অর্জুন রেড্ডি, কবির সিং আর শিল্পের দায়

কবির সিং মুক্তির পর আলোচনার ঝড় উঠেছে। সবার রাগের বিষয়বস্তু হলো, এই মুভিতে মেয়েদের বাজেভাবে ট্রিট করা হয়েছে। যে ব্যাপারগুলো নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, তা মূল মুভি অর্জুন রেড্ডিতেও ছিলো। তামিল, বিশেষ করে তেলেগু ইন্ডাস্ট্রিতে এসব খুব কমন বিষয়।

‘প্রতিটি সিনেমাকে নীতি শিক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত হতে হবে’ – এমন কোন বাধ্যবাধকতা নাই। পরিচালক তাঁর মতো করে গল্প বলবে, আমরা ম্যাচিউরড দর্শকরা (মুভিটি অ্যাডাল্ট রেটিং পেয়েছে) সেখান থেকে ছাঁকন প্রক্রিয়ায় বাজে মেসেজগুলো ফিল্টার করে ফেলে দেবো, এমনটাই হবার কথা। কিন্তু কোন সিনেমার আপত্তিকর বিষয়গুলো ধরতে না পারলে; উল্টো ডিফেন্ড করলে বুঝতে হবে, আমাদের মোরাল কম্পাস ঠিকভাবে কাজ করছে না। সেটা নিয়ে লিখতে বসা।

অর্জুন রেড্ডি তো সবাই খুব পছন্দ করেছে। সিনেমায় অর্জুন প্রীতিকে ছয় ঘণ্টার সময় দিয়েছিলো। ধরে নেই, তখন প্রীতিকে তার বাবা ঘরে বন্দী করে রাখে। দুই দিন পরে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে অর্জুনের বাসায় গিয়ে দেখে, অর্জুনের বিয়ে হয়ে গেছে। তখন যদি প্রীতি বাসা থেকে বের হয়ে যায়, কোকেইন-হেরোইন খেয়ে নারীদের ডেলিভারি/অপারেশন করে, ‌র‌্যান্ডম ছেলেদের সাথে ঘুমায়, নিজের ফ্রেন্ডদের সাথে মিসবিহেভ করে, বোনের বিয়ে কিংবা ভাইয়ের ইন্টার পরীক্ষা পণ্ড করে দেয়, ফ্ল্যাটে মেল এসকর্ট এনে তাদের কোলে শুয়ে গল্প করলে-সেই মুভিটা কি আমরা সমানভাবে পছন্দ করতাম? আমার মনে হয় না, ‘প্রীতি শেটি’ মুভিটা আমাদের খুব একটা ভালো লাগতো।

মুভিতে কি ডার্ক ক্যারেক্টার থাকে না? অবশ্যই থাকে। গত ত্রিশ বছরের সবচে আইকনিক দুই ভিলেন হলো হ্যানিবাল লেক্টার আর জোকার। কিন্তু খেয়াল করবেন, কালোর বিপরীতে সাদা হিসেবে এই মুভিগুলোতে ক্লারিস স্টার্লিং আর ব্যাটম্যান আছে। এর বাইরে অনেক মুভির গল্প নেগেটিভ ক্যারেক্টারকে কেন্দ্র করে। প্রত্যেক মুভি ধরে ধরে না বলে, ক্যারেক্টার ডিজাইন নিয়ে বলি।

ভালো ক্যারেক্টার পরিস্থিতির চাপে ভিলেন হতে পারে। সে প্রথম থেকে ভিলেন থাকলে, তার পরিণতি খারাপ হতে পারে। আবার পরিণতি খারাপ না হলে, সে নিজেকে রিডিম করে ভালো হতে পারে (সব সময় যে এসবই হবে, তা না। আমি একটা জেনারেল স্ট্রাকচারের কথা বলছি)। থ্যানোসের সাথে আমরা একমত না হলেও, ওর মোটিভেশন আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু তার কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাইলে সেটা বেশ চিন্তার বিষয়। ভুলকে ভুল বলা এবং সর্বোপরি সেটা আইডেন্টিফাই করতে পারা দরকার রে ভাই!

