আশার ফুল, কলংকেরও!

নটিংহ্যামের সবুজ প্রান্তরে ট্রেমলেট ছুটছেন, সামনে অনন্য এক রেকর্ডের হাতছানি। অপরপ্রান্তে থাকা বাঘটাকে শিকার করতে পারলেই অভিষেকে হ্যাট্ট্রিক করার দূর্লভ কৃতিত্ব করে বসবেন। তবে সৃষ্টিকর্তা হয়তো অন্যকিছু ভাবছিলেন, নাহলে কি আর স্ট্যাম্পে বল আঘাত হানার পরেও বেল পরলো না? পুরো গ্যালারি চুপ। হাফ ছেড়ে বাচলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, সাথে বাংলাদেশও!

ঝড়টা শুরু এরপরে থেকেই। কয়েকদিন আগেই যে ঝড়ে উড়ে গিয়েছিলো পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া, সেই ঝড়েরই আভাস। উইকেটের চারদিকেই শুধু বাউন্ডারির ফোয়ারা ছুটলো, ২৩৮ স্ট্রাইকরেটে মাত্র ২১ বলে হাফসেঞ্চুরি! কিন্তু এবার আর দলকে জয়ের বন্দরে নিয়ে যেতে পারলেন না, থামলেন ৯৪ করে। বাংলাদেশের জয়রথ টাও থেমে গেলো সেখানেই!

নটিংহ্যামে আশরাফুল না পারলেও পেরেছিলেন কার্ডিফে, ম্যাগ্রাথ, ব্রেট লি, গিলেস্পিদের পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে বাংলাদেশকে দিয়েছিলেন ক্যাঙ্গারু বধের স্বাদ। পন্টিংয়ের সেই নখ কামড়ানো অদৌ পান্টার নিজেও হয়তো কখনো ভুলবেনা।

যদি ভেবে থাকেন আশরাফুল মানে শুধু এতটুকুই ত ভুল ভাবছেন!

৬ সেপ্টেম্বর ২০০১!

এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে পরাশক্তি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ মাত্র ৯০ রান অলআউট। শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংস ৫৫৫/৫ এ, চার টা ‘৫’ এর ইনিংস টা থামে ডিক্লেয়ারে। সেই ম্যাচেই প্রথমবারের মতো সাদা পোষাকে মাঠে নামে ১৭ বছরের এক তরুণ, প্রথম ইনিংসে সুবিধা করতে না পারলেও দ্বিতীয় ইনিংসেই নিজের জাত চেনান।

চামিন্দা ভাস, পেরেইরা, মুরালিদের বিপক্ষে আমিনুল ইসলামকে নিয়ে শতরানের পার্টনারশিপ গড়েন, সাথে কলম্বোতে করে ফেলেন এক অনন্য রেকর্ড। ইতিহাসের কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে রাজকীয় ফরম্যাটে সেঞ্চুরি, সেই ম্যাচে মুরালিধরনের সাথে যৌথভাবে ম্যান অব দ্য ম্যাচেরও স্বীকৃতি পান।

এরপরে আবারো লম্বা বিরতি, মাঝে শুধুই হতাশা!

২০০৪ সালের শুরুতে রঙিন জার্সিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তার ৩২ বলের ৫১ রানের ক্যামিও ইনিংসে বাংলাদেশ পায় ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তান বধের পর দ্বিতীয় জয়, প্রায় ৫ বছর পর আবারো হাসি মুখে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। সেই বছরেই চট্টগ্রামে ভারতের বিপক্ষে সাদা পোষাকে ১৫৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস উপহার দেন, সৌরভ গাঙ্গুলী তো বলেই ফেলেন, ‘তাঁর দেখা অন্যতম সেরা ইনিংস।’

২০০৫ সালের সেই বিখ্যাত কার্ডিফ জয়!

২০০৬ সালে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আবারো সেঞ্চুরির দেখা পান, বাংলাদেশ ম্যাচ না জিতলেও আশরাফুল পান ম্যান অব দ্য ম্যাচের স্বীকৃতি। ২০০৭ সালের ৭ এপ্রিল!

