নামটা ‘আর্টসেল’ বলেই হয়তো…

বিগত চৌদ্দ বছর ধরে বের হচ্ছে না ব্যান্ডটির নতুন কোনো অ্যালবাম। সম্বল বলতে দুটো একক অ্যালবাম ও মিশ্র অ্যালবামগুলোর কয়েকটা গান। তারপরেও শ্রোতাদের নিকট কখনও অস্তিত্ব সংকটে পড়েনি ব্যান্ডটি। তাঁদের ভক্তরা সেই দুটো অ্যালবাম ও মিশ্র অ্যালবামের গানগুলোই দীর্ঘ সময় যাবৎ আঁকড়ে ধরে রয়েছেন। বিষয়টা যারপরনাই বিস্ময়কর!

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে অদ্যাবধি ব্যান্ডটির একুশ বছরের লম্বা যাত্রাটা মোটেই মসৃণ ছিল না। প্রথম অ্যালবামের কাজ চলাকালীন সামনে আসে একটি বিরাট ধাক্কা। সেরিব্রাল ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমান ব্যান্ডের গীতিকার তরিকুল ইসলাম রূপক। এটি ব্যান্ডের অন্যান্য সদস্যদের জন্য এত বড়ো একটা আঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয় যে তাঁরা সামনে এগুনোর কথাই আর ভাবতে পারছিল না। বাট দ্য শো মাস্ট গো অন! তাই শোককে শক্তিতে পরিণত করে চলতে থাকে তাঁদের কার্যক্রম। ২০০২ সালে প্রথম অ্যালবাম ‘অন্যসময়’ বের করার চার বছরের মাথায় বাজারে আসে তাঁদের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘অনিকেত প্রান্তর’।

দ্বিতীয় অ্যালবাম বের করার পর বেশ ভালোই সময় কাটাচ্ছিলেন তাঁরা। অ্যালবামও শ্রোতাদের মাঝে প্রচুর সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। তার বেশ কয়েকবছর বাদে হঠাৎ ব্যান্ড সদস্যদের মধ্যে বনিবনা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার জায়গাটায় তৈরি হয় বিশাল ঘাটতি৷ পারস্পরিক দ্বন্দ্বের দরুন ব্যান্ড ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান ড্রামার ও বেজিস্ট৷ এতে করে ভক্তকুলের মনে উঁকি দেয় আশঙ্কার মেঘ। ‘লীন’ হতে যাচ্ছে না তো তাঁদের প্রিয় ব্যান্ডটা!

না। সেরকম কিছু ঘটেনি। কিন্তু ব্যান্ডের লাইন আপে এসেছিল পরিবর্তন। সেটা তো হবারই ছিল। অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ায় ড্রামার ও বেজিস্টের শূন্যস্থানটা যে পূরণ করতেই হতো! ফলে ব্যান্ডে নেওয়া হয় দুজন অতিথি সদস্য।

তার কয়েকবছর পরের ঘটনা৷ অকস্মাৎ ব্যান্ডের লিড গিটারিস্টকে মঞ্চে দেখা যাচ্ছে না। সেটা দু-একটা শোতে হলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু এক বছর ধরে কোনো অনুষ্ঠান বা কনসার্টে বাজাচ্ছেন না তিনি। এটা ধীরে ধীরে ভক্তকুলের মনে রহস্যের জাল বুনতে থাকে। তার পর একদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। ব্যান্ডের ভোকাল সাফ জানিয়ে দেন, তাঁরা ওই গিটারিস্টের সাথে আর কাজ করতে চাচ্ছেন না। সেজন্য বিভিন্ন কারণও তুলে ধরা হয় সেই ফেসবুক স্ট্যাটাসে। সেদিকে আর যাচ্ছি না।