সময়ের সাথে সাথে মানুষের সেন্সিবিলিটি পাল্টায়। ডি. ডভ্লিউ. গ্রিফিথের বার্থ অফ আ নেশন মুক্তি পেয়েছিলো ১৯১৫ সালে। এই সিনেমার ম্যাটেরিয়েল খুব ‘cringeworthy’। সহজ ভাষায় হোয়াইট সুপ্রিম্যাসিস্ট গ্রুপ কু ক্লাক্স ক্ল্যানের ম্যানিফেস্টো। সেই সিনেমা এখনো ফিল্ম স্কুলগুলোতে দেখানো হয়। আগের সমস্যাগুলো অনুধাবন করে, সেটা এড়িয়ে সামনে যাওয়াকে প্রোগ্রেস বলে।

জুড়ুয়া টু দেখে একটা লেখা লিখেছিলাম। কারণ, আমার মনে হয়েছে সামনে যাওয়ার পরিবর্তে আমাদের মানসিকতা আরো পেছাচ্ছে। ১৯৮২ সালের ‘আর্থ’ সিনেমায় স্বামী এসে ক্ষমা চাইলে শাবান আজমি বলেন, ‘আমি যদি আরেকজনের সাথে লিভ টুগেদার করে আবার তোমার কাছে ফিরে আসতাম, তুমি কি মেনে নিতে?’ আর ২০১৭-তে এসে আমারা দেখছি, একটা মেয়ে নয় মাস একা কষ্ট করেছে আর অর্জুন সেই সময়টা অগুনতি মেয়ের সাথে ঘুমালো। তারপর ক্ষমা চাওয়ার পর সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।

অরিত্র নামে এক ইন্ডিয়ান ইউটিউবার দেখলাম সাঞ্জু মুভির ৩৫০ মেয়ের ডায়ালগটার কথা বলছে। এটা থেকে বোঝা যায়, অনেকের কাছেই ‘কনসেন্ট’-এর ধারণা স্পষ্ট নয়। সাঞ্জু চরিত্রের ওম্যানাইজার সাইডটা সম্ভবত পুরো মুভির একটিমাত্র দৃশ্যেই স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে। যেখানে রাণবীর তার বন্ধুর প্রেমিকার সাথে ‘ঘুমায়’।

সঞ্জয় বন্ধু হিসেবে জঘন্য কাজ করেছে, কিন্তু আইনের চোখে এটা অপরাধ নয়। যা হয়েছে সেটা দুজনের সম্মতিতে হয়েছে। অপরদিকে অর্জুন চাকু হাতে মুভির শুরুতে যেটা করে, সেটার জন্য নির্ভয়া অ্যাক্টের আন্ডারে তার অন্তত তিন বছরের জেল হবে। সাঞ্জু মেয়েদের অবজেক্টিফাই করেছে কিংবা রানঝানায় সোনাম ধানুশকে অ্যাবিউজ করেছে, এই যুক্তিতে অর্জুন বা কবিরের রেপ অ্যাটেম্প্ট গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না।

বলিউড অভিনেতা আমজাদ খান একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সিনেমার কোন প্রভাব বাস্তব জীবনে নেই। কারণ কেউ নায়কের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে দশ-বারোজনকে পেটায় না।’ আমি সম্পূর্ণ একমত। সিনেমা দেখে কেউ সমাজের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় না কিংবা ভিলেনের মতো চোরাচালানের ব্যবসাও শুরু করে না। কিন্তু এখানে একটা বিষয় আছে।

এই কাজগুলো করা কিন্তু খুব একটা সহজ না। কিন্তু পাঁচজন বন্ধুকে পাশে রেখে, একটা মেয়েকে হ্যারাস করতে খুব একটা পরিশ্রম হয় না। একজন ভিজিল্যান্টে কিংবা সুপার অ্যাসাসিনকে আপনি ব্যক্তিগতভাবে চিনেন, এমন সম্ভাবনা কম। কিন্তু আপনার চেনা মানুষের মাঝে অবশ্যই এমন একজন আছে, যে বাস কিংবা বইমেলার ভীড়ে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়। দুঃখজনক হলেও, এটাই বাস্তবতা।

একটা সময় ভিলেনরা যে কাজগুলো করতো, এখনকার হিরোরা সেগুলো করে। ভিলেনরা তো নায়িকার দেহ, মন কিছুই পেতো না। কিন্তু এখনকার হিরোরা প্রথমে নায়িকাদের বিরক্তি, তারপর হাসি আর পরে ভালোবাসা পাচ্ছে। আমরা মনে করছি, মেয়েরা হয়তো এটাই চায়। তাদের না-এর মাঝে হ্যাঁ লুকিয়ে আছে।

সিনেমার ন্যারেটিভকে বাস্তবের সাথে গুলিয়ে ফেলেছি। সিনেমায় দেখা যায়, কোন ঘটনা বা কারো কথা নায়কের চরিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, বাস্তবেও এখন আমরা এমন কিছু খুঁজি। কিন্তু সত্যিকার জীবনে এমন বক্তব্য তো গাছের ডালে ঝুলে থাকে না। এজন্য দেশে মোটিভেশনাল স্পিকারদের এত চাহিদা।

