ফ্যাশন মডেলিংয়ের সংজ্ঞা বদলে দেয়া আজরা মাহমুদ

আমাদের দেশের ফ্যাশন জগতে একটি আলোচিত এবং জনপ্রিয় নাম আজরা মাহমুদ। বাংলাদেশের জনপ্রিয় একজন র‌্যাম্প মডেল ও কোরিওগ্রাফার তিনি। এর বাইরে এই সময়ে এসে একজন সফল উপস্থাপিকা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এই দেশের গ্ল্যামার জগতে। আমাদের দেশের ফ্যাশন শোয়ে নতুনত্ব বা ভিন্নধারার ভিত্তি গড়ে তোলার পেছনে যে কয়জন মানুষের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো তাদের মধ্যে অন্যতম একটি নাম আজরা মাহমুদ।

ছোটবেলায় সময় পেলেই ফ্যাশন বিষয়ক চ্যানেল এফটিভি দেখার সময়ই মনে মনে মডেল হবার ইচ্ছাটা জন্ম নেয়। তবে পরবর্তীতে যখন র‍্যাম্পে মডেল হিসেবে কাজ করার সুযোগ সামনে আসে তখন দেখলেন এবং বুঝলেন যে, কাজটা এতো সহজ নয়। সুন্দর সুন্দর পোশাক পরে হেঁটে আসা আবার চলে গেলেই র‍্যাম্প মডেল হওয়া যায়না।

একটি ব্র্যান্ডের আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলাটা বিশাল একটা ব্যাপার। মডেলরা দর্শকদের সামনে যে ব্র্যান্ডের পোশাক পরে আসছে সেটার সাথে নিজেকে উপস্থাপন করা এবং সেই ব্র্যান্ডটাকে যথাযথভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা সেটা আবার শুধুমাত্র হাঁটা ও অভিব্যক্তি প্রকাশের মাধ্যমে। প্রথমদিকে নানারকম ভয়-ভীতি কাজ করলেও আজরা জানতেন র‍্যাম্পে ভুল করার কোন অবকাশ নাই। এটা ওয়ান টেক শো।

ফ্যাশন বিষয়ক নানা শো এবং প্রোগ্রাম দেখতে দেখতে, ভাবতে ভাবতেই মনের ভেতরে আস্তে আস্তে এই জায়গাটা নিয়ে একটা মুগ্ধতার জায়গা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই মুগ্ধতা থেকেই আস্তে আস্তে মডেল হিসেবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০০১ সালে ‘এভেলুশন’ নামে একটি মডেলিং এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করেন আজরা। সেই এজেন্সিটির প্রধান ছিলেন কৌশিকি নাসের তুপা। সেখান থেকেই তিন মাসের ট্রেনিং। ২০০১ সালের অক্টোবরে মডেল হিসেবে প্রথম শো করার সুযোগ পান আজরা। এভাবেই র‌্যাম্প মডেল হিসেবে যাত্রা শুরু।

তবে এই শুরুটাও একদম গল্পের মতো সহজ ছিলনা। বাংলাদেশের মানুষদের মনে মডেল বা নায়িকা মানে সুন্দরী হওয়াটা বাধ্যতামূলক ছিল তখনো। এবং সেই সুন্দরী হিসেবে গন্য হবার জন্য আজব কিছু ভিত্তি ছিল যেমন গায়ের রং, উচ্চতা এসব। নিজের উচ্চতা নিয়ে প্রথম দিকে আজরার মধ্যেও কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ কাজ করেছিল। কারন র‍্যাম্পে হাইট থাকাটা দরকারী ছিল।

সেই সময় অনুপ্রেরণা হিসেবে তার সামনে হাজির হয়েছিলেন কৌশিকি নাসের তুপা। আজরাকে সরাসরি বলেছিলেন তুপা যে, আমি তোমাকে কতটুকু সহযোগিতা করতে পারবো জানিনা কারণ তুমি বেশ খাটো। তারপরেও তুমি চাইলে শিখতে পারো। আজরার মাঝে এই ছোট্ট কথাটাই একটা সাহস জুগিয়েছিল। সেই সাহস থেকেই প্রতিদিন তিন চার ঘন্টা করে বাসায় আয়নার সামনে হাঁটা শুরু। হাঁটার চেষ্টাটা এমন যেন সহজেই অন্য সবার থেকে একটু আলাদা করা যায়।নিজেকে অন্যের থেকে আলাদা করতে না পারলে এই ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকা যাবে না বিষয়টা আজরা বুঝে গিয়েছিলেন খুব তাড়াতাড়ি।

তবে যেখানে ২০২০ সালে এসেও আমাদের দেশে মিডিয়াতে কাজ করার জন্য যেকোনো শিক্ষিত বা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির সন্তানদের (বিশেষ করে মেয়েদের) পরিবারের বা সমাজের কাছ থেকে সাপোর্ট জুটেনা সেখানে ২০০১ /২০০২ সালে কতটা স্ট্রাগল করতে হয়েছে তা বলে বা লিখে বোঝানোটা অনেক কষ্টকর। সামাজিক বা পারিবারিক নানা বিষয় মাথায় রেখে আজরার বাবা লেফটেনেন্ট কর্নেল মোঃ মাহমুদুর রহমান কিছুটা বিরোধীতা করেছিলেন।

বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে মায়ের সাপোর্ট নিয়ে আজরা এগিয়ে গিয়েছিলেন। আজরার মতে- আমার আম্মা অন্যরকমের মানুষ। আমি আম্মাকে যখন আমার মডেলিংয়ের কথা বলি তখন তিনি আমাকে সরাসরি বলে দিয়েছিলেন সমাজ কিন্তু এই বিষয়টাকে সহজভাবে গ্রহণ করবে না। তোমার পরিবারেরও অনেকে গ্রহণ করবে না। তারপরেও যদি তুমি করতে চাও সেটা তোমার সিদ্ধান্ত।

নানা রকম দ্বিধাবোধ মনে নিয়েই ২০০২ সালে ‘ইউ গট দ্য লুক’ বিউটি কনটেস্টে অংশগ্রহন করেন আজরা । ‘ইউ গট দ্য লুক’ প্রতিযোগিতায় ‘বেস্ট লুক’ অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তির পর মনে সাহস এবং স্বস্তি আসে। আজরার মতে সেদিন সেই ক্রাউনটা না জিতলে আজ এতদূর আসতে পারতাম না। এরপর প্রায় দুই বছর বাবার কাছ থেকে লুকিয়ে লুকিয়েই মডেলিং জগতে নিজের জায়গা তৈরী করার জন্য কঠোর পরিশ্রম এবং অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন স্বপ্নপূরণের আকাঙ্খা নিয়ে৷ তারপর ২০০৪ সালে হঠাৎ করেই তার বাবা জানতে পারেন মডেলিং জগতে আজরার পদচারনার বিষয়টি। তবে মেয়ের ইচ্ছাশক্তি, চেষ্টা আর কাজের প্রতি ভালোবাসা দেখে অনুমতি দিয়ে দেন।

আজরা তার ক্যারিয়ারের টার্নিং বছর হিসেবে মনে করেন ২০০৪ সালকে। এই বছরেই তার প্রথম কোরিওগ্রাফি ‘ইউ গট দ্য লুক’ প্রতিযোগিতায়। গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং এবং প্যান্টিন তাকে সুযোগটি করে দিয়েছিল। তারপরে টুকটাক কোরিওগ্রাফি করতে করতে ২০০৭ সালে কোরিওগ্রাফির মেইনস্ট্রিমে আসেন আজরা লাক্স চ্যানেল আই সুপার স্টার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। আজরার মতে ২০০৪ থেকে ২০০৭ এই তিন বছর ছিল কোরিওগ্রাফিতে তার স্ট্রাগলিং পিরিয়ড। ২০০৪ সালেই টিভিতে ‘সানসিল্ক অল্পরা’ অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে উপস্থাপনা শুরু করেন আজরা।

আবার ২০০৪ সালেই আফসানা মিমির প্রোডাকশন থেকে জনপ্রিয় মেগাসিরিয়াল ‘ডলস হাউজ’ নাটকে অভিনয়। সবমিলিয়ে ২০০৪ সালটা আজরার কাছে একটি এক্সপেরিমেন্টাল বছর। ২০০৭ সালে একভাবে বলতে গেলে আজরা মডেলিং থেকে কিছুটা দুরে সরে আসেন। শুধু উপস্থাপনা আর কোরিওগ্রাফির দিকে নিজের সমস্ত সময় এবং দক্ষতা দিয়ে নিজেকে প্রমানের লড়াইয়ে নামেন তিনি। এবং দুই ক্ষেত্রেই নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন আজরা। আজ এই সময়ে এসে দেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে আজরা মাহমুদ নিজেই একটি ব্র‍্যান্ড, নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। নতুন কাজ করতে আসা যেকোনো ছেলে-মেয়ের কাছে তিনি আইডল।

একজন কোরিওগ্রাফার হিসেবে এতোদিন কাজ করার পর নিজের অভিজ্ঞতা এবং প্যাটার্ন জানতে চাইলে একটি সাক্ষাৎকারে আজরা বলেছিলেন, কাজ করার জন্য প্রথমত ব্র্যান্ড ও ব্র্যান্ডের আইডেন্টিটি বোঝার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। যেকোনো ব্র্যান্ডের আইডেন্টিটির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকে। নির্ধারিত ব্র্যান্ডের আইডেন্টিটির সাথে কী ধরনের মিউজিক ব্যবহার করা হবে, র‌্যাম্পের হাঁটাটা কেমন হবে, এক্সপ্রেসন কেমন হওয়া উচিত, অডিয়েন্স থেকে র‌্যাম্পারের অবস্থান কতদূর হবে সবকিছু মাথায় রেখে কোরিওগ্রাফি প্ল্যান করতে হয়। অডিয়েন্স যাতে বোরড হয়ে না যায় সেটাও মাথায় রাখতে হয়।

