শাহরুখের জিরো, আপুর্ভা সাগোধারার্গাল ও একজন কমল হাসান

‘জিরো’ সিনেমায় শাহরুখ অভিনয় করছেন একজন খর্বাকৃতির মানুষের চরিত্রে। কোন বলিউড নায়কের এমন চরিত্রে অভিনয় করাটা নিঃসন্দেহে একটা বড় ঘটনা। বিফোর টিরিয়ন ল্যানিস্টার মেড ইট কুল, বাংলাদেশের ফারুকী বানিয়েছিলেন ঊন মানুষ। কলকাতাতেও ‘ছোটদের ছবি’ নামে একটা সিনেমা রয়েছে। তবে সবার আগে আসবে কমল হাসানের ‘আপুর্ভা সাগোধারার্গাল’-এর নাম।

‘আপুর্ভা সাগোধারার্গাল’ একই চেহারার দুই ভাইয়ের গল্প। তবে আর দশটা যমযের চেয়ে এই দুই ভাইয়ের পার্থক্য অন্য জায়গায়। এখানে এক ভাই স্বাভাবিক হলেও, অন্যজন খর্বাকৃতির। এক ভাই মোটর মেকানিক অন্যজন সার্কাসে। এবং দুই ভাই-ই কমল হাসান। বাবার মৃত্যুর শোধ নিতে সার্কাসের কমল বিভিন্ন সার্কাসীয় কৌশল অবলম্বন করেন। কখনো দড়াবাজি তো কখনো বাঘের দাবড়ানি।

মুভিটