আয়াপ্পানুম কোশিয়াম: দুই পুরুষের অহংবোধ

‘আয়াপ্পানুম কোশিয়াম’কে বলা যায়, ২০২০ সালের আরেক মালায়ালি সিনেমা ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স’-এর ‘স্প্রিচুয়াল সাক্সেসর’ বা ‘স্প্রিচুয়াল সিক্যুয়াল’। অফিশিয়ালি কোন সিক্যুয়াল নয় এটি। এমনকি পৃষ্ঠতলের গল্পের দিক থেকে ভিন্ন। কিন্তু মূল জায়গাটিতে আছে সাদৃশ্যতা। দুটি গল্পই আবর্তিত হয়েছে, দু’জন পুরুষের অহংবোধ’কে ঘিরে। অহংবোধ হতে সৃষ্ট দ্বন্দ্বই স্থান পেয়েছে দুই সিনেমায়।

সেকারণেই ‘স্প্রিচুয়াল সাক্সেসর’ বিশেষণটি জুড়ে দেওয়া। আক্ষরিক সাদৃশ্যের জায়গাটি হলো, দুটো সিনেমাতেই কেন্দ্রীয় একজন অভিনেতা হিসেবে আছেন পৃথ্বীরাজ। এবং তার চরিত্রটি একটু এদিক ওদিক হয়ে মোটাদাগে একই বৃত্তে অবস্থান করছে। নেগেটিভ শেডের চরিত্র। (স্প্রিচুয়াল সাক্সেসর এর বিশেষণ জুড়ে দেওয়ায় এই সাদৃশ্যকে যে টানা হয়েছে, তা অবশ্য নয়।) তবে; সর্বাপেক্ষা বড় সাদৃশ্যতা হলো, দুটো সিনেমার চিত্রনাট্যকার একজনই, সাচি, যিনি এই সিনেমায় পরিচালনাও করেছেন। স্ট্যান্ড অ্যালোন সিক্যুয়াল হিসেবেও দেখা যেতে পারে এই সিনেমাকে।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের গল্প ছিল এক সুপারস্টার এবং এক ইন্সপেক্টরের মধ্যকার অহংবোধের সংঘর্ষ নিয়ে। সেই সংঘর্ষ এই সিনেমায় (আয়াপ্পানুম কোশিয়াম) অবস্থান নিয়েছে একজন সাবেক হাবিলদার এবং একজন সাব-ইন্সপেক্টরের মাঝে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, ধনী, মদ্যপ এক সাবেক হাবিলদারের গাড়িতে মদ পাওয়া গেলে তাকে সাব-ইন্সপেক্টর ধরে নিয়ে যায় থানায়।

গাড়িতে মদ নিয়ে যেই এলাকার উপর দিয়ে সাবেক হাবিলদার যাচ্ছিল, ওই এলাকা মদ হতে সংরক্ষিত এলাকা। তাই ক্ষমতার গরম, এই পেশায় পূর্বে থাকার অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে কোনভাবেই সাব-ইন্সপেক্টরের হাত থেকে নিস্তার পেল না সাবেক হাবিলদার কোশি। এই বিষয়টিই তার অহংবোধে তীব্র আঘাত হানে। ক্ষমতাবান, বড়লোক বাপের বখে যাওয়া ছেলে সে, দু’টাকার এক সাব-ইন্সপেক্টর তাকে জেলে পুরলো!

এই হেনস্তা মেনে নেয়নি কোশি। প্রতিশোধ সে নেবেই। আর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ধীর মেজাজের সৎ সাব-ইন্সপেক্টরের গা থেকে যখন পোশাক কেড়ে নেওয়া হলো, অহমে লাগলো তখন তারও। বাধ্য হয়েই আগের রূপে ফিরতে হলো তাঁকে। এবং সংঘর্ষের তখন সবে শুরু।

একই বিষয় উঠে আসা ড্রাইভিং লাইসেন্স সিনেমা হিসেবে যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত এবং উপভোগ্য। সেটিকে তার যোগ্যতার অবস্থান হতে কোনদিকেই সরানো হচ্ছে না। তবে সে-দাগে সিনেমা হিসেবে এগিয়ে থাকবে আয়াপ্পানুম কোশিয়াম। মূল কারণ, এই সিনেমার শেকড়ে প্রোথিত বক্তব্যের জায়গাটি। ড্রাইভিং লাইসেন্স দুই পুরুষের অহমে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার উন্মত্ত সংঘর্ষের গল্পই। কিন্তু এই সিনেমা সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে কেরালার সামাজিক এবং রাজনৈতিক চিত্রকে বর্ণনা করেছে।

