সাউন্ডের ভাল-মন্দ ও অডিও গানের বেঁচে থাকার তাড়না

বিশাল বড় স্পিকার মানেই কিন্তু ভালো সাউন্ড নয়। তার জন্য আনুষঙ্গিক অনেক ব্যাপার থাকে। ধরুন, আপনার বাসায় কম্পিউটারে একটি গান চালাবেন, তার কোয়ালিটি নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট আপনি? সচরাচর আমাদের পিসিতে সাউন্ডকার্ড বিল্টইন হিসাবে যেটা থাকে, তা মোটামুটি চলনসই। ভালো সাউন্ড পেতে হলে অবশ্যই ভালো মানের সাউন্ড কার্ড আপনার থাকতে হবে। ইন্টারনাল এবং এক্সটার্নাল সাউন্ড কার্ডের পার্থক্য আপনি তখনি বুঝবেন, যখন এই ২ ধরনের কার্ড আপনার পিসিতে লাগিয়ে গান প্লে করবেন।

আপনার স্পিকারটি কেমন?

সাধারণত আমরা বাসাতে ২-৮ হাজার টাকার স্পিকারে গান শুনে থাকি এবং তার বেশিরভাগ ননব্র্যান্ড টাইপের। আমাদের দেশে মাইক্রোল্যাবসহ আর কিছু ব্র্যান্ডের স্পিকার পাওয়া যায় মাত্র। অনেক নামীদামী ব্র্যান্ডের স্পিকার এদেশে খুব একটা পাওয়া যায়না। বাইরের দেশ থেকে আনলে আরও ভালো ব্র্যান্ডের স্পিকার পাওয়া যায়। কিন্তু বাজেট বিশাল ফ্যাক্টর। কথায় আছে, টাকা থাকলে বাঘের দুধও মিলে থাকে। হ্যাঁ, আমার টাকা আছে কিন্তু ভালো স্পিকার কোনটা, সেটাই তো বুঝতে হবে আগে। নয়তো সব টাকা জলে যাবে কিন্তু আপনি সাউন্ড শুনে খুশি হবেন না।

হ্যাঁ, এখন আপনার অনেক ভালো সাউন্ড কার্ড হয়েছে, ভালো স্পিকারও হয়েছে। কিন্তু আপনি যে গানটি প্লে করছেন তার কোয়ালিটি কেমন? এখন তো অডিও সিডিই পাওয়া যায়না। কিছু এ্যালবামের অডিও সিডি পাওয়া গেলেও আপনার পছন্দের সব অ্যালবামের অডিও সিডি আর পাবেন না। সব শেষ!

কিন্তু অডিও সিডি থেকেই বা কতজনে গান শুনেছে কিংবা শুনে থাকে? বেশিরভাগ মানুষ বিভিন্ন সোর্স থেকে গান কপি করেই গান শুনে থাকে। এক্ষেত্রে উৎস দুটি। একটি অডিও, অন্যটি ভিডিও।

ধরুন, একজন ইন্টারনেটের সাইটে তার কাছে থাকা এমপিথ্রি ১২৮ কেবিপিএস-এর গান আপলোড করে রেখেছে। আপনি আপনার পছন্দের গান দেখে চট করে নামিয়ে নিলেন। গান শুনলেন, কিন্তু সাউন্ড কোয়ালিটি নিয়ে কতজনেই বা চিন্তা করে?

একটা অডিও সিডিতে গান থাকে ১৪১১ কেবিপিএস অডিও/ওয়েভ ফরমেটে। তাকে আমরা চাপিয়ে নিয়ে আসি অর্থাৎ কমপ্রেস করি বিভিন্ন সফটওয়্যার দিয়ে। কমপ্রেস করার সবচেয়ে জনপ্রিয় এক্সটেনশন হল এমপিথ্রি।

এমপিথ্রি-তে মন্দের ভালো কোয়ালিটি পাওয়া যায়। এমপিথ্রি’র সবচেয়ে বেশি বিটরেট হল ৩২০ কেবিপিএস।

১৪১১ কেবিপিএসের একটি গান সিডি থেকে নিয়ে তাকে আমরা এমপিথ্রিতে রূপান্তর করছি মাত্র ৩২০ কেবিপিএস-এ। যেখানে ওয়েভ ফরমেটের একটি গান সিডিতে যদি ৫০ মেগাবাইট সাইজের হয়ে থাকে, সেখানে কমপ্রেস করলে এমপিথ্রি-এর ৩২০ কেবিপিএস হয়ে যায় ১০-১১ মেগাবাইট। কত জায়গা বাঁচিয়ে দিল এমপিথ্রি আপনাকে তাইনা? তাও কিন্তু আপনি পাচ্ছেন না। বিভিন্ন সাইটে পাওয়া গান থাকে এমপিথ্রি-এর ১২৮ কেবিপিএস-এর। তার গড় সাইজ হয় ৪-৫ মেগাবাইটের। কোথায় ১৪১১ কেবিপিএস আর কোথায় ১২৮ কেবিপিএস, অনেকে তো ৬৪ কেবিপিএস পেলেই খুশি। ওই যে, আমার মেমোরিতে ৫০০০ গান আছে!

