ফজলুর রহমান বাবু: অনবদ্য ও অবমূল্যায়িত

২০১৭ সাল। তিন মিনিট ৫৭ সেকেন্ডের একটা বিজ্ঞাপনে একজন ‘বাবা’র ভূমিকায় চোখের পানি ফেলেছিলেন অনেকেই। ‘অলিম্পিক এনার্জি প্লাস’-এর সেই বিজ্ঞাপনটিতে যে মানুষটার সুবাদে ঈদে বাবাদের ত্যাগগুলোকে চোখ আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছিল, তিনি হলেন ফজলুর রহমান বাবু। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান আর সম্ভবত সবচেয়ে আন্ডাররেটেড অভিনয়শিল্পী।

নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা বিজ্ঞাপন। আধুনিক বিনোদনভিত্তিক গণযোগাযোগের তিনটি শক্তিশালী মাধ্যম। তিনটি মাধ্যমের অবয়ব, ধরণ ও ভাষা – সবই আলাদা। তিনটি ক্ষেত্রতেই নিজেরে স্বাতন্ত্র জায়গা গড়ে তোলাটা প্রায় অসম্ভব। তবে, বাংলাদেশেও এমন গুটি কয়েক মানুষ আছেন যারা সবগুলো মাধ্যমেই মানিয়ে যান।

তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে সম্ভবত ফজলুর রহমান বাবু। অভিনয় করতে যে সুদর্শন চেহারার দরকার হয় নাহ তিনি সেটা প্রমাণ করে দিয়েছেন তিনি। ফরিদপুরে ১৯৬০ সালের ২২ আগস্ট জন্ম তাঁর। মঞ্চ থেকে আসা এই অভিনেতার জীবন বেশ বর্ণাঢ্য। সেই ১৯৭৮ সালে বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠী থেকে শুরু তাঁর। তারপর আরণ্যক নাট্যদলে আসেন ১৯৮৩ সালে।

বহু দূর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার শুরু সেটাই। অনেক কাঠখড় পোড়ানের পর ১৯৯১ সালে টেলিভিশন নাটকে সুযোগ পান। প্রথম নাটক ছিল ‘মৃত্যুক্ষুধা’। তারপর হতে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে বারংবার বাংলার দর্শকদের চোখে অশ্রু ঝরিয়েছেন, এনেছেন ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি।

একজন প্রতিথযশা অভিনয় শিল্পী হলেও তাঁকে ঘিরে আলোচনা হয় খুব সামান্যই। তিনি মূলত নাট্যাভিনেতা বলা যায়। আদু ভাই, বাবা, কমলা সুন্দরী, কমলাবতী, ব্যাচেলর বিরম্বনা, গুলবাহার সহ অসংখ্য কাজ করে তিনি সুনাম কুড়িয়েছেন। নানা নিরীক্ষাধর্মী চরিত্রেও অভিনয়ের মুন্সিয়ানায় তৃপ্ত করেছেন দর্শকহৃদয়কে।

তবে, তাঁর শক্তির জায়গা হল বিকল্প ধারার ছবি। তিনি অভিনয় করেছেন দারুচিনি দ্বীপ, মনপুরা, বিহঙ্গ, স্বপ্ন ডানায়, বৃত্তের বাইরে, শঙ্খনাদ, মেড ইন বাংলাদেশ, অজ্ঞাতনামা, ইত্যাদি চলচ্চিত্রে। অভিনীত প্রায় প্রতিটি গল্প নির্ভর চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয় প্রতিভার জানান দিয়েছেন। তিনবার তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও দু’বার মেরিল-প্রথম আলো পুুুরস্কার জিতেছেন।

কখনো ‘স্বপ্নজাল’, কিংবা ‘দহন’ বা ‘গহীন বালুচর’-এর নেতিবাচক চরিত্র করেছেন। আবার ‘পোড়ামন টু’ বা ‘অজ্ঞাতনামা’তে করেছেন বাবার চরিত্র।

‘অজ্ঞাতনামা’-কে এখানে একটু আলাদা জায়গায় রাখতেই হবে। এখানে আছিরের বাবা চরিত্রটি তার ক্যারিয়ারের মুকুটে নতুন পালক যোগ করে। ছবিটিতে ছেলের মৃত্যুর খবরে তার ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়া, নামহীন লাশের জন্য আর্তনাদ দর্শকদের কাঁদিয়েছে।

তিনি কেবল অভিনেতাই নন, একজন গায়কও। ‘মনপুরা’ এবং ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ চলচ্চিত্রে তার কন্ঠে গানগুলোও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গানের দু’টো অ্যালবামও বের হয়েছে। প্রথম একক অ্যালবাম ইন্দুবালা (২০০৯)। এর বাদে তিনি মিশ্র অ্যালবাম ‘মনচোর’-এ (২০০৮) চারটি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।

তিনি পানির মত একজন অভিনেতা। পানি যেমন যখন যে পাত্রে রাখা হয় সে পাত্রের আকার ধারণ করে, বাবুও ঠিক তেমন। তিনি যখন অভিনয় করে তখন মনেই হয়না যে অভিনয় করছেন, মনে হয় যেন একদম বাস্তব। এক কথায় তিনি একজন জাত অভিনেতা। স্বমহীমায় তিনি বাংলাদেশের অভিনয় জগতে কিংবদন্তির আসনে বসে আছেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।