‘অসুর’ দিয়ে সত্যি ইতিহাস গড়লেন জিৎ!

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

‘এতো বড় সত্যি!’

২০১৫ সালের পুজোর ঢের আগে থেকেই এই বিজ্ঞাপনী স্লোগান ঘুরছিল কলকাতার হোর্ডিংয়ে হোর্ডিংয়ে, লোকের মুখে-মুখে। বিশাল দুর্গার মুখ, আলতা পা কিংবা হাতে ধরা ত্রিশূল। দেশপ্রিয় পার্কের পুজোর টিজারে ছেয়ে গেল ট্রাম, বাস, মেট্রো, টিভি, শহরের রাজপথ। সত্যি উচ্চতায় বিশাল দুর্গা। তৃতীয়া চতুর্থী থেকেই খুলে দেওয়া হল পুজো। জনপ্লাবন পুজোর আগেই শুরু, কলকাতা শুধু দেশপ্রিয় পার্ক মুখী।

সবাই সব ঠাকুর ছেড়ে ছুটছে দেশপ্রিয় পার্ক। পঞ্চমীতে এই ভিড় সামলানো আর সম্ভব হলনা। পদপিষ্ট দর্শনার্থী। কলকাতা ভেঙে পড়ছে একদিকে। সরকার থেকে বন্ধ করে দেওয়া হল দেশপ্রিয় পার্কের পুজো। ষষ্ঠীর আগেই বহু অপেক্ষার সবচেয়ে বড় দুর্গা ফ্লপ শো হয়ে গেল। শুধু কলকাতা/ মফস্বল নয় বাংলাদেশ বাইরে থেকেও লোক আসে দেখতে এই পুজো। পুজো বন্ধ করলেও ঠাকুর উপরে উঠে দেখা শুরু হল। শেষ অবধি প্রতিমাই ভেঙে ফেলা হল। স্রষ্টার সৃষ্টি শেষ হল সবাই দেখতেই পেলনা। কে ছিল অসুর এই কাণ্ডে সেটা আমাদের বিষয় নয়।

বিষয় হল এই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে পরিচালক পাভেল পাঁচ বছর পর একটি ঐতিহাসিক ছবি বানিয়ে ফেললো। কারন এই ২০১৫ র পুজোতেই রিলিজ করেছিল পাভেলের প্রথম ছবি ‘বাবার নাম গান্ধীজি’। কিন্তু সবথেকে বড় দুর্গার ভিড়ে দেশপ্রিয় পার্কের পাশে প্রিয়া সিনেমা হল ফাঁকা যাচ্ছিল। পাভেলের প্রথম ছবি কম লোক দেখতে যাচ্ছিল। পাভেল ভেঙে না পড়ে এই সবথেকে বড় দুর্গা বিষয়টাকে নিয়েই ‘অসুর’ ছবি করে ফেলল এবং ছবি দেখে বলতেই হচ্ছে ‘অসুর’ ইতিহাস গড়ল।

তিন বন্ধু দুজন পুরুষ একজন নারী। ত্রিকোন প্রেম। সব ছকে বাঁধা গল্পের মতোই কিন্তু ত্রিকোন প্রেমে কে অসুর কে দুর্গা এইসব খুঁজতেই এবং সেটির অসাধারন উপস্থাপনা দেখতে ‘অসুর’ দেখতেই হবে।

কিগান মান্ডি, বোধিসত্ত্ব ও অদিতি- তিন বন্ধুর সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে এই গল্প সঙ্গে জড়িয়ে আছে সৃষ্টির আনন্দ, সৃষ্টি ধ্বংসের কান্না।

অদিতি কিগানকেই ভালোবাসে কিন্তু কিগান কাজকে তাঁর সৃষ্টিকে সবার আগে ভালোবাসে। সৃষ্টির মধ্যেই প্রেমিকা জননী দেবীকে খুঁজে পায়। এভাবেই কিগান অদিতির সম্পর্ক গাঢ় হয়। দুজনের মধ্যে ঘটে যায় অঘটন। কিগান তাঁর সৃষ্টি ভেবে অদিতিকে ভালোবাসতে চায়। এই ক্ষনিকের ভালোবাসায় অদিতি কিগানের সন্তানের মা হয়ে ওঠে।

