তাসকিন প্রসঙ্গ: আমি-আপনি কতটা দায়মুক্ত?

তাসকিনের সন্তানের জন্মদান প্রক্রিয়া বিয়ের আগে শুরু হয়েছে, না পরে – তা নিয়ে বর্তমানে ফেইসবুকে যে আলোড়ন চলছে, তার শুরু বেশ কয়েকযুগ আগে থেকে। জাতীয় তারকারা আক্রান্ত হলে আমরা একটু নড়ে-চড়ে বসি, বলে উঠি, তাসকিনকেও? সাকিবকেও? মুশফিককেও? তাই বলের ঘটনার সূত্রপাত কিন্তু মোটেও সাম্প্রতিক সময়ে নয়। প্রথমেই আমাদের যে বিষয়টা আলোচনা করা উচিৎ তা হচ্ছে, শুধু তারকা কেন? এই প্রশ্ন তো কারওই ফেইস করা উচিৎ না।

রহিমুদ্দিন, করিমুদ্দিন, জসীমুদ্দিন, অগাস্টিন, বাড়ৈ, কারওই না। কার সন্তানের জন্মদানের প্রক্রিয়া কবে শুরু হয়েছে, সেই বিষয়টি কোনভাবেই অন্য কারও চিন্তার বিষয় হওয়া উচিৎ নয়, অথচ হচ্ছে। কেন হচ্ছে, সে বিষয়ে আমরা তেমন তাত্বিক আলোচনায় যাই না, আমরা সারফেসে ঘুরতে থাকি, এবং ফলশ্রুতিতে এই ঘটনা কিছুদিন পরপর ঘটতে থাকে। আসলে এই ঘটনা কেন বন্ধ হচ্ছে না? বার বার কেন ফিরে আসছে? আমি দুটো বিষয় আলোকপাত করব।

প্রথম আলোচনার ফোকাস সমাজ এবং সামাজিকতা। আমরা ছোট থেকে দেখে এসেছি আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের আমাদের নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। আমাদেরও আমাদের প্রতিবেশীদের ব্যাপারে জানার আগ্রহ অন্তহীন। কার মেয়ে কার ছেলের সাথে ভাগল, কার বউ, জামাই বিদেশে থাকলে রঙঢঙ করে, কার দুষ্টু ছেলের বউ শ্বশুরবাড়ির সবাইকে প্রতিদিন ফোন করে তেলবাজি করে না, কার মেয়ের অফিস থেকে ফিরতে গভীর রাত হয়, কার ছেলের বেতন কত – এই যে অন্যের জীবন নিয়ে আমাদের মনে নানা প্রশ্ন – সেটা যে অনেকক্ষেত্রেই অনর্থক এবং পরচর্চা, আমাদের অভিভাবকগণ আমাদের এবং অভিভাবক হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানদের কাছে তা কতটা পরিষ্কার করেছি বলতে পারবেন?

অন্যের জীবন নিয়ে অযাচিত প্রশ্ন করা, গীবত করা যে অন্যায়, সেটা ভাবতেও কি শিখাই আমরা আমাদের সন্তানদের? উপরন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে, ড্রইং রুমে অন্যের জীবন নিয়ে যে আয়েশি-রসালো আলাপ করি, সেটা ক্রমান্বয়ে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। আমাদের নিজের পাতে ভাত না থাকলে যতটা না দুঃখ, অন্যের পাতে না থাকলে ততটাই সুখ!

আব্বা-আম্মার সাথে কালকে কথা বলছিলাম। আমরা আলোচনা করছিলাম মানুষ কেন ইমিগ্রেশন নিয়ে উন্নত দেশে যায়? আমি কানাডায় দেখেছি মানুষ ঢাকায় সবকিছু থাকা সত্বেও এখানে নাগরিকত্বের আবেদন করে চলে আসে। আমি একজনকেও (মূলত) দেখিনি, যার সামাজিক অবস্থান ঢাকার চাইতে কানাডায় ভালো হয়েছে। তারপরও অনেকেই আসেন। কেন আসেন এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলে বেশীরভাগই উত্তর দেন, ‘বাচ্চার ভবিষ্যতের জন্য’। মানুষ এটা অবচেতন মনে বলেন বলেই আমার ধারণা।

কারণ নাসা, সিডিসি, গুগল, টুইটারে যেসব বাঙালি বড় বড় পজিশনে যান, তারা আমার আপনার মতোই বাংলা স্কুলে পড়া মানুষ। বাংলাদেশী-কানাডিয়ান কোন বাচ্চা এখানে পড়ালেখা করে বড় হয়ে ওইরকম শীর্ষস্থানে যায় খুব কম (সাধারণত; যারা যায় তারা কানাডিয়ান হিসেবে যায়, বাংলাদেশি হিসেবে না)। তাছাড়া বাচ্চার ভবিষ্যত বলতে আমরা যে আদব-কায়দা-লেহাজের কথা ভাবি, সেটা এখানের চাইতে বাংলাদেশে অনেক ভালো। তাহলে? তারপরও কেন আসেন? আরও কিছু কারণ অনেকে বলেন, যেমনঃ সামাজিক অস্থিরতা, নিরাপত্তার অভাব, ট্র্যাফিক জ্যাম ইত্যাদি। আমি আম্মা-আব্বাকে এই কারণটাই বললাম।

কানাডায় খুন-জখম-ঘুষ-হত্যা-ধর্ষণ-অপহরণ কোনটাই বাংলাদেশের চাইতে কোন অংশে কম হয় না, বরঞ্চ কিঞ্চিত বেশিই হয়। কিন্তু এখানে সেটা আপনাকে তেমন প্রভাবিত করবে না। আমাদের সরকার টিভিতে কোন নিউজ ব্ল্যাকআউট করলে আমরা সরকার পতন চাই, এখানে করা হয় তার চাইতেও বেশি। আপনি আপনার পাশের ব্লকের খুনের ঘটনা হয়ত জানতে পারবেন পরেরদিনের পত্রিকা পড়ে; কে কী করে তা জানা তো দূরের কথা! আগে আমরা শুনতাম বিদেশে মানুষ প্রতিবেশীর খবর রাখে না, ভালো-মন্দে এগিয়ে আসে না। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। তারা আসে, যখন আপনার দরকার।

আপনার জীবন আপনি কীভাবে সাজাবেন, সেটা আপনার হাতে। কেউ বাগড়া দিবে না। আমি আব্বা-আম্মাকে বলছিলাম বাংলাদেশের সাজানো সামাজিক উচ্চতর অবস্থান থেকে মানুষ এখানে আসে মূলত মানসিক শান্তির জন্য। এখানে কেউ আপনার ঘাড়ের উপর সারাক্ষণ নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করে না আপনার বেতন কত, আপনার পদবী কী, আপনি ভাত খান না মদ খান, আপনি ছুটির দিনে কই যান? আপনার ব্যাংকে লোন কত? আপনার ছেলেমেয়ে এত ভালো স্টুডেন্ট হয়েও কেন মেডিকেল-বুয়েটে চান্স পেলো না! অথবা কেন সোম থেকে বুধবার এই তিনদিন আপনার মেয়েকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না!

আরো পড়ুন

এখানে আপনি বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ করে সাড়ে পাঁচটায় বাসায় পৌঁছে পরিবারকে সময় দিবেন, রান্না করবেন, একসাথে খাবেন। অথচ ঢাকায় পাঁচটার পর থেকে কে কতক্ষণ অফিস করল, সেটা তার পারফরমেন্স ইন্ডিকেটর। আমার এক বন্ধু নতুন কাজ বুঝতে সময় বেশি লাগছিল বলে কয়েকদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত অফিস করেছিল। সে শো-কজ নোটিশ পেয়েছিল, যেখানে তাকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছিল অতিরিক্ত সময় অফিসে থেকে সে কী করে? অতিরিক্ত সময় অফিসে থাকা এখানে ইন-এফিসিয়েন্সির লক্ষণ।

তো এই যে সমাজ, যেখানে আপনার সুখ নিহিত অন্য মানুষের জীবনের ছিদ্র খোঁজায়, সেখানে তাসকিনের আক্রান্ত হওয়া কোন ব্যক্তিক্রম নয়। এমন ঘটনার শিকার অনেকেই। আমরা নিজেরা যে কাজ করতে বিব্রতবোধ করি না, ঠিক সেই কাজের জন্য অন্যের সমালোচনা করতে পারি দেদারসে। এই যে সামাজিক পচন, অন্যের জীবন নিয়ে চর্বিত-চর্বণ, সেটা থামাতে না পারলে তাসকিনের সন্তানের জন্মদান প্রক্রিয়া কখন সেটা নিয়ে আলাপ হতেই থাকবে।

দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় ধর্মের চর্চা। কার সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়া কবে শুরু হলো, বিয়ের আগে না পরে তাতে আমার আপনার কী? কিছুটা সমাজ, তবে মূলত ধর্মই আপনাকে বাধা দেয় বিয়ের আগে সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়া শুরু করতে, তাই না? শুধু ইসলাম নয়, সব ধর্মেই বোধহয় এই বিষয়ে নিষেধ আছে। এখন ধর্মের এই বাধা আপনি মানবেন কিনা, সেটাও আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। দোজখে বা বেহেশতে কেউ সামাজিকভাবে, কিংবা দলবদ্ধভাবে যাবে না। যার যার জবাবদিহিতা তাকেই করতে হবে। ধর্মের আচার-আচরণ মানার দায়িত্ব তাই তাকেই নিতে দেয়া উচিৎ।

এত লম্বা লিখে মূলত যেটা বললাম, সেটা আমির খানের ‘ত্রি ইডিয়টস’ মুভিতে সুন্দর করে বলা আছে। ‘বন্ধু ফেল করলে মন খারাপ হয়, ফার্স্ট হলে মন আরও বেশী খারাপ হয়’। আমাদের সমাজের ক্ষয়িষ্ণু চরিত্রটা এখন ঠিক তেমনই। অন্যের সুখ, উন্নতি আমাদের ভালো লাগে না। একটা পর্যায়ের পর তাকে টেনে-হিচড়ে নামাতে ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র – যেই অস্ত্রই লাগুক না কেন, আমরা তা ব্যবহার করব।

আমাদের সংসারের অশান্তি দূর করার জন্য আমরা পরিবারের বোঝা লাঘবে হাত দিব না; কিন্তু ড্রয়িংরুমে বসে তাসকিন, সাকিবের বউ-বাচ্চা নিয়ে টানা-হেঁচড়া করব। তারপর যখন দেখব তাসকিন আর সাকিবের জীবন দুর্বিষহ করে দেয়া গেছে নিজেরটার মতোই – তখন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ঘুমুতে যাব এই ভেবে যে, যাক বাবা আমরা সবাই এখন সমান অসুখী।

আমি একটা নির্দিষ্ট কারণে এই লেখাটি লিখলাম। সেটা হচ্ছে আমাদের নিজেদের দায়িত্ব মনে করিয়ে দিতে। আমাকে আমার দায়িত্ব মনে করিয়ে দিতে। অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা কমিয়ে আনি। আমাদের সন্তানকে পরশ্রীকাতরতা থেকে দূরে রাখি। ফোনে, বাস্তবজীবনে সমালোচনা থেকে দূরে থাকি। যতটা পারি অন্যের প্রশংসা করি। অন্যের প্রশংসা মন থেকে না আসলে, জোর করে করি – যাতে আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে যায়। কেউ আপনাকে ফোন করে গোপন কথা শোনার প্রস্তাব দিলে অনাগ্রহ প্রকাশ করুন। কেউ যদি আপনাকে বলে, ‘তোরে একটা কথা বলি, আর কাউকে বলিস না’, সেই কথা শুনবেন না। সেই কথা আপনার শোনার আসলেই দরকার নাই।

নিজেকে, নিজের পরিবারকে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন থেকে সরাতে পেরেছি কিনা আসুন চিন্তা করি। তাসকিনের প্রোফাইলে কমেন্ট করা মানুষগুলো থেকে আমরা যারা সমাজের তথাকথিত উচ্চ অবস্থানে আছি, তারা কি খুব ভিন্ন? প্রশ্নটা সবার কাছে। আদালতের কাঠগড়ায় আজ আমরা সব্বাই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।