টম ক্রুজ: জীবনটাই যার জন্য ‘মিশন ইমপসিবল’

ছোটবেলায় ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে ধর্ম যাজক হবেন। কিন্তু ভাগ্যের কি অসাধারণ খেলা! তিনি এখন হলিউডের সর্বকালের সেরাদের একজন সুপারস্টার – থমাস ক্রুজ ম্যাপোথার।

১৯৬২ সালের তিন জুলাই জন্মেছিলেন বলতে গেলে একটা দরিদ্র ক্যাথলিক পরিবারেই।  মা ছিলেন শিক্ষিকা এবং বাবা ছিলেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। একে তো সংসারে দারিদ্রতার ছোঁয়া ছিলই, সাথে মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে ছিল প্রচণ্ড ‘অ্যাবিউসিভ’ বাবা। পান থেকে চুন খসলেই যিনি পিটিয়ে তক্তা বানাতেন। এজন্য বলা যায় শৈশব তেমন সুখকর ছিলনা তাঁর।

বাবার চাকরির সুবাদে প্রায়ই তাদের পুরো পরিবারকে বাসা বদলাতে হতো। যদিও মিডল স্কুলে পড়ার সময়েই বাবার সাথে তার মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তবুও ১৪ বছরেই তার স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছিল ১৫ বার!

বাবার সাথে ছাড়াছাড়ির পরেই পরিবারে দারিদ্রতা আরেকটু চেপে বসে। বিনামূল্যে শিক্ষার লোভে পড়েই ভর্তি হয়ে যান সেন্ট ফ্রান্সিস সেমিনারিতে। ওখানেই সিদ্ধান্ত নেন ধর্মযাজক হবেন। কিন্তু স্কুলের নিয়ম ভঙ্গ করতেন প্রায়ই, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিগারেট খেতেন। সাথে একদিন স্কুলের যাজকদের পার্সোনাল রুম থেকে মদের বোতল চুরি করে সহপাঠীদের বোকামীতে ধরা পড়ে যান। ফলাফল – স্কুল থেকে বরখাস্থ!

স্কুলে পড়াকালীন সময়েই টের পান – তাঁর ডিস্লেক্সিয়া আছে। পড়তে খুবই অসুবিধে হতো। এজন্য পড়ার দিকে মনোযোগ কম দিয়ে খেলাধুলায় মন বেশি দিলেন। সাথে নিজের আগ্রহবশতই স্কুলের ড্রামা ক্লাবগুলোয় মেম্বার হয়ে মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন। তখনই তাঁর মাথায় চাপে রেসলার হওয়ার শভুত। কিন্তু সেই ইচ্ছেতেও পানি ঢেলে দিল রেসলিং করতে গিয়েই হওয়া ইনজুরিটা! ফুটবলেও চেষ্টা করেছিলেন, ইনজুরির কারণে পারেননি।

গীর্জার যাজকও  হতে পারলেন না, খেলাধুলায়ও পারলেন না। কিন্তু অভিনয়ে আগ্রহ ছিল, আর অভিনয় করে বেশ প্রশংসা কুড়াতে পেরেছিলেন স্কুলে থাকাকালীন। তাই ভাবলেন অভিনয়ের লাইনটাও বাদ যাবে কেন ক্যারিয়ার চয়েজ থেকে! তাছাড়া মঞ্চনাটক করার কারণে তাঁর ডিস্লেক্সিয়াও কেটে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে। এজন্যই ১৯৮০ সালে হাই স্কুল শেষ করেই নিউ ইয়র্কে পাড়ি জমান অভিনয়ে আরো পাকা হতে। এই সময়টাই তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। নিজেই নিজের বার্থ নেম সংক্ষেপ করে আরেকটু স্টাইলিশ একটা নামে পরিণত করলেন – টম ক্রুজ!

কিন্তু নিউ ইয়র্কে অভিনয় শিখতে এসেও হতাশ হতে হল তাকে। ভালো কোনো ড্রামা স্কুলে ভর্তি হওয়ার মত টাকা তাঁর ছিলনা। টাকা জোগাড় করার জন্য এই মানুষটা বাস বয়, রেলওয়ে পোর্টার, রেস্টুরেন্টে টেবিল ক্লিনার হিসেবেও কাজ করেছেন। যা টাকা পেতেন তা দিয়ে নিজেকে চলতে হতোই, তারপরেও খুব হিসেব করে খরচ করে যা বাঁচাতে পারতেন – সেগুলো জমিয়েই ভর্তি হয়ে গেলেন নিউইয়র্কের বিখ্যাত ‘নেইবারহুড প্লেহাউজে’। সেখানেই বিখ্যাত অ্যাক্টিং ইন্সট্রাক্টর স্যানফোর্ড মেইনার আর ফিল গুশির মাধ্যমে অভিনয় শিখতে থাকেন।

আস্তে আস্তে তার অভিনয় দক্ষতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিভিন্ন জায়গায় অডিশন দিতে থাকেন, অনেক মঞ্চনাটকে অভিনয়ও করতে থাকেন। হঠাৎ করেই গডস্পেল নামের একটা মিউজিক্যাল ড্রামা দিয়ে নজর কাড়েন ফ্র্যাংকো জেফিরেল্লি নামের এক ইতালীয় পরিচালকের। উনিই তাকে ‘এন্ডলেস লাভ’ সিনেমাটায় একটা ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন। হলিউডে তার প্রথম সিনেমা!

