অর্ণব, এবার তো ফেরার সময় হল!

তখন বয়স ৬-৭ হবে। ঐ বয়সেই শিক্ষার উদ্যশ্যে দেশ পাড়ি দিয়ে কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে ভর্তি হন। একদিন মা আর বড় বোনের সাথে মায়ের বিদ্যাপীঠ শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গেলেন। তার মা একদিন অর্ণব এবং তার দিদিকে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে নিয়ে যান।

সেখানকার পড়াশোনার পরিবেশ দেখে অর্ণব এর প্রেমে পড়ে যান। বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের সবুজ-শ্যামল পরিবেশ এবং সেই সবুজ পরিবেশের সবুজ ঘাস তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। তার দিদি এবং তিনি তার মায়ের কাছে বায়না ধরেন এখানে ভর্তি হওয়ার জন্য। অর্ণব এবং তার দিদির জোরাজুরিতে অর্ণবের মা তাদেরকে শান্তিনিকেতনে ভর্তি করিয়ে দেন।

তখন ক্লাস ফোরে পড়েন শায়ান চৌধুরী অর্ণব। একদিন দুষ্টুমি করে হেড মাস্টারের জুতো চুরি করলেন। ক্লাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে কানমলা খাচ্ছিলেন। এমনি একদিন কানমলা খাওয়ার সময় শাহানা বাজপেয়ী নামের একটা পুচকি মেয়ে কে দেখলেন। ব্যস হয়ে গেলো। নিজের মনটা বিনে শর্তে সবার অগোচরে শাহানাকে দিয়ে বসলেন। এতোটাই অগোচরে দিলেন যে শাহানা নিজেই জানলো না। সাহানার এক বন্ধুকে অর্ণব বলেই বসলেন, ‘বড় হলে আমি সাহানাকে বিয়ে করব।’

বন্ধুটি ভাল মনেই কথাটা জানিয়ে দেয় সাহানাকে। কিন্তু ওই পুঁচকি মেয়েটা কি তখন আর প্রেমের মর্ম বোঝে ! ভয় পেয়ে স্যারকে বলে দিল সাহানা। আর স্যার মহাশয় বেজায় বেরসিক, দিলেন অর্ণবকে অনেক বকুনি। তাতে কী! প্রেম রোগ তো আর বকুনিতে সারে না, ছোটবেলার বান্ধবী ক্লাস আট কী ন’য়ে উঠতে উঠতে হয়ে গেল হৃদয়ের মানুষ।

পাগলামির স্বভাবটা সেই ছোটবেলা থেকেই আছে। আর এই পাগলামোর জন্যই হয়তো কৈশোর থেকে প্রথম যৌবনে তাঁর গান দিয়েই নিজেরদের অনুভূতি প্রকাশ হতো আমাদের। অর্নবের গান মানেই পাগলামো। মোবাইল কিংবা আপনার ল্যাপটপের প্লে লিস্টে অর্নবের গান থাকবেই। আড্ডা দিবেন, আর কারো গান হোক না হোক অর্নবের গান গাওয়া হবেই। নিজের মনের অজান্তেই অর্নবের গান গাওয়া হয়। কী এক অদ্ভুত মায়া!

পাগলামি শুধু জীবনেই করেননি, গানের ক্ষেত্রেও করেছেন। হালের সঙ্গীত অনেকটা প্লাস্টিকের মত হয়ে গেছে। ইচ্ছা করলেই কম্পিউটার ইফেক্ট দিয়ে নানান ধরণের সঙ্গীত যন্ত্রের টিউন ব্যবহার করে ‘অসাধারণ শিল্পী’ তৈরি করে ফেলা যায়। তবে সেই শিল্পী যখন মঞ্চে ওঠেন গান করতে তখন ধরা পড়ে তার গলার খুঁত। এরকম করবেন না বলেই তিনি ‘ডুব’ অ্যালবামে তিনি শুধু অ্যাকুয়েস্টিক গিটার বাজিয়েও গান করেছেন। অর্ণবের কথায়, ‘আমি কতটা সুরে গাইতে পারি সেটা বোঝার জন্যেই আসলে এটা করা।’