গায়ানায় আবারো আশরাফুল ম্যাজিক। প্রথমে ব্যাটিং করে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২৫১, যার ৮৭ ই আসে এই লোকটার উইলো থেকে। এনটিনি, পোলক, ক্যালিসদের পিটিয়ে প্রোটিয়াদের বিপক্ষে বাংলাদেশকে প্রথম জয়ের রাস্তাটা দেখিয়ে দেন, যার শেষ টা করেন বোলাররা। বিশ্বকাপের সুপার এইটে বাংলার বাঘেদের প্রথম জয়, পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সবোর্চ্চ রান সংগ্রাহক তিনিই!

সেই বছরেরই সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হয় টি-টোয়েন্টির বিশ্বকাপ। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজদের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়। বল হাতে সেদিন সাকিব আল হাসান জাদু দেখিয়েছিলেন ত ব্যাট হাতে ছড়ি ঘুরিয়েছেন একজন আশরাফুল। ২২৫.৯২ স্ট্রাইক রেটে মাত্র ২৭ বলে ৬১ রানের ঝলসানো এক ইনিংস, তাকে যোগ্য সাপোর্ট দিয়েছেন আফতাব আহমেদ। বাংলাদেশের আরো এক প্রথম জয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ মোহাম্মদ আশরাফুল!

২০০৮ সালে লাহোরে এশিয়া কাপের প্রথম ম্যাচেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে বাংলাদেশের বড় জয় (৯৬ রানে) এবারো আশরাফুলের সেঞ্চুরি সাথে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরষ্কার টাও!

এরপরে লম্বা সময় ধরে আশরাফুল নেই! অধিনায়কের দায়িত্ব টা কাধে নিয়েছেন কিন্তু উইলো হাতে একদম অপরিচিত ছিলেন। ২০১১ বিশ্বকাপে ডাক পেয়েও আহামরি কিছুই করতে পারেন নি। এর মাঝে দল থেকে আবারো ছিটকে গিয়েছিলেন কিন্তু বিপিএলে ভালো করে আবারো ডাক পান। এরপরে ২০১৩ তে গলে ১৯০ রানের সেই মহাকাব্যিক ইনিংস। সাদা পোশাকে যা এখনো আশরাফুলের সর্বোচ্চ ইনিংস!

বিপত্তিটা বাধে সেই বছরই, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাথে এক কলংক মিশে যায়, ‘ম্যাচ পাতানোর কলংক’।

২০১৩ সালের বিপিএলে চিটাগাং কিংসের বিপক্ষের ম্যাচে শুরুর একাদশে মাঠে নামানো হয়নি নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাকে। ঢাকা গ্লাডিয়েটরস আশরাফুলকে অধিনায়ক বানিয়েই সেদিন মাঠে নামান, ম্যাচের এক পর্যায়ে যখন মাশরাফি বুঝে ফেলে যে আসলে ম্যাচ টা পাতানো হচ্ছে, রাগে পানির বোতলে লাথিও মেরেছিলেন!

আকসুর তদন্তে এরপরে বের হয়ে আসে আরো নোংরা ইতিহাস, যেখানে নাম শোনা যায় আরো কিছু ক্রিকেটারের। যদিও আশরাফুল নিজেই সব স্বীকার করে নেয়, পেয়ে বসেন বড় শাস্তি।

লম্বা সময় পর এবার ‘ম্যাচ পাতানোর’ শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়েছেন। ২০১৬ থেকে খেলছেন ঘরোয়া আসরে।

প্রথম আসরে ঢাকা মহানগরের হয়ে ৫ ম্যাচে ২০.৫০ গড়ে করেছিলেন মাত্র ১২৩ রান। সেঞ্চুরি কিংবা ফিফটি তো নাই, দেখা পাননি বড় কোন ইনিংসেরও। নির্বাচকেরা পরে রাখেননি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট বিসিএলেও।

তবে গত মৌসুমে জাতীয় লিগে পেয়েছেন সেঞ্চুরির দেখা। আর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে পাঁচ সেঞ্চুরি করে নাম লিখিয়েছেন রেকর্ডের পাতায়। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন, ‘প্রতারণার মতো কিছু করিনি। কখনোই দলকে হারিয়ে দিইনি।’

আমার প্রশ্ন টা এখানেই! বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচ পাতানো মানুষ টা কিভাবে বলে যে সে প্রতারণা করে নি? আমাদের ক্রিকেটে এত বাজে কলংক টা এনেও সে এত সহজে বলে দিলো দেশের সাথে প্রতারণা করে নি? অথচ নিজেই বলছিলো জাতীয় দলের হয়েও তার ফিক্সিংয়ের কিছু ঘটনা আছে।

আশরাফুলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় একই সাক্ষাৎকারে তাঁর বলা ‘আমি তো কখনো টুক টুক ব্যাটিং করিনি’ কথা টা দিয়েও। টি-টোয়েন্টি যার গড় ২০ এরও কম, ওয়ানডেতে ২২ এর আশেপাশে সে টুকটুক না খেলে যদি সবসময় ঝড়ো ইনিংসই খেলেছে ত সেই রান গুলো কই? এক যুগের ক্যারিয়ারে যার ওয়ানডে সেঞ্চুরি মাত্র তিনটা

আবার আপনি আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন তিনে খেলতে চান? আচ্ছা তিনে এ কে খেলে জানেন? বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। এরপরের জায়গাটা আমাদের নির্ভরযোগ্য মুশফিকুর রহিমের। এই দলে জায়গা পাওয়া এত সহজ?

আগে ফিটনেস ঠিক করুন, সামনে বিপিএল আছে সেখানে রান করুন, ভালো খেললে অবশ্যই দলে ডাক পাবেন। কিন্তু দয়া করে তার আগেই এভাবে বলবেন না। শুধু দেশের সাথেই আপনি প্রতারনা করেন নি, করেছেন আমাদের মতো কোটি ভক্তের সাথে!

আমাদের মতো যাদের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রথম প্রেম মোহাম্মদ আশরাফুল ছিলো তাদের সাথে। আমরা আপনাকে চিনতাম ‘আশার ফুল’ হিসেবে। আমরা আপনাকে চিনতাম কার্ডিফ জয়ের নায়ক হিসেবে, নটিংহ্যামে ব্রিটিশদের বিপক্ষে এক জলন্ত অঙ্গার হিসেবে। গায়ানার প্রোটিয়া বধের অগ্রসৈনিক হিসেবে, জোহানসবার্গের বিজেতা হিসেবে।

আমরা আপনাকে চিনতাম আফতাবের সাথে দুর্দান্ত সব জুটির নায়ক হিসেবে, আমরা জানতাম আশরাফুল মানেই দৃষ্টিনন্দন স্কুপের মার, অফ সাইডে খোঁচা দিয়েই বিদ্যুৎগতিতে দৌড়, বোলারদের পিটিয়ে বল সীমানা ছাড়া করা ছোট্ট জাদুকর হিসেবে।

এই প্রজন্মের ছেলেরা কেন খেলা দেখা শুরু করেই জানবে আপনি আমাদের ক্রিকেটের প্রথম ফিক্সার? ওদের তো জানার কথা ছিলো আপনি আমাদের প্রথম জয়ের নায়ক। আপনি আমাদের ভালোবাসার আশার ফুল। আপনিই তো ওদের জানিয়েছেন আপনি আমাদের ক্রিকেটের কলংক!

আপনি কি জানেন, আমি খুব কেঁদেছিলাম, মানতে চাইনি। আমি আপনাকে খুব ভালোবাসতাম। আমি তো আপনাকে সারাজীবন কার্ডিফ জয়ের নায়ক হিসেবেই চিনতে চেয়েছিলাম, কেন জড়িয়ে ছিলেন সেই অন্ধকার জগতে? প্রিয় মানুষ কষ্ট দিলে সেই আঘাতটা খুব তীক্ষ্ণ হয়, ব্যাথাটাও যে কাউকে বলা যায় না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।