‘এই রুপালি গিটার ফেলে, একদিন চলে যাব দূরে…’

সালটা মনে নেই। সম্ভবত নব্বইয়ের দশক। বেনসন অ্যান্ড হেজেস কনসার্ট। মঞ্চে আজম খান, বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তি। বাজাচ্ছেন আইয়ুব বাচ্চু। দুই কিংবদন্তির বিরল যুগলবন্দী। বাইরে লাখ লাখ উন্মাতাল শ্রোতা।

আজম খানের উদাত্ত কণ্ঠ। গাইছেন, ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ…’। গুরু তখন থেকে অনেকটাই অসুস্থ। তারপরও গলায় সেই পুরনো জোর, পুরনো আবেগের সুর।

শেষটায় আর পারলেন না। বাচ্চুকে বুকে টেনে নিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘গা বাচ্চু…’

চোখ ভিজে আসা, হৃদয় কাঁপানো এক দৃশ্য!

বাচ্চু গেয়েই চলেছিলেন। এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের জলস্রোত। কিন্তু, তাঁকেও থামতে হল আজম খানের মত। একটু আগেভাগেই চলে গেলেন জীবন নদীর ওপারে। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে চলে গেলেন আকাশের ঠিকানা। ঠিক যেমনটা তিনিই গেয়ে গিয়েছিলেন, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে, একদিন চলে যাব দূরে…’!

বাংলাদেশের রক মিউজিকের মুকুটহীন সম্রাট তাঁরই হাতে তিলতিল করে গড়ে তোলা গোটা সাম্রাজ্যকে কাঁদিয়ে ভাসিয়ে সব কিছুর টানলেন। এই জগতে তাঁর আবির্ভাব ১৯৭৮ সালে। ‘হারানো বিকেলের গল্প’ শিরোনামের একটি গানে তিনি প্রথম কণ্ঠ দেন। যার কথা লিখেছিলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী।

১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯০ – এই লম্বা সময় তিনি ছিলেন সোলস ব্যান্ডে। তখন থেকেই তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীত ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’। যদিও, ১৯৮৮ সালে ময়না অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন আলাদা ব্যান্ড। নাম দেন ‘এলআরবি’। ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙ্গা শহরে’, ‘হকার’ – ইত্যাদি গান দিয়ে ১৯৯২ সালে আসে এলআরবির প্রথম অ্যালবাম। মৃত্যুর দিন অবধি তিনি ছিলেন এলআরবির সদস্য।

বলাই বাহুল্য, উপমহাদেশের ইতিহাসে তাঁর মত বিশাল মানের গিটারিস্ট এসেছেন হাতে গোনা ক’জন। কিন্তু, এই সবই এখন অতীত। মগবাজারে নিজের হাতে গড়ে তোলা স্টুডিও ‘এবি’স কিচেন’ এখন পিতা হারিয়ে শোকস্তব্ধ। রুপালি গিটার থেমে গেছে। তিনি উড়াল দিয়েছেন আকাশে।

যাবার বেলায় শুধু বলে গেছেন, ‘মনে রেখো তুমি কত রাত কত দিন শুনিয়েছি গান আমি, ক্লান্তিবিহীন অধরে তোমার ফোঁটাতে হাসি চলে গেছি’। হ্যা,  তিনি কোনোদিন ফিরবেন না, তকে কালজয়ী সব গানগুলো, সুরগুলো বেঁচে থাকবে মহাকাল ধরে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।