রবীন্দ্র সঙ্গীত নিয়েও গবেষণা করতেও ছাড়েননি অর্ণব। সমালোচকদের গরম চোখ উপেক্ষা করেই চার/পাঁচ মিনিটের একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যাপ্তিকাল দাঁড় করিয়েছেন এগারো মিনিটে। অর্ণবের ভাষায়, ‘আমার বিশ্বাস রবীন্দ্র সঙ্গীত বোদ্ধারা ভালোভাবেই দেখবেন বিষয়টা। শান্তিনিকেতনে যারা শুনেছেন তারা ভালো বলেছেন।’

অর্নবের গান শুধুমাত্র কানের শ্রুতিমধুরতা ছড়ায় নি, বরং জীবন ঘনিষ্ঠ আত্মা কে ছুঁয়ে গেছে। তার গানের কথা গুলো এতোই জীবন ঘনিষ্ঠ হতো যে যে কেউ খুব সহজেই নিজেকে খুঁজে পেতো। একটা গানের কথা বলি – ‘হোক কলরব’ অর্ণবের দ্বিতীয় একক অ্যালবামের নাম ছিল। কিন্তু অ্যালবামের ‘হোক কলরব‘ শিরোনামের গানটি পরবর্তীতে একটি বিশাল আন্দোলনের মূল স্লোগান হয়ে ওঠে।

২০১৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানীর সঠিক তদন্ত না করায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যে আন্দোলন শুরু করে সেই আন্দোলনই ‘হোক কলরব‘ আন্দোলন নামে পরিচিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘হোক কলরব‘ হ্যাশট্যাগটি খুব দ্রুতই ট্রেন্ডিং হয়ে ওঠে। বিক্ষোভ সামলাতে পুলিশ নির্মমভাবে লাঠিচার্জ করে ৪০ জনকে জখম ও ৩৭ জনকে গ্রেফতার করে।

ফলে কলকাতার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আন্দোলন সংক্রমিত হয়ে যায়। আন্দোলনে ধীরে ধীরে যোগ দেয় দিল্লী, মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরুসহ আরো বেশ কিছু জায়গার শিক্ষার্থীরা। ভারতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ছাত্রদের বাইরেও সকল বয়সের মানুষ যোগ দেয় আন্দোলনে।

সারা কলকাতা উত্তাল হয়ে ওঠে। কোনো কোনো সংবাদ মাধ্যমের মতে ২০ সেপ্টেম্বর এ আন্দোলনের মহা মিছিলে বৃষ্টির মাঝেই ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ লোক যোগ দিয়েছিল। গোটা আন্দোলনের সময় অর্ণবের হোক কলরব গানটি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে এবং আন্দোলনের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘হোক কলরব’ আন্দোলন।

এতো কিছুর পরেও তার মধ্যে আরেকটা পাগলামি রয়েছে। আর তা হলো তিনি মাঝে মাঝেই হারিয়ে যান। অর্ণবের হারিয়ে যেতে খুব ভালো লাগে। তাইতো সবসময় তক্কে তক্কে থাকেন কবে হারিয়ে যেতে পারবেন। প্রতিবার হারানো থেকে ফিরে আসার সময় নিজেকে নতুন ভাবে খুঁজে পান অর্ণব। তার কথায়, ‘আমি নিজেকে কোন টাইপে বাঁধতে চাইনা, যদি কোনদিন দেখেন অর্ণব কোন একটি নির্দিষ্ট ফর্মে আটকে পড়েছে সেদিন ভাববেন আমার জারিজুরি শেষ। তবে আমি চাইনা ছকের মাঝে পড়তে। নিজেকে ভেঙ্গে আবার গড়ে ফিরে আসি প্রতিবার।’

কিন্তু আমরা তো আপনার অপেক্ষায় আছি। অপেক্ষায় আছি প্রিয় গায়কের। আপনার গানের সাথে আমাদের কত শত বেঁচে থাকার স্মৃতি। জন্মদিনের শুভেচ্ছার প্রতিউত্তর দিতেও তো ফিরে আসা যা আমাদের মাঝে। যে গানগুলো আমাদের বেড়ে উঠার সারথি ছিলো সেই গানের মানুষ এভাবে হারিয়ে থাকবে, সেটা কিভাবে মেনে নেই বলুন?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।