বাজে সময় কাটিয়ে চূড়ান্ত যুদ্ধ জয়ের লড়াই

গেল বছরটা মোটেই ছন্দে ছিল না অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপের জন্য স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, নিজেদের গুছিয়ে ওঠাটাই তাঁদের জন্য শক্ত এক কাজ ছিল। যদিও, বিশ্বকাপ কাছাকাছি চলে আসতেই আবারো নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে অজিরা। আর এবারের বিশ্বকাপ অস্ট্রেলিয়ারই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের মাঠে। অ্যারন ফিঞ্চের দল কি পারবে বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে?

  • দলের শক্তিমত্তা

শক্তিশালী ফার্স্ট বোলিং ডিপার্টমেন্ট অজি স্কোয়াডের মূল শক্তি। নতুন বলের গতি ঘন্টায় ১৪০-১৪৫ কি.মি. রেখে টপ অর্ডার তছনছ করতে পারবে দলে এমন বোলার আছে পাঁচজন! দলে ফিরে এসেছেন ২০১৫ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী ফার্স্ট বোলার মিচেল স্টার্ক। তার সাথে আছেন প্যাট কামিন্স, ন্যাথান কাটার-নেইল, জেসন বেহেনডর্ফ এবং কেইন রিচার্ডসন। প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরানোর জন্য এই নামগুলোই যথেষ্ট।

দলের দ্বিতীয় শক্তিমত্তা হলো অজিদের টপ অর্ডার। ডেভিড ওয়ার্নার অস্ট্রেলিয়ার সেরা ব্যাটসম্যান, তার সাথে আছেন অভিজ্ঞ স্টিভেন স্মিথ, শন মার্শ, উসমান খাজা এবং অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ। এই টপ অর্ডারে যেমন পিঞ্চ হিটিং ব্যাটসম্যান আছে, তেমনি ঠুকঠুক করে ধরে খেলার কিংবা স্ট্রাইক রোটেট করে খেলা ব্যাটসম্যানও আছে।

অস্ট্রেলিয়া দলের ফিল্ডিংও বেশ ভালো। দলে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, স্টিভেন স্মিথ, শন মার্শদের মতো একাধিক ভালো ফিল্ডার রয়েছে। এর সাথে আরেকটি দিক অজিদের অন্যান্য দল থেকে এগিয়ে রাখে। সেটি হলো, ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা। টিম মিটিংএর সময় ‘পরাজয়’ বলতে অজি খেলোয়াড়দের ডিকশনারিতে কোনো শব্দ যুক্ত করতে দেওয়া হয় না। একটি ম্যাচ জয়ের জন্য তারা যেকোনো ছাড় দিতে রাজি। পরিস্থিতি দাবি করতে তারা তাদের অধিনায়ককে একাদশের বাইরে বসিয়ে রাখতে পারে! এইরকম চিন্তাভাবনা তাদের মধ্যে বেশি করে বড়মঞ্চ জয়ের ক্ষুদা তৈরী করে।

  • অভিজ্ঞতা

ইভেন্টটি যখন বিশ্বকাপ, তখন টিম অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়না। এই ইভেন্টে অজিরা বরাবরই ভয়ংকর। বর্তমান স্কোয়াডে থাকা ক্রিকেটারদের মধ্যে পূর্বে সবথেকে বেশি বিশ্বকাপ খেলেছেন সাবেক কাপ্তান স্টিভেন স্মিথ, দুইটি। এছাড়া বর্তমান অধিনায়ক ফিঞ্চ, ওয়ার্নার, ম্যাক্সওয়েল, স্টার্ক এবং কামিন্স খেলেছেন একটি করে বিশ্বকাপ। বাকি নয় জনের সবাই এবারই প্রথম বিশ্বমঞ্চে পা রাখবেন।

  • তুরুপের তাস

অলরাউন্ডার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল হতে পারেন এই দলের সব থেকে বড় এক্স ফ্যাক্টর। তিনি একজন ম্যাচউইনার! ম্যাক্সওয়েল ফর্মে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের সমীহ আদায় করে নেওয়া। ক্যারিয়ারে ১০০ ওয়ানডে খেলেছেন প্রায় ৪৫ গড়ে করেছেন ২৭০০ রান, বল হাতে নিয়েছেন ৫০ উইকেট। ক্যারিয়ারের একমাত্র সেঞ্চুরিটি তিনি গত বিশ্বকাপে করেছিল। এবারও টিম অস্ট্রেলিয়া তাঁর পারফরমেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

ফার্স্ট বোলিং অলরাউন্ডার প্যাট কামিন্স হয়ে উঠতে পারেন প্রতিপক্ষের জন্য আতংক। ৪৮ ম্যাচ খেলে ৮২ উইকেট নেওয়া এই খেলোয়াড় বর্তমানে ভালো রিদমে আছেন। এছাড়া সদ্য ফিরে আসা দুই তারকা স্টিভেন স্মিথ এবং ডেভিড ওয়ার্নারের ফিরে আসা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া গনমাধ্যমে কম সমালোচনা হয়নি। তারাও হয়তো মাঠের পারফরমেন্স দেখিয়ে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে চাইবেন।

সেই সাথে অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ ব্যাট হাতে জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষকে কড়া মাশুল দিতে হবে, একদিনের ক্রিকেটে তার ১৩ টি সেঞ্চুরি রয়েছে। সদ্য ইঞ্জুরি থেকে ফিরে আসা মিচেল স্টার্কও ঝলকানি দেখানোর ক্ষমতা রাখেন। প্রায় দেড় বছর হলো তিনি কোনো ওয়ানডে খেলেননি। তবে ক্লাসি খেলোয়াড়দের কখনোই ম্যাচ প্র্যাকটিস নিয়ে টেনশন নিতে হয় না, সময়মতো ঠিকই জ্বলে উঠেন।

