সাধারণ, তবে কার্যকর

টিপিক্যাল পাকিস্তানি ফাস্ট বোলারদের মত সুইং নির্ভর নন; বরং আজহার মেহমুদকে বলা যায় একজন সিম নির্ভর ‘হিট দ্য ডেক’ বোলার। তবে বোলিংয়ের চাইতে তিনি বেশি জনপ্রিয় ছিলেন তার সহজাত আক্রমণাত্মক ব্যাটিং স্টাইলের জন্য।

১৯৯৬ সালে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক, কানাডার টরন্টোতে। তবে সেটা মনে রাখার মত কিছু ছিল না। মিডল অর্ডারে কার্যকরী ব্যাটিং এবং ‘চেঞ্জ বোলার’ হিসেবে সীমিত ওভারের উপযোগী বোলিং দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে দ্রুতই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন দক্ষ অলরাউন্ডার হিসেবে। ওয়ানডেতে ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই তাঁর বেশ কিছু স্মরণীয় পারফরম্যান্স রয়েছে।

১৪৩ টি একদিনের ম্যাচে তিন হাফ সেঞ্চুরিতে আজহারের সংগ্রহ ১৫২১ রান। সর্বোচ্চ ইনিংস ভারতের বিপক্ষে ৬৭ রান, ২০০০ সালে অ্যাডিলেডে। এছাড়া বল হাতে উইকেট নিয়েছেন ১২৩টি। ম্যাচে ৫ উইকেট শিকার করেছেন তিন বার।

ওয়ানডেতে সর্বমোট ৪ বার ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন আজহার মেহমুদ। যার সবগুলোই এসেছে ১৯৯৯ সালে।

★ ভারতের বিপক্ষে বেঙ্গালুরুতে ২৫ রান ও ১০-১-৩৮-৫

★ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রিস্টলে ৩৭ রান ও ১০-১-৪৮-৩

★ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শারজায় ১০-২-১৮-৬

★ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শারজায় ১৭ রান ও ১০-২-২৮-৫

পাকিস্তানের হয়ে ৫০ ওভারের দু’টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন আজহার; ১৯৯৯ ও ২০০৭ সালে।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে তুলতে বল হাতে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ২৬ গড়ে নিয়েছিলেন ১৩ উইকেট। এছাড়া ব্যাট হাতে করেছিলেন ১১৭ রান।

ওয়ানডে অভিষেকটা স্মরণীয় না হলেও টেস্ট অভিষেকটা ঠিকই স্মরণীয় করে রেখেছেন সাবেক এই অলরাউন্ডার। ১৯৯৭ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অভিষেক টেস্টেই হাঁকিয়েছিলেন দারুণ এক সেঞ্চুরি। এরপর বল হাতে নিয়েছিলেন ২ উইকেট।

অভিষেক টেস্টের দুই ইনিংসেই ছিলেন অপরাজিত। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির (১২৮*) পর দ্বিতীয় ইনিংসে পেয়েছিলেন ফিফটি (৫০*)।

আজহার মেহমুদের টেস্ট ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাল্লাটা তেমন ভারি নয়। মাত্র ২১ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৩০ গড়ে রান করেছেন মাত্র ৯০০।  তিনটি সেঞ্চুরি করেছেন যার সবগুলোই এসেছে মাত্র চার মাসের ব্যবধানে, একই প্রতিপক্ষের (দক্ষিণ আফ্রিকা) বিপক্ষে।

এছাড়া টেস্টে বল হাতে মেহমুদের শিকার মাত্র ৩৯ উইকেট। ইনিংসে ৫ উইকেট নেই একবারও; সেরা বোলিং ৫০ রানে ৪ উইকেট, ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।

টেস্ট ক্যারিয়ারে আজহার মেহমুদের সেরা সাফল্যটা এসেছিল ১৯৯৭-৯৮ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। জোহানেসবার্গ ও ডারবানে সিরিজের প্রথম দুই টেস্টেই পেয়েছিলেন সেঞ্চুরি (১৩৬ ও ১৩২)।

ডারবানের কিংসমিডে হাঁকানো সেঞ্চুরিটা এসেছিল ৭ নম্বরে নেমে; শেষ পর্যন্ত ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দিয়েছিল ওই ইনিংসটাই। পাঁচ দিন ব্যাপী একটি লো স্কোরিং রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের যবনিকা পতন হয়েছিল পাকিস্তানের ২৯ রানে জয়ের মধ্য দিয়ে।

আজহারের ১৩২ রানের অনবদ্য ইনিংসটির মাহাত্ম্য আরো বহুগুণে বেড়ে যায় যখন নাকি বিপক্ষ দলে ছিলেন শন পোলক, অ্যালান ডোনাল্ড, ফ্যানি ডি ভিলিয়ার্স, ল্যান্স ক্লুজনার, প্যাট সিমকক্সের মতো বিশ্বমানের একেকজন বোলার! উইজডেনের ভাষ্যমতে, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার পেস বিভাগের গভীরতা ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ছিল।’

উল্লেখ্য, জনপ্রিয় ক্রীড়া ম্যাগাজিন উইজডেন মনোনীত টেস্ট ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ১০০ ইনিংসের তালিকায় ‘আজহারের ১৩২’ এর অবস্থান অষ্টম স্থানে।