কিন্তু, কিগান তো অদিতি মানুষটার চেয়ে নিজের কাজকে বেশী ভালোবেসে সেই সৃষ্টির সঙ্গেই তাঁর মিলন হয়েছে। কিন্তু কঠিন বাস্তব অদিতি মোকাবিলা করবে কি ভাবে? অদিতিকে কাঁধে মাথা রাখতে নিজের কাঁধ বাড়িয়ে দেয় বোধিসত্ত্ব। কিন্তু অদিতির মনে সেই কিগান। কিগানের নেই কোনো দায়-দায়িত্ব। সে সৃষ্টি নিয়েই মত্ত।

এরকিছু পর কিগান নিজের কর্মজগত আর্ট কলেজের কাজ খুইয়ে ঠিক করে কলকাতায় সবচেয়ে বড় দুর্গা বানাবে। আর সেই দুর্গা হবে অদিতির বাবার ক্লাবে। কিন্তু বোধিসত্ত্ব যে ব্যর্থ প্রেমিক হয়েই রয়ে গেল সে ভেঙে ফেলতে চায় কিগানের সৃষ্টি। শেষে কি হল সেটা দেখতে ‘অসুর’ দেখুন।

বাংলা ছবিতে এধরনের বড় মাপের ছবি একবারই হয়। ঠিক কিগানের করা সবচেয়ে বড় দুর্গার মতো। ছবিটা সবাই হলে গিয়ে দেখুন কারন ছবিটার যা স্কেল যা দৃশ্যায়ন যে সাউন্ড সেটা হলে বসেই উপলব্ধি করা যায়।

পাভেল যে কটি ছবি বানিয়েছেন তারমধ্যে ‘অসুর’ ছবিটি সেরা। নবীন পরিচালক হয়েও এত বিশাল কর্মকান্ডের ছবি বানাল সে। ছবিটা রামকিঙ্কর বেইজকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়ে করেছে পাভেল। জিত ওরফে কিগান যার খামখেয়ালী চরিত্র রামকিঙ্কর বেইজের মতোই অনেকটা। আবার ছবিটা আর্ট ফর্ম নিয়েও।

জিৎ একধরনের ছবি মাঝে করছিলেন কিন্তু এবার সত্যি সত্যি ঘুরে দাঁড়ালেন জিৎ। অনবদ্য জিৎ। জিতের এই অভিনয় না দেখলে বড় মিস।

ছবির প্রথমেই জিতের এন্ট্রি ঝাকড়া বড় চুল,দাঁড়ি, নগ্ন পায়ে শুধু পাঞ্জাবি পরে ক্লাসরুমে চলে আসা ছাত্র পড়াতে, তাক লাগিয়ে দেয়। আঁতকে উঠতে হয় এই কি জিৎ? জিতের অন্যধারার কামব্যাক ছবি তো বটেই এবং এখনও অবধি এত গুলো ছবি করার পরে এটি সেরা কাজ। নিজেকে কি বিপুল ভাবে ভেঙেছেন জিৎ, কিগান হতে।

ডায়লগ ডেলিভারি,তাকানো, সৃষ্টির আনন্দে ছেলেমানুষি কি দুঃখে ভেঙে পড়েও উঠে দাঁড়ানো সমস্ত এক্সপ্রেশনে জিৎ চমকে দিয়েছেন। জিৎ কত ভালো অভিনেতাও সেটা দেখতে এ ছবি দেখুন।

জিৎ আছেন বলেই ছবির বাকিরা পুতুল তা কিন্তু নয়। আবীর চট্টোপাধ্যায় তুখোড় অভিনয়ে এবং লুকে জিৎ এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছবি জুড়ে রয়েছেন। বন্ধুত্ব শত্রুতা মিলেমিশে গেছে কিগান-বোধি সম্পর্কে। জিৎ আবীরের একশন দৃশ্য চমকে দেবার মতো। ব্যর্থ প্রেমিক থেকে এন্টি হিরো কি ভিলেন আবীর দুর্দান্ত। ভিলেন বলা যায়না বোধি একজন ভালো বাবা সর্বোপরি।