  • দুর্বলতা

অস্ট্রেলিয়ার জন্য অন্যতম নেতিবাচক দিক হলো প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের মাঠে বিশ্বকাপ। ক্রিকেটে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া যে একে অন্যের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী, এ তো সবার জানা। দ্বিপাক্ষিক সিরিজে বরাবরই একে অন্যের মাঠে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়। সেই প্রভাব মাঠের খেলাতেও পরে। সবশেষ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্­যান্ডে হওয়া বিশ্বকাপে যেমন ইংল্যান্ড সুবিধা করতে পারেনি, তেমনি ইংল্যান্ডে হওয়া সবশেষ দুই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেও অজিরা খালি হাতে বাড়ি ফিরেছে। ইংলিশ কন্ডিশনে খেলা শেষ ১০ ম্যাচের ৮ টিই হেরেছে অজিরা, পরিসংখ্যান তাই বলে।

সেই সাথে স্মিথ-ওয়ার্নার আবার জাতীয় দলে ফিরে আসায় ইংল্যান্ডের একদল সমর্থকগোষ্ঠী বেশ ক্ষেপেছে। ইংল্যান্ডের সমর্থক গোষ্ঠী ‘বার্মি আর্মি’ প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে রেখেছে, ইংল্যান্ডের সাথে ম্যাচের দিন তারা অজি স্কোয়াডকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করবে। এই ক্ষ্যাপাটে ভক্তদের সামাল দেওয়া অজিদের জন্য বেশ কঠিন হবে।

এছাড়া টেস্টে স্টিভেন স্মিথ যতটা আতংকের ওয়ানডেতে তিনি ততটা ভয়ানক না। ইংল্যান্ডের মাঠে তার পরিসংখ্যান অনেক খারাপ।

কিপার হিসেবে অ্যালেক্স ক্যারি যতটা ভালো, ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি ততটা ভালো নন। যদি বর্তমান বিশ্বের অন্যান্য উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের দিকে তাকাই, সেখানে দেখা যায় মহেন্দ্র সিং ধোনি, মুশফিকুর রহিম, কুইন্টন ডি কক, জস বাটলার, শাই হোপদের মতো আদর্শ ব্যাটসম্যান খুজেঁ পাওয়া যায়। সেদিক থেকে ক্যারি কয়েক মাইল পিছিয়ে।

এছাড়া অজি স্পিন ডিপার্টমেন্ট ওয়ানডে ক্রিকেটে ততটা কার্যকর না, যতটা টি-টোয়েন্টি কিংবা টেস্টে দেখা যায়। যদিও এবার লায়ন এবং জ্যাম্পার মতো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ক্রিকেটার স্কোয়াডে, তবুও কতটুকু সাফল্য বয়ে আনতে পারবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান। তিন অজি স্পিনার লায়ন, জ্যাম্পা এবং ম্যাক্সওয়েল মিলে খেলেছেন ১৬৯ ম্যাচ, উইকেট নিয়েছেন ১৩৬ টি (গড় ইকোনমি ৫.৩৩)।

  • প্রেডিকশন

২০১৫ বিশ্বকাপে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর টিম অস্ট্রেলিয়াকে তেমন ছন্দে দেখা যায়নি। ঘরে এবং ঘরের বাইরে দুই জায়গাতেই সমান নাস্তানাবুদ হয়ে যাচ্ছিল। দুই বছর আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বৃষ্টির বিরম্বনায় গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হলো। এরপর স্মিথ-ওয়ার্নার দের কেলেঙ্কারি অজি টিমকে যেনো ক্ষত বিক্ষত করে দিলো।

তবে বছরের শুরু আচমকাই যেনো পুরো অজি স্কোয়াড ফর্ম ফিরে পেলো। আরব আমিরাতে গিয়ে পাকিস্তানকে ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করলো, ভারতের মাটিতে গিয়ে সিরিজ জিতে আসলো। এরপর স্মিথ-ওয়ার্নার-স্টার্কদের দলে ফিরে আসায় আরো শক্তি বৃদ্ধি পেলো।

বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ম্যাচ দুই জুন, আফগানিস্তানের বিপক্ষে। এবারের বিশ্বকাপে তাদের যা প্রস্তুতি তাতে তারা ইভেন্টের সব দলকেই কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে। তবে ভারত, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার সাথে নিয়মিত খেলে না, অজিদের সাথে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়েই থাকবে। তবে নেট রান রেটের খপ্পরে পড়লে পয়েন্ট টেবিলেও লড়াই হতে পারে!

১৯৯২ বিশ্বকাপের পর গত ছয় আসরে অজিরা কখনোই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেইনি। এই ছয় বারের মধ্যে আবার চারবারই চ্যাম্পিয়ন! একবার রানার্সআপ। এর আগে ইংল্যান্ডে হওয়া চার বিশ্বকাপের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া একবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, একবার হয়েছে রানার্স আপ।

ফিঞ্চ কি পারবে স্টিভ ওয়াহ, রিকি পন্টিং ও মাইকেল ক্লার্কের দেখানো পথ অনুসরণ করে চরম প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঠ থেকে আবারও কাপ নিতে?

  • অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াড

ডেভিড ওয়ার্নার, অ্যারন ফিঞ্চ (অধিনায়ক), উসমান খাজা, শন মার্শ, স্টিভেন স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারি (উইকেটরক্ষক), গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, মার্কাস স্টয়নিস, প্যাট কামিন্স, মিশেল স্টার্ক, ন্যাথান কাটার-নেইল, জেসন বেহরেনডর্ফ, কেইন রিচার্ডসন, অ্যাডাম জ্যাম্পা, ন্যাথান লিঁও।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।