বিখ্যাত ওই ইনিংস ও ম্যাচ প্রসঙ্গে একটু বলতে চাই। ডারবানের পেস বান্ধব উইকেটে সেদিন টসে জিতে বোলিং নিয়েছিল স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্যাটিংয়ে নেমেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে সফরকারী পাকিস্তান। ডোনাল্ড-পোলকদের বোলিং তোপে একে একে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান সাঈদ আনোয়ার, আমির সোহেল, ইজাজ আহমেদ, ইউসুফ ইয়োহানার (মোহাম্মদ ইউসুফ) মত ব্যাটসম্যানরা।

একসময় তাদের স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় ৮৯/৫। ঠিক ওই সময়ই ক্রিজে আসলেন ২২ বছর বয়সী অলরাউন্ডার আজহার মেহমুদ। নেমেই প্রথমে মঈন খানের (২৫) সাথে ৩৮ রানের একটা মাঝারি জুটি গড়ে চেষ্টা করলেন প্রাথমিক বিপর্যয়টা সামাল দেয়ার। কিন্তু ১২৭ থেকে ১৫৩ – মাত্র ২৬ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে অল্প রানেই গুটিয়ে যাবার শঙ্কায় পড়ে যায় পাকিস্তান।

আইপিএলে কেকেআরের জার্সিতে

১৫৩/৮ থেকে পাকিস্তানের স্কোরটা সেদিন আড়াইশ’র ওপর নিয়ে যাওয়ায় ‘শতভাগ’ কৃতীত্ব আজহার মেহমুদের। দুই টেইলএন্ডারকে নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাক স্টাইলে ব্যাটিং করেছিলেন তিনি। ডোনাল্ড, পোলক, ফ্যানি ডি ভিলিয়ার্সের মত বোলারদের দিয়েছিলেন বেধড়ক পিটুনি।

ডোনাল্ডের বলে ‘শেষ উইকেট’ হিসেবে বোল্ড হওয়ার আগে মেহমুদের ব্যাট থেকে আসে সর্বোচ্চ ১৩২ রান; যার ৯৬ রানই এসেছিল বাউন্ডারি থেকে। ততক্ষণে দলীয় স্কোর গিয়ে ঠেকেছে ২৫৯ রানে।

শেষ দুই উইকেট জুটিতে পাকিস্তান যোগ করেছিল ১০৬ রান যার ‘১০০’ ই এসেছিল আজহারের ব্যাট থেকে!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

পাকিস্তান প্রথম ইনিংসঃ ২৫৯ (আজহার ১৩২; ডোনাল্ড ৫/৭৯, পোলক ২/৫৫, ক্লুজনার ২/৬৭)

দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম ইনিংসঃ ২৩১ (পোলক ৭০, অ্যাকারম্যান ৫৭; শোয়েব আখতার ৫/৪৩, মুশতাক আহমেদ ৩/৭১)

পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসঃ ২২৬ (সাঈদ আনোয়ার ১১৮; পোলক ৬/৫০)

দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ইনিংসঃ ২২৫ (বাউচার ৫২, ডি ভিলিয়ার্স ৪৬, পোলক ৩০; মুশতাক আহমেদ ৬/৭৮, ওয়াকার ৩/৬০)

ফলাফলঃ পাকিস্তান ২৯ রানে জয়ী।

ম্যাচ সেরাঃ মুশতাক আহমেদ।

২০০১ সালের পর হঠাৎ করেই ফর্ম হারিয়ে ফেলেন আজহার। নির্বাচকদের উপেক্ষা, পড়তি ফর্ম, অলরাউন্ডার হিসেবে আব্দুল রাজ্জাকের উত্থান; সবমিলিয়ে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান তিনি। ২০০২ সালে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে, চুক্তিবদ্ধ হন কাউন্টি দল সারের সাথে। ২০০৩ সালে এক ব্রিটিশ নারীকে বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

আইপিএলের প্রথম আসরে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের জার্সিতে

তিন বছরের কাউন্টি চুক্তি শেষে ২০০৫ সালে দুই বছরের জন্য পুনরায় চুক্তিবদ্ধ হন সারের সাথে। ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদনও করেন ওই বছরই। ২০০৮ সালে সারে ছেড়ে যোগ দেন কেন্টে। সেখানে একটানা পাঁচ বছর খেলে অবসর নেন ২০১২ সালে। এরপর থেকে তিনি ‘ফ্রিল্যান্স’ ক্রিকেটার হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগ খেলে বেড়িয়েছেন ২০১৬ সাল পর্যন্ত।

বর্তমানে তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিক। ২০১১ সালে ব্রিটিশ পাসপোর্ট পাওয়ার পর ইংল্যান্ডের হয়ে খেলতে পারেন এমন গুঞ্জনও শোনা গিয়েছে বেশ কয়েকবার। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে তিনি বেছে নিয়েছেন পেশাদার কোচিং ক্যারিয়ার। বর্তমানে নিজ দেশ পাকিস্তানের বোলিং উপদেষ্টার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন তিনি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।