আর্জেন্টিনার স্বস্তির জয় বনাম বাস্তবতা

আর্জেন্টিনার স্বস্তির জয় শেষে দলের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলি! প্রথম ব্যাপার হচ্ছে মানসিকতা। আগের দুই ম্যাচে যেটা দেখা যায়নি, সেটা গতকাল প্রথম থেকেই দেখা গেছে। দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের চোখেমুখে ‘জিততে হবে’- এমন একটা মানসিকতা ছিল। এই মানসিকতাটাই জয় এনে দিয়েছে।

মানসিকতার বাইরে স্কিলে বা পারফরম্যান্সে কী খুব একটা হেরফের এসেছে?

মেসি তাঁর সবটা দিয়ে চেষ্টা করেছেন। মিডফিল্ড অসাধারণ ছিল। মেসির প্রথম গোলটা তো বানেগার অসাধারণ থ্রু এর ফসল! এমন থ্রু বাড়ানো, আবার সেখান থেকে রিসিভ করা এবং টান দিয়ে গোল দেয়া দুইটা করতেই খুব ভালো রকমের স্কিল লাগে! মেসি এবং বানেগা দুইজনই সেই গোলে সেই বিশ্বমানের স্কিল দেখিয়েছে। শুধু এই গোল না, প্রথমার্ধ জুড়ে আর্জেন্টিনা অনেকবার ডিবক্সে ঢুকেছে।

মিডফিল্ড থেকে তাঁদের বিল্ডআপ, পাসিং, দুই কর্নার থেকে এগিয়ে যাওয়া সবই ভালো ছিল। মেসি, ডি মারিয়া কয়েকবার ঢুকেছেন। তবে মোটামুটি সবাই-ই ফিনিশিংয়ে গিয়ে গোলমাল করেছেন। হিগুয়েইন যতবার বল পেয়েছে ততবারই বল হারিয়েছে। -_- মেসিও ডি বক্সে ঢুকে কিংবা বক্সের ঠিক বাইরে থেকে বল ক্লিয়ার করে ভিতরে ঢুকতে পারেননি। নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডাররা তাঁকে ঘিরে ছিল। হিগুয়েইনকে যে পাস দিবে, সে তো পজিশন মতো থাকেই না!

হিগুয়েনের বদলে পরের ম্যাচে আগুয়েরাকে প্রথম থেকেই নামানো যায় কিনা, কোচ সেটা চিন্তা করতে পারেন। রোহোকে মোটামুটি কালকে পুরো মাঠজুড়ে খেলতে দেখেছি। মূলত ডিফেন্ডার হিসেবে খেলার কথা। কিন্তু রবার্তো কার্লোসের মতো বারেবার নিচ থেকে উপরে উঠে এসেছেন। লং পাস বের করার চেষ্টা করেছেন। আর অমূল্য গোলটির তো কোন জবাব নেই! রোহো, মাশচেরানো, ডি মারিয়া, মেসি- এই চারজনের সমন্বয় ভালো ছিল। অন্যদেরও এর মধ্যে ঢুকতে হবে।

এবার দুর্বলতার জায়গা ডিফেন্ডিংয়ে আসি! মোটামুটি জঘন্য না বললেও ডিফেন্ডিং যে খুব বাজে ছিল, সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। প্রথমার্ধে মাসচেরানো একটা স্লো ব্যাকপাস দিলো ডিফেন্সে থাকা ৩ নাম্বার জার্সি পরিহিত টাগ্লিফিয়াসোকে, সেই ব্যাকপাস এমনই স্লো যে নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার দৌড়ে আগেই সেই বল নিয়ে নিলো। মাসচেরানো আবার দৌড়ে এসে পিছন থেকে ট্যাকল করায় রক্ষা! খুব ভালো মানের স্ট্রাইকার হলে এমন খালি জায়গায় বল পেলে গোল দিয়েও দিতে পারতো।

তারপর নাইজেরিয়ার পেনাল্টির ঠিক আগে যেই কর্নারটা হলো, সেটা কীজন্যে হলো মনে আছে? ৪৮তম মিনিটে মুসার লং থ্রো আর্জেন্টিনার তিন ডিফেন্ডার একসাথে হেড করে কর্নারে পাঠালো। ধারাভাষ্যকার পর্যন্ত বলছিলেন যে, তাঁদের নিজেদের মধ্যে কোন কমিউনিকেশন নেই! মাসচেরানোর হেড পেরেজের মাথায় লেগে কর্নার হলো। আরেকটু পিছনে থাকলে তো বলটা জালে ঢুকে আত্মঘাতী গোল হয়!

মাশচেরানো যেভাবে কর্নারের মধ্যে পেনাল্টি বানালো সেটাও খারাপ ডিফেন্ডিং। এবারে আসি বহুল আলোচিত অনিচ্ছাকৃত হ্যান্ডবলে আসি। ৭৫তম মিনিটে সেটাতে তো নাইজেরিয়া বলতে গেলে ম্যাচের প্রায় সহজতম গোলের সুযোগ মিস করেছে।

পেনাল্টির দাবিতে সেই গোল মিসটা চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু বল যখন হেড+হ্যান্ড হয়ে নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকারের কাছে যায়, তখন সে প্রায় ফাঁকা পোস্টে বল বাইরে উড়িয়ে মেরেছে। মোটামুটি মানের স্ট্রাইকার হলেও সেটা বাইরে মারার কথা না। সেই মিসটা আসলে হিগুয়েইনের শেষের মিসের চেয়েও সহজ ছিল!

আর্জেন্টিনার আরেকটা দুর্বলতা হচ্ছে কিক ইলেভেশনে! এতোগুলা কর্নার পেয়েছে, একটা কর্নার থেকেও গোলের সুযোগই তৈরি করতে পারেনি। অন্য দলগুলো কর্নার মারে গোলমুখে যেন সেখান থেকে হেড করা যায়। আর আর্জেন্টিনা কর্নার থেকে সামনের জনকে ছোট পাস দেয়! একবার না, বারবার! কেন? ছোট পাস দেয়ার জন্য তো কর্নার না। যদি গোল নাও হয়, ফাউল-টাউল হয়ে পেনাল্টি পাবার সম্ভাবনাও তো বাড়ে! যেগুলো কিক করার চেষ্টা করেছে সেগুলো বল ওঠেই নাই। সামনে থাকা নাইজেরিয়ান ডিফেন্ডার সহজে হেড মেরেছে!

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সুযোগসন্ধানী এই জয় স্বস্তির। কিন্তু নক-আউট থেকে আর্জেন্টিনার এমন খেললে হবে না। এখন সব শক্তিশালী দলের সামনে। ফ্রান্সের স্ট্রাইকারদের এমন বাজে ডিফেন্ডিং দিলে হবে না।

সর্বোচ্চ আশা করতে পারি, স্বপ্ন দেখতে পারি, প্রার্থনা করতে পারি আর্জেন্টিনার জন্য! মেসিসহ দলের অন্য সবার মধ্যে যেই ‘জিততেই হবে’ মানসিকতা ছিল, সেটা ধরে রাখতে হবে। গ্যালারিতে ম্যারাডোনার যে আবেগ, সেটা আর কোন দলের সাবেক খেলোয়াড়ের মধ্যে দেখবেন? মেসির প্রতি বিশ্বজুড়ে যে ভালবাসা সেটাও সম্ভবত আর কারও জন্য এমনভাবে নেই! আর্জেন্টিনা এমন এক আবেগের নাম, যেখানে ভালো খেলা-খারাপ খেলা তুচ্ছ বিষয়!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।