ব্যর্থ প্রেম, হেরে যাওয়াই হয়তো তাঁকে ভিলেন বানাচ্ছে। মানসিক অবস্থাটাও অসুর।অন্যদিকে পুরুষ সর্বস্ব হিরো কেন্দ্রিক গল্প বানাননি পাভেল। নুসরতের সেরা চরিত্র অদিতি। অসম্ভব স্নিগ্ধ স্মার্ট দেখতে লেগেছে নুসরাতকে।

অসুর এমন একটা ছবি যেখানে নায়িকার উপস্থিতি খুব দরকারি এবং নজরকাড়া।

সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘জুলফিকার’-এ যা পারেননি পাভেল ‘অসুর’ এ নুসরাতকে দিয়ে অসাধারন সেই অভিনয় করিয়েছেন। নুসরাতের ভূমিকা কম নয় এ ছবিতে।

অদিতি না থাকলে কিগান এতদূর পৌঁছতো না।

পাভেলের আরেকটি বড় গুণ অভিনয় থেকে সরে যাওয়া অসুস্থ বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে ছবিতে কাজে ফিরিয়ে আনা। বয়সে ছোটো হয়েও পাভেল এই বড় কাজটি করেছেন। শুধু মুখ দেখানো চরিত্র নয়। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় দুরন্ত অভিনয় করেছেন। কেন শুধু ওঁনাকে ভিলেন করালো টলিউড এতদিন। অসুর দেখলে বুঝবেন বিপ্লব চ্যাটার্জ্জী নিভতে নিভতে জ্বলে উঠলেন। কুশল চক্রবর্তী, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী যথাযথ। শিশু চরিত্রটি অনবদ্য অভিনয়ে।

অসুর ছবিটা অসম্ভব বাঙালী, বাংলার সৃষ্টি গুলোকে তুলে ধরেছে।

ছবির গানে ইমন, শোভন, সায়নী, ইরফান, উজ্জয়ণী বেশ। গান গুলো শ্রুতিমধুর। ছবির খারাপ দিক খুব একটা নেই। চিত্রনাট্য, উপস্থাপনা, দৃশ্যায়ন দুরন্ত। অভিনয় তো প্রত্যেকের অসাধারণ।

খারাপ দিক বলা উচিত নয় তবু যাকে ঘিরে ছবি সেই পৃথিবীর সবথেকে বড় দুর্গা দেশবন্ধু পার্কের অত বড় লাগেনি ছবিতে। এটাই যা মানতে অসুবিধে হতে পারে দর্শকের। সেটা ছবির বাজেট , সুযোগ সবকিছুর উপর নির্ভর করে। তাতে পাভেলের ভাবনাটা জিতের প্রোডাকশান হাউসের এমন একটা ছবি করবার সাহসটা মাঠে মারা যায়না। ছবিটার যে থিম তাতে ভালো নম্বরে পাশ করে গেছে ‘অসুর’।

তাহলে অসুর টাকে ? সেটা দেখতে ছবিটা দেখুন। বলা যেটুকু যায় অসুর আমাদের সবার মনে আমাদের রাগ, প্রতিহিংসা, দায়িত্বহীনতা এগুলোই তো অসুর। অসুর মানেই কি ভিলেন? অসুরকে কি ভুল ভাবে পুরাণ ইতিহাসে রাখা হয়? অসুরকে চিনতে এ ছবি দেখুন।

এমন ছবি একবারই হয়। ইতিহাস একবারই হয়। তাই এই ছবিটাকে নিরাশায় নিমজ্জিত করবেন না। তাহলে পরিচালকরা,অভিনেতারা,প্রযোজকরা এমন অন্যধারার ছবি করতে সাহস পাবেনা। এই ছবি আর্ট ফর্মের উপর নির্মিত হলেও বক্স অফিস ধরে রাখার ক্ষমতা রাখে। এমন একটা বড় মাপের ছবি আগে টালিগঞ্জ পাড়া ভাবতেই পারতনা।

অসুর সত্যি ইতিহাস তৈরী করল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।