বুঝতে পারছেন তো, কোথায় যায় কোয়ালিটি? এবার আসি ভিডিও উৎস থেকে পাওয়া গান নিয়ে।

বর্তমান সময়ে গান বলতেই সবাই বোঝে ইউটিউবকে। চাইলেই এখন অনেক গান পাওয়া যায় এই ইউটিউবে। আপনি জানেন কি? ইউটিউবে একটি গান আপলোড করার জন্য যে ভিডিওটি বানানো হয় সেখানে যদি আপনি সিডি থেকে ১৪১১ কেবিপিএস কোয়ালিটির অডিও ব্যবহার করলেও ইউটিউব তা নিজে নিজেই এএসি ফরমেটে নিয়ে ১২৬/১৫২ কেবিপিএস-এ বানিয়ে নেয়। এমপিথ্রি আপনাকে যেটুকু কোয়ালিটি দেয়, এএসি তার চেয়েও অধম। ফলে আপনি কোন কোয়ালিটি শুনছেন আন্দাজ করুন।

আপনি যখন ইউটিউব থেকে কোন ভিডিও গানকে নামিয়ে নিচ্ছেন, তা এএসি ১২৬-১৫২ কেবিপিএস-এ থাকে। এবার আপনি বিভিন্ন কনভার্টার দিয়ে ভিডিওটিকে অডিও ফাইল হিসাবে বানাচ্ছেন এবং আপনার পছন্দমতো এক্সটেনশন এবং বিট রেট প্রয়োগ করছেন।

একটা ভালো ছেলে (১৪০০ কেবিপিএস ওয়েভ) কে যখন কোন কারণে বখে গিয়ে (এমপিথ্রি ৩২০ কেবিপিএস অথবা এএসি ১২৬ কেবিপিএস) হয়ে যায়, তখন তাকে কোন উপায়ে ভালো ছেলে (উত্তম কোয়ালিটি) বানাবেন?

আর একটা উদাহরণ দিই। ধরুণ, আপনার শরীরে একটি জায়গায় অপারেশন হয়েছে। সেখানে যদি দফায় দফায় অপারেশন করা হয় তাহলে সেখানের অবস্থা কি হতে পারে?

আমরা বলছি, ইউটিউব কোন অডিও গানের জায়গা নয়। এটা ভিডিও দেখার জায়গা। হয়তো আপনি অনেক পুরাতন গান খুঁজে পাচ্ছেন, কিন্তু তা কারো না কারো স্বল্প বিটরেটে আপলোড করা।

আপনার যদি অরিজিনাল সিডি না থাকে, তাহলে ইইয়া বড় সাউন্ড বক্স, ভালো সাউন্ড কার্ড দিয়ে কোন কোয়ালিটির গান শুনবেন? নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো, তাই তো! আমরা অডিও বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

অবাক হবেন আর একটা কথা জেনে। আমাদের দেশে ক্যাসেট আমলে যেসব সিডি বের হয়েছে তার ৯০ ভাগ কিন্তু সরাসরি মাস্টার অডিও থেকে রেকর্ড করা নয়। অর্থাৎ, ডিএটি বা স্পুল থেকে রেকর্ড করা নয়। ক্যাসেট থেকে। শক্তি, ক্ষমা, ঘৃনা, ওরা ১১ জন, দু:খিনী দু:খ করনা ইত্যাদি অ্যালবামের সিডি সাউন্ড যারা শুনেছেন তারাই হিসাব করুন। একটা অ্যালবামের মূল মাস্টার যদি শুনে থাকেন, তাহলে আপনি অডিও সিডির গানই আর শুনবেন না।

আর আমরা ভাগে পাচ্ছি স্পুল থেকে ড্যাট, ড্যাট থেকে মাষ্টার ক্যাসেট হয়ে ঘুরে আসা তিন টাকা রোলের সাধারণ মানের ক্যাসেট। সেই ক্যাসেটটাও যদি সরাসরি মাস্টার থেকে রেকর্ড করা হত, তাহলেও সেরাটাই পেতেন আপনি। কিন্তু ব্যবসায়িক অতি মুনাফার জন্য এদেশের কোন ক্যাসেট কোম্পানি কোয়ালিটির দিকে নজর দেয়নি।

বিদেশি বিভিন্ন অ্যালবামের মাস্টার ক্যাসেট তখন চড়া দামে পাওয়া যেতো, কিন্তু আমাদের দেশের কোন কোম্পানি তেমন মাস্টার ক্যাসেট বাজারে ছাড়েনি। ফলে আমরা কি পাচ্ছি? ৩০/৪০ বছর আগের ক্যাসেট থেকে রেকর্ড করে দেয়া গান আপনাদের মাঝে। অনেকে আবার বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা গান নিজের চ্যানেলে আপলোড করছেন। তাহলে তিনি কি নিচ্ছেন? ভিউয়ার, লিসেনার নয়।

আমরা আশিক মিউজিক সাধ্যমতো সীমিত ক্ষমতা, সাধ্য দিয়ে চেষ্টা করি মোটামুটি কোয়ালিটি ধরে রাখার। তার জন্য ৩০ বছর আগের সাধারন ক্যাসেট থেকে কতটা পরিশ্রম করতে হয় তা ভেবে দেখুন।

ওহ, আর একটি কথা। এখন তো স্পিকারেই গান শোনে খুব কম মানুষ। বেশিরভাগ মোবাইলে। মোবাইলটির অডিও কোয়ালিটি কেমন, অডিও চিপস কেমন, আপনার হেডফোন কোয়ালিটি কেমন ইত্যাদির উপরেই কিন্তু একটা ১৪১১ কেবিপিএস ওয়েভ ফরমেটের গান আপনি শুনতে পারবেন। মোবাইলের নাম ভালো হলেই কিন্তু সেই মোবাইল ভালো সাউন্ড দেয়না।

আশা করি কিছুটা হলেও সম্পূর্ণ বিষয়টি বুঝতে পারছেন!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।