সমাজে উঁচু-নিচু জাতপ্রথার যে বিভেদ আবহমান সময় ধরে চলছে তাকে তুলে আনে, আয়াপ্পানুম কোশিয়াম। শুধু জাতপ্রথাই নয়, বুর্জোয়া শ্রেণী এবং প্রান্তিক শ্রেণীর মাঝে সবসময়কার যে দ্বন্দ্ব, বৈষম্য তাকেও তীক্ষ্ণ করে বক্তব্য পেশ করে এই সিনেমা। সিনেমায় কোশি (পৃথ্বীরাজ) চরিত্রটি প্রতিনিধিত্ব করছে বুর্জোয়া শ্রেণীর। অপরদিকে আয়াপ্পান (বিজু মেনন) চরিত্রটি প্রতিনিধত্ব করছে প্রান্তিক শ্রেণীর। প্রান্তিক শ্রেণী লড়ছে তার অস্তিত্ব রক্ষার্থে। অপরদিকে ক্ষমতাবান বুর্জোয়া লড়ছে তার অহম’কে সর্বোচ্চে প্রতিষ্ঠা করতে। সাথে বিজু মেননের স্ত্রীর চরিত্রটি কেরালায় মৌলবাদের বর্তমান অবস্থান তুলে ধরছে।

প্রায় ৩ ঘন্টার এই সিনেমা কখনোই অতিদীর্ঘ কিংবা অহেতুক দীর্ঘ এমন খেয়াল প্রতিষ্ঠা করেনি বুদ্ধিদীপ্ত, চতুর চিত্রনাট্যের জন্য। অহংবোধে অন্ধ কোশিকে বাস্তবে টেনে নামানোই এই সিনেমার মূল লক্ষ্য। এবং সে-লক্ষ্যে পৌঁছাতে যথাযথ চরিত্র এবং ঘটনাবলি এতে ছিল। পুরুষশাসিত সমাজে একজন পুরুষের অহমে আঘাত লাগলে সে কতটুকু যেতে পারে, কী কী করতে পারে তার কিনারা পাওয়া যায় না আসলে।

তাই, চিত্রনাট্যে মাঝে মাঝে একটু ‘অতিরিক্তই’ দেখানোর প্রবণতাটা অযাচিত নয়। বিশাল অংশে, অ্যাকশনটা এই সিনেমায় মূলত সংলাপে। সংলাপে প্রতি মুহূর্তেই অ্যাকশনের তীব্রতা আঁচ করা যায়। সেই আবহ ঠিকঠাকই তৈরি করা হয়েছে। মৌখিক যুদ্ধ বা শব্দযুদ্ধ ছাড়া হাতাহাতির যুদ্ধ যতটুকু আছে তা মূলত সিনেমার দ্বিতীয় ভাগে এবং প্রয়োজনমাফিক। চরিত্রগুলোর গঠনবিন্যাসও বেশ শক্ত।

কেন্দ্রীয় দুটি চরিত্র ছাড়া বাকি সকল চরিত্রগুলোও প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠেছে সিনেমার ন্যারেটিভে। সহযোগী চরিত্রগুলোর মাঝে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় কোশির বাবার চরিত্রটি এবং আয়াপ্পানের স্ত্রীর চরিত্রটি। বাবার চরিত্রটি একদিকে যেমন ক্ষমতাধারী আর পৌরষবোধে ভারী, অন্যদিকে আয়াপ্পানের স্ত্রীর চরিত্রটি দৃঢ়তায় ভারী। এবং দুটি চরিত্রে রঞ্জিথ, গৌরি নন্দার অভিনয় প্রশংসনীয়।

সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা তৃপ্তিদায়ক করতে লং শট এবং অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে বাস্তবিক অনুভূতি আনতে টিল্ট শটের আধিপত্য বিস্তার করা সিনেমাটোগ্রাফি যথাযথ কাজটিই করেছে। আত্তাপ্পাডির সুন্দর লোকেশনকে চোখে সতেজ করে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে সফট লাইট। তবে আলাদাভাবে উল্লেখ্য হয়ে উঠে আবহসঙ্গীতে ব্যবহার করা লোকগান। রাস্টিক অনুভূতিটাকে ধরতে পেরেছে।

আয়াপ্পানুম কোশিয়াম তার গূঢ় বক্তব্যগুলোকে যে নতুন, অভিনব উপায়ে উপস্থাপন করেছে তেমনটি নয়। তবে একটি পরিচিত ধারার মেইনস্ট্রিম সিনেমায় এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি, গুরুত্ব সহকারেই স্থান পেলে সেটি ভালো দিক। এবং সেদিক থেকে সাধুবাদ জানানোর বিষয় হলো; একটি ফাঁপা, স্থুল সিনেমায় এক/দুটো সূক্ষ্ম বক্তব্য ফাঁপা আকারেই সংযুক্ত করে দিলে সিনেমাটা একটু ভারী হবে- এমন খেয়াল হতে চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালক সাচি, সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোকে তার সিনেমায় সংযুক্ত করেননি। প্রয়োজনীয়তার দিকটি মাথায় রেখেই সংযুক্ত করেছেন।

দ্বিতীয়ভাগে অবশ্য বিষয়াদির দিক হতে আরো গভীরে দেখার সুযোগটিকে তিনি কাজে লাগাননি। রিভেঞ্জ সিনেমার প্রচলিত ধারাতেই থেকেছেন। তবে; মেইনস্ট্রিমের ট্যাগ গোড়া থেকেই যখন গায়ে, আরো অতলে না দেখাটা স্বাভাবিকই।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।