সবমিলিয়ে ধরেই নেওয়া হয়েছিল এই বুঝি হারাতে বসছে বাংলাদেশের আরও একটি স্বনামধন্য ব্যান্ডদল। সৌভাগ্যক্রমে তা হয়নি। বিভিন্ন অতিথি শিল্পীদের নিয়ে শো করে ব্যান্ডটাকে ধরে রাখার গুরুদায়িত্ব পালন করেন ব্যান্ডের ভোকাল। এ সময় নতুন কোনো অ্যালবাম বের না করলেও একের পর এক শো নামাতে থাকেন তাঁরা। অতিথি যন্ত্রীদের নিয়েই অব্যাহত থাকে তাঁদের এ নতুন ‘পথচলা’।

গেল চৌদ্দ বছর ধরে কোনো অ্যালবাম বের না করা ওই ব্যান্ডের বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে গত বছরের ডিসেম্বরে আয়োজিত কনসার্টে উপস্থিত হয় আট হাজারেরও বেশি মানুষ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যান্ডের একক কনসার্টে টাকা দিয়ে টিকেট কেটে আট হাজারের বেশি মানুষের উপস্থিতি এক কথায় অবিশ্বাস্য৷ কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে। সেদিন ব্যান্ডটি একটি নতুন ‘বেঞ্চমার্ক’ তৈরি করেছিল। তাঁদের ভক্তরা সৃষ্টি করেছিলেন দৃষ্টান্ত। হয়তো ব্যান্ডটি আর্টসেল বলেই এত চড়াই-উৎরাই পার করেও এ পর্যন্ত আসাটা সম্ভব হয়েছে।

আশার বাণী হচ্ছে, ‘ধূসর সময়’টা কাটিয়ে বর্তমানে নিজেদের পুরোপুরি গুছিয়ে নিয়েছে আর্টসেল। লিড গিটারে এরশাদ জামানের জায়গায় স্থায়ী হয়েছেন মেটাল মেইজের প্রতিষ্ঠাতা ও অভিজ্ঞ গিটারিস্ট কাজী ফায়সাল আহমেদ। ড্রামার কাজী সাজ্জাদুল আশেকিন সাজু ও বেজিস্ট সাইফ আল নাজি সেজান অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি করায় অতিথি যন্ত্রী হিসেবে মেকানিক্সের শেখ রিয়াজ ও তিতাস বাহা নিয়মিত ড্রাম ও বেজ বাজাচ্ছেন। এদিকে সাজু ও সেজান দেশের বাইরে থাকলেও ব্যান্ডের কার্যক্রম থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন নন। বহুল কাঙ্ক্ষিত তৃতীয় অ্যালবামের কাজে সেখান থেকেই নিজেদের ইনপুট দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

এমনকি বছরের বড়ো বড়ো ইভেন্টে অংশ নিতে প্রায়ই ছুটি নিয়ে বাংলাদেশে ছুটে আসেন এ দুজন। অন্যদিকে বরাবরের মতোই গান লেখার কাজটা অত্যন্ত কুশলী হাতে সম্পাদন করছেন সেই প্রথম অ্যালবাম থেকেই আর্টসেলের সাথে কাজ করে আসা গীতিকার রুম্মান আহমেদ। আর এতদিন ধরে নানা ঝড়ঝাপ্টা সামলে ব্যান্ডটাকে টিকিয়ে রাখার পেছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি সেই লিংকন ডি কস্তা তো আছেনই ভোকাল ও রিফ গিটারে।

এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে, হঠাৎ ঘটা করে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে এতসব কেন লিখা? লিখার বিশেষ কারণ আছে বইকি। কারণটা হলো আজ সে ব্যান্ডটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আর্টসেলের জন্মদিন। হয়তো কথাগুলো আর্টসেল অবধি পৌঁছোবে না। তারপরেও বলতে চাই, এভাবেই অনুগত ভক্তদের সমর্থন, ভালোবাসা ও পাগলামিকে সঙ্গে করে ‘গন্তব্যহীন’ যাত্রাটা অব্যাহত থাকুক অনন্তকাল। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অফুরান ভালবাসা আর্টসেলের প্রতি।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।