আমাদের দেশের মডেলরা আসে কোন বিউটি কনটেস্টের মাধ্যমে বা কোন ফটোগ্রাফারের কাছে ছবি তুলে একে তাকে কোনভাবে ম্যানেজ করে মডেল হয়ে যায়। এই বিষয়টি নিয়েও আরো সুষ্ঠুভাবে নানা পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন আজরা। বিদেশে মডেল তৈরি করে এজেন্সি, রিক্রুট করে এজেন্সি। যারা প্রপার কিছু ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে একজন মডেল তৈরী করেন আমাদের দেশেও এরকম ভাবেই মডেলিং করতে আসা ছেলে-মেয়েদের তৈরী করা দরকার বলে জানান আজরা। কারন এই সময়ে প্রতিযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্মে টিকে থাকতে হলে শুধু মেধা থাকলেই হবেনা সেটিকে উপস্থাপন করা এবং নিজের মধ্যকার স্বতন্ত্রতা তুলে ধরাই সফলতার মূলমন্ত্র।

আজরার বাবা মোঃ মাহমুদুর রহমান একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট কর্নেল। পরবর্তীতে বিমানের এমডি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। মা গৃহিনী। বড় ভাই নিউজিল্যান্ড থেকে লেখাপড়া শেষ করে এখন বাংলাদেশেই বসবাস করছেন। আজরা জানান, আমরা পরিবারের সদস্যরা নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু কখনো যদি প্রয়োজন পরে এক হয়ে যেতে আমাদের সময় লাগে না। ছোটবেলায় আব্বাকে টাইগার ডাকতাম। আর এখন আব্বা আমার খুব ভালো বন্ধু। এখন তিনি আমার কাজকে খুব এপ্রিসিয়েট করে।

আজরার স্বামী সাজিদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। আজরার মতে- সাজিদ ভ্রমনপ্রিয় আধুনিক মানসিকতার একজন মানুষ। জীবনসঙ্গী হিসেবে সাজিদকে পছন্দ করার কারণও ছিল এটি। আমার জীবনের একটাই ফিউচার প্ল্যান সেটা হল পৃথিবীর কোনা কোনা ঘুরে দেখা। সাজিদের সাথে পরিচয় হওয়ার পর দেখি সেও একই রকম। আমি ভাবিওনি এমন একজন মানুষকে আমি লাইফ পার্টনার হিসেবে পাব। আমার পুরো শ্বশুড়বাড়ি ইসলামিক মানসিকতার। কিছুটা ভয়ে ছিলাম তারা আমার প্রফেশনকে তারা কীভাবে গ্রহণ করবেন। তবে শ্বশুড়বাড়িতে গিয়ে বুঝেছি আমার স্বামী কীভাবে এতটা ব্রড মাইন্ডেড হয়েছে। ইসলাম যা তারা ঠিক সেটাই ধারণ ও লালন করে। আমি তাদের সাথে থাকি। সারাটা জীবন তাদের সাথেই থাকতে চাই।

প্রতিটা মানুষ তার জীবনে কাউকে না কাউকে আইডল মেনে তার ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিজীবন প্ল্যান করেন। আজরার কাছে তার আইডল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি একটি নামই বলেন সেটি হচ্ছে আমাদের দেশের একজন সফল ব্যক্তিত্ব তামারা আবেদ। সফল মডেল এবং কোরিওগ্রাফার আজরার জীবনের মোটিভ বা প্ল্যান কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনের মোটিভ হচ্ছে পৃথিবী ঘোরা। আমি টাকা সঞ্চয় করি পৃথিবী ঘোরার জন্য। সুযোগ পেলেই উড়াল দেই। আর বই পড়তে ভীষণ পছন্দ করি। যদিও ব্যস্ততার কারনে সেভাবে সব সময় বই পড়া হয়ে উঠেনা তবে অবসর পেলেই বই পড়া হয়। আর ক্যারিয়ারের দিক থেকে চিন্তা করলে ফিউচার প্ল্যান হচ্ছে আজরা মাহমুদ এন্ড গ্রুমিং স্টুডিও-কে ভালোভাবে স্টাবলিশ করা। কারন এই সময়ে এসে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অনেক ডেভেলপ করেছে, কাজের নানা ক্ষেত্র বেড়েছে তাই মানসম্মত মডেলের এখন খুবই দরকার। এই বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াসলি কাজ করার সময় এখন।’

সত্যিকারের প্রশিক্ষণ, গ্রুমিং এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মেও ভালো কাজের সাক্ষর রাখতে পারবে বলেই আশা করেন আজরা। দুচোখে অনেক স্বপ্ন নিয়ে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই সময়ে এসে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম স্তম্ভ আজরা মাহমুদ। স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্য কাজের প্রতি ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম, মেধা এবং দক্ষতার মাধ্যমে এই ইন্ডাস্ট্রিতে নিজেকে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়া আজরার নতুন দিনের নতুন স্বপ্ন পূরণ হোক – সেই প্রত্যাশা রইলো।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।