পঞ্চাশের মন্বন্তর ও সত্যজিতের ‘অশনি সংকেত’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিষময় ফল ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ (বাংলা-১৩৫০) পঞ্চাশের মন্বন্তর নামেও পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস গ্রাম-বাংলায় কীভাবে বিস্তার লাভ করেছে, তার নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচনা করেন ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাসটি (১৯৫৯)।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে শোষক ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত খাদ্য সংগ্রহ করলে গ্রামগুলোতে তীব্র খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে পঞ্চাশের এই দুর্ভিক্ষে প্রায় পঞ্চাশ লাখ মানুষ মারা যায়। এই দুর্ভিক্ষে সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন, মূল্যবোধ, সংস্কার, নৈতিকতায় কেমন প্রভাব পড়ে তা নিয়েই উপন্যাসটির পটভূমি।

এই উপন্যাসটিকে সত্যজিত রায় একই নামে চলচ্চিত্রে রূপায়িত করেন ১৯৭৩ সালে। ‘অনঙ্গ বৌ’ চরিত্রে অভিনয় করেন বাংলদেশের অভিনেত্রী ববিতা এবং গঙ্গাচরণ চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণ এবং অনঙ্গ বৌয়ের দাম্পত্যজীবনের চার বছর চলছে। এই চার বছরে তাঁদের জীবনে দুঃখ-কষ্টের কমতি ছিলনা, খেয়ে না খেয়ে বা আধপেটা থেকেও তাদের দিন কেটেছে। প্রথমে ছিল হরিহরপুর, তারপর বাসুদেব পুর, তারপর ভাটচালা-যেখানে ছিল প্রচণ্ড জলকষ্ট। এরপর তারা বসতি গাড়লো নতুন গাঁয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে।

‘অশনি সংকেত’ ছবির সেটে সত্যজিৎ রায়ের সাথে

যেহেতু নতুনগাঁও ছিল ব্রাহ্মণহীন, সুতরাং গ্রামের সহজসরল মানুষগুলো নিজেদের সৌভাগ্যস্বরূপ ব্রাহ্মণ-দম্পতিকে মাথায় করে রাখে। এই সুযোগটাই গঙ্গাচরণ গ্রহণ করেন।

পরক্ষণেই আমরা দেখি, ব্রাক্ষণহীন এই গাঁয়ে হঠাৎ একঘর ব্রাহ্মণের আবির্ভাবে গ্রামবাসীর আপ্যায়ন-সমাদর এবং দক্ষিণা প্রদানের মুক্তহস্তে যেন পরিবারটি জীবনের সর্বোচ্চ সুখের মুহূর্ত খুজেঁ পায়। কেউ খেঁজুরের রস, কেউ দুধ, কেউ পেঁপে, কেউ বা বড় মাছটি ব্রাহ্মণের সেবায় দান করে। গ্রামের প্রধাণ পুরোহিত হয়ে টোল খুলে গঙ্গাচরণ শিশুদের পাঠ দান শুরু করেন। অপরদিকে অনঙ্গ বৌ তার সুমিষ্ট ব্যবহার এবং স্নেহশীলা স্বভাবের কারণে অচিরেই গ্রাম্যবঁধূদের মধ্যমণি হয়ে ওঠে।

তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা অনুযায়ী ছুৎমার্গের বিষয়টি প্রবলভাবে দেখানো হয়েছে। ভাটচালার মতি যখন নতুন গাঁয়ে অনঙ্গ বৌকে দেখতে এসে প্রণাম করে, তখন অনঙ্গ বৌ মতির ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলে। না হলে আবার ‘নাইতে’ হবে যে!

দীনবন্ধু ভট্টাচার্যের আগমনে অনঙ্গ বৌয়ের মাঝে যেন মা অন্নপূর্ণার উপস্থিতি প্রকট হয়ে ওঠে। দুমুঠো অন্নের হাহাকার পাশের গ্রামকে প্রায় গিলে ফেলেছে, চালের দাম বাড়ছে যেন তীব্র শৈত্যপ্রবাহের গতিতে! ভট্টাচার্যের আবদার আজ দুপুরে সে এ বাড়িতে দুটো ভাত খাবে। তীব্র খাদ্য সংকটের আগ মুহূর্তে আমরা অনঙ্গ বৌয়ের দরদী মনের পরিচয় পাই স্বামীর সাথে তার কথোপকথনে।

সৌমিত্র’র সাথে ববিতা, ‘অশনি সংকেত’-এর দৃশ্যে।

– কে বলো তো ?

– নাম বলেনি,তোমার নাম ধরে ডাকছিল।

– ও বুঝেছি, সেই বুড়ো ভট্টচার্য! কখন এলো?

– সেই কখন এলো ভাত খেলো তো!

– ভাত ছিল ?

– বাহ্ , থাকবে না কেন ?

– তোমার অন্ন ধ্বংস করেছে বুঝি ?

– আহ্, কী যে বলো! অতিথি না!

নিজে উপবাসী হয়ে অনঙ্গ বৌ অতিথি সৎকার করে। গঙ্গাচরণ কোনভাবেই সহধর্মিণীর এই দয়ালু মনের লাগাম টানতে পারেননা।

কাপালিকদের এই নতুন গাঁয়ের মানুষগুলো অবস্থাপন্ন না হলেও চাষ-বাস করে বেশ চালিয়ে নিত তাদের জীবন। হঠাৎ যখন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো, একের পর এক গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে এ গ্রামেও চলে এলো অভাবের থাবা! দোকানপাট থেকে নিমেষেই চাল গেল উধাও হয়ে। যে চালের মণ ছিল চার টাকা, সেটা গিয়ে ঠেকলো ছাপান্নর কোটায়।

এত টাকা দিয়ে চাল কিনে খাবার সাধ্য গ্রামবাসীর নেই। শুরু হয়ে গেলো উপবাস, দুর্ভিক্ষের সাথে সংগ্রাম। ক্ষুধার তাড়নায় মানুষের নৈতিক স্খলনের চিত্রও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নিদারুণভাবে! চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যপটটিও ছিল চমকপ্রদ যা আপনাকে কয়েক সেকেন্ড ভাবনায় ডুবিয়ে রাখবে।

 

নাহ, এর বেশি কিছুই আর না বলি যারা দেখেননি তাদের জন্য ! তবে এটুকু বলবো – আমি ভুলতে পারিনা চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্য যেখানে অনঙ্গ বৌয়ের একবুক জলে দাঁড়িয়ে নিবিড় সখ্যতার খেলা চলে জলের সাথে!

আমি বার বার দেখি সেই দৃশ্যটি যখন অনঙ্গ বৌ স্বামীর কাছে আবদার করে বলে – ‘দোহাই তোমার তুমি ওকে ডাকো! নইলে আমি মাথাখুঁড়ে মরবো হ্যাঁ!’

কিভাবে সম্ভব বইয়ের পাতার চরিত্রটিকে এমন সাবলীলরূপে নিজের মধ্যে ধারণ করা! ‘অনঙ্গ বৌ’ উপন্যাসের পাতা হতে উঠে আসা আমার চোখে দেখা অন্যতম নিখুঁত চরিত্র।

আজ সাড়ে তিন যুগ পরে এসে অনুভব করি, তখনকার যুগে পরিচালক সত্যজিত রায় সেলুলয়েডের পাতায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রে যে অনবদ্য ভাষা দিয়েছিলেন সে ভাষা বর্তমান যুগের ৯০ ভাগ চলচ্চিত্রেই অনুপস্থিত।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।