এরপর আস্তে আস্তে আরো কয়েকটা ছোটখাট রোলে অভিনয় করেন। কিন্তু ১৯৮৩ তে মুক্তি পাওয়া ‘রিস্কি বিজনেস’ তাঁর ক্যারিয়ারের দিক পালটে দেয়। অসাধারণ অভিনয় আর আকর্ষণীয় চেহারা দিয়ে প্রশংসা কুড়ান তিনি। সাথে সেই আইকনিক আন্ডারওয়্যার পরে নাচতো ছিলই!

এরপর থেকে তাকে আর ঘুরে তাকাতে হয়নি। রিস্কি বিজনেসের পরেই প্রেস তাঁর গুণগান শুরু করে। সাথে এই চরিত্রের জন্য পেয়ে যান প্রথম গোল্ডেন গ্লোব নমিনেশন। এরপরেই আসে তার ক্যারিয়ের ব্রেকথ্রু – টপ গান সিনেমায় করা সেই একরোখা, অ্যাড্রেনালিন জাংকি ‘ম্যাভরিক’ চরিত্রটা। টপ গান ছিল বক অফিস হিট, সাথে তাকে এনে দেয় সুপারস্টারের তকমা।

এরপরের কাহিনী সবার জানা। একে একে করেছেন ‘কালার অফ মানি’, ‘বর্ন অন দ্য ফোর্থ অফ জুলাই’, ‘রেইন ম্যান’ এর মত চ্যালেঞ্জিং চরিত্রের সিনেমা, কুড়িয়েছেন ক্রিটিক্সদের প্রশংসা, বাগিয়ে নিয়েছেন গোল্ডেন গ্লোব, পেয়েছেন অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড নমিনেশন। সাথে ‘ককটেল’, ‘ডেজ অফ থান্ডার’, ‘ফার অ্যান্ড অ্যাওয়ে’ এর মত সিনেমাও করেছেন। প্রতিটা সিনেমার চরিত্রেই তিনি ছিলেন অনবদ্য!

১৯৯৪ তে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যান রাইসের বেস্ট সেলার ‘ইন্টারভিউ উইথ দ্য ভ্যাম্পায়ার’ অ্যাডাপটেশনে ‘লেস্ট্যাট’ চরিত্রে এই মানুষটা কাস্ট হয়েছেন দেখে স্বয়ং লেখিকাই সেটা মানতে পারেননি। বইয়ের ভক্তরা তো রীতিমতো প্রটেস্ট শুরু করেছিল!

কারণ, ছিল বইয়ের লেস্ট্যাট আর এই মানুষটার অ্যাপিয়ারেন্স সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু সিনেমা মুক্তির পর লেস্ট্যাটের চরিত্রে তার অভিনয় দেখে অ্যান রাইস নিজেই তার প্রশংসা করেছেন – বলেছেন এই চরিত্রে এর চাইতে ভালো আর কেউ করতে পারতোই না!

এরপরেই ১৯৯৬ সালে নিজের প্রোডাকশনে ‘মিশন ইমপসিবল’ নির্মাণ করেন। এই সিনেমাই ইথান হান্ট চরিত্রেও অভিনয় করেন। ফলাফল – আমরা ২০১৮ সালে এই সিরিজের ষষ্ঠ কিস্তি পেয়েছি। অন্যান্য লং সিরিজগুলোর সাথে এটার সবচেয়ে বড় পার্থক্য – মিশন ইমপসিবল সিরিজের সিনেমা গুলো দিনে দিনে বেটার হচ্ছে এবং ক্রিটিক্সদের প্রশংসাও বাড়ছে!

৩৮ বছরের এই হলিউডের অভিনয় জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য অ্যাওয়ার্ড, পেয়েছেন নমিনেশন। ৩ বার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড এর জন্য নমিনেশন পেয়েছেন, তিন বার জিতেছেন গোল্ডেন গ্লোব। সাথে অন্যান্য সম্মাননা তো আছেই!

তাঁর প্রসঙ্গে অতিমানবীয় কয়েকটা তথ্যের কথা না বললেই নয়।

  • ফোর্বসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষের তালিকায় টানা দু’বার শীর্ষস্থান অধিকার করা একমাত্র হলিউড অভিনেতা তিনি।
  • ২০০৬ সালে জাপান ১০ অক্টোবরকে ‘টম ক্রুজ ডে’ হিসেবে নামকরণ করে।
  • ফোর্বসের এস্টিমেশন অনুযায়ী টম ক্রুজের নেট ওর্থ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার!
  • ২০১২ সালে হলিউডের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক নেওয়া অভিনেতা ছিলেন তিনি।

আশা করি দিনে দিনে আরো ভালো ভালো সিনেমা উপহার দিবেন। অ্যাকশন সিনেমা আপনার প্রিয় জনরা জানি, পিওর ক্র্যাক হেডেড আপনি – তাও মাঝে মাঝে সেই পুরোনো ক্রুজকেও দেখতে ইচ্ছে করে। অ্যাকশন হিরোর পাশাপাশি যে চার্লি ব্যাবিট, রন কোভিচ, জেরী ম্যাগুয়ির, ফ্র্যাংক ম্যাকি, নাথান অ্যাল্গ্রেন কিংবা কোলাটেরালের ভিনসেন্টের মত রোল প্লে করতো! অথবা বেশি কিছু না – ট্রপিক থান্ডারের লেস গ্রসম্যানের সেই রোলটা!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।