনি কেটে হাসে আমাদের না থাকার হাহাকার দেখে?

আভিমান লিখেছে, কষ্ট লিখেছে, বারবার  লিখেছে চলে যাবার গান, উড়ালে দেয়ার গান, কেন গাইলে মরিবো মরিবো দাওগো বিদায়? কেন গাইলে রুপালি গিটার?

সাজানো পৃথিবীটা ছেড়ে যেতে

আমার সমাধীর পর আমি চাই না তোমার উপহার

আপবাদ দাও আমায়, যেন জ্বলে জ্বলে হারিয়ে যায়

নীরবে ফুরিয়ে যেতে চেয়েছিলে!

বারবারই শুধু ঘুরে ফিরে লিখেছেন চলে যাবার গান।

ঘুম ভাঙা শহরে,

মায়াবী সন্ধ্যা চাঁদ জাগা এক রাতে

আহা কিযে সুখ!

কিসের এত তাড়া ছিলো চলে যাবার ফিরে কি আসতে নেই?

পাঁচ বছর আগে হাবিব ওয়াহিদের সুরে আইয়ুব বাচ্চুর সাথে ১৪-১৫ জন নবীন প্রবীন শিল্পী নিয়ে তৈরি করা হলো বিজয় দিবসের একটি গান, এক পতাকা তলো। এই প্রথম নিজের খোলস থেকে বেড়িয়ে আসলেন তিনি। সবার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে উপস্থিত হলেন সাদা টি-শার্ট,ক্যাপ আর ফ্রি সাইজের নীল সাদা ফেড জিন্সে। ক্যাপের নিচের ব্যান্ডানা নেমে গেছে চুলের সাথে, মেদ ঝেড়ে ফেলে সুঠামদেহে দুহাত মেলে তিনি গাচ্ছেন সংসদের আঙিনায়।

শ্বেত শুভ্র আইয়ুব বাচ্চুকে দেখে মনে হল, যেন সাক্ষাৎ মেঘদুত, ঢাকার মাটিতে মেঘ নেমে এসেছে। সেই মেঘদূত, বাংলা সঙ্গীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, ঈর্ষনীয় ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটা আবারো সেই সাদা পোশাকে মেঘদুতের মতোই শহর ছেড়ে চির দিনের জন্য চলে গেলো।

ভালো থাকবেন প্রিয় ব্যক্তিত্ব, হাতে রাবার ব্যান্ড থাকবেনা, মাথায় থাকবেনা ক্যাপ। ক্যাপের নিচে সানগ্লাসে আঁধার জমবেনা, গিটারে সুর না তুলে নিথর পড়ে রবেন এইভাবে কখনো  আপনাকে দেখে মেনে নিতে পারতাম না।

প্রথম দেখাটাই শেষ দেখা হয়ে থাকুক প্রিয় মানুষ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।