আপনি বলতেই পারেন, সিনেমার নায়কদের সাধু-সন্ন্যাসী হিসেবে দেখানো শুরু করলে, বাস্তবের সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট বন্ধ হবে না। হক কথা। জ্যাক দ্য রিপার নিশ্চয়ই কোন বই বা সিনেমার কারণে সিরিয়াল কিলিং শুরু করেনি। আমার আপনার শত প্রতিবাদ সত্ত্বেও শিশুরা মলেস্টেড হচ্ছে, প্রতিদিন। অনেক সময় দুই বছরের বাচ্চারাও রেহাই পাচ্ছে না।

ঘেটুপুত্র কমলা সিনেমাটি দেখেছিলাম বলাকায়। সেখানে কয়েকটি দৃশ্যে (আমি বলতে চাচ্ছি না কোন দৃশ্য। বুঝে নিন) অনেক দর্শক হাততালি দিয়েছে। আমি নিজের কানকে সেদিন বিশ্বাস করতে পারিনি। এখন কোন পরিচালক যদি নিখুঁতভাবে, স্টেপ বাই স্টেপ এসব দৃশ্য যত্ন করে দেখায়; তখনো কি প্রশ্ন করবেন, ‘সিনেমায় না দেখালে কি বাস্তবে এসব বন্ধ হয়ে যাবে?’

মানুষ কি দেখতে পছন্দ করে তা নিয়ে স্প্যানিশ পরিচালক আলেহান্দ্রো আমেনাবার-এর ‘Tesis’ নামে একটা সিনেমা আছে। পরিচালক দেখিয়েছেন, এনি কাইন্ড অফ স্যাডিস্টিক অ্যাক্ট (হোক সেটা সেক্স কিংবা ভায়োলেন্স), মানুষকে আকর্ষণ করে। এখন বাস্তবে যেটা হচ্ছে, সেটা দিতে থাকার সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে চাইল্ড পর্ণোগ্রাফি আর স্নাফ ফিল্ম। ইউ হ্যাভ টু ড্র দ্য লাইন সামহোয়্যার।

পুরো পৃথিবী জুড়ে তো বটেই, বিশেষত আমরা দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষিত পুরুষরা ফেমিনিজমকে খুব ভীতির চোখে দেখি। যদিও নিজেদের উদারমনা প্রমাণ করার জন্য বলতে থাকি, ‘আমি অবশ্যই নারী অধিকারে বিশ্বাস করি, কিন্তু…’। জেনে রাখবেন, এই কিন্তুর পরের কথাগুলোই তার মনের আসল কথা। সম-অধিকার মেনে নিয়ে, আপনি কাউকে কোন বিরাট এহসান করে দিচ্ছেন না। জাস্ট বেসিক হিউম্যান রাইটকে অ্যাকনলেজ করছেন। আমি নিজে অবশ্য ওমেনচ্যাপ্টার ঘরানার বড় ভক্ত নই।

তাঁদের অনেক লেখার যুক্তির জায়গাটা আমার কাছে দুর্বল লাগে। তবে তাদের ভাবনার উৎসটা আমি ধরতে পারি। এত বছরের প্যাট্রিয়ার্কির বাই প্রোডাক্ট হিসেবে এমন র‌্যাডিকাল ফেমিনিজম জন্ম নেওয়াটা স্বাভাবিক। ভিন্নমতপোষণকারীদের গলা টিপে ধরলে, পতন হবেই (প্রত্যেক অপরেসিভ রেজিমের বেলায় কথাটা খাটে)।

তবে এটাও সত্যি যে, মেয়েরা নিজেরাই ফেমিনিজমের সব কনসেপ্টকে আপন করে নিতে পারে নাই। তাদের একটা থ্রেশহোল্ড লেভেল আছে। কয়েক স্টেপ পরে গিয়ে মনে করে, ‘নাহ, এটা বাড়াবাড়ি’। তাঁরা নেটফ্লিক্সের কুখ্যাত খুনী টেড বান্ডির প্রেমে পড়ে যাচ্ছে, জোকার-হার্লি কুইনের অ্যাবিউসিভ সম্পর্ককে বলছে ‘রিলেশনশিপ গোল’, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ফিফটি শেডস অফ গ্রে দেখছে। সুতরাং পরিবর্তন আসতে দেরী আছি, ব্রাদার। আসেন ইজি চেয়ারে রিল্যাক্স করতে করতে রেড্ডি আর সিং টাইপ মুভিকে ডিফেন্ড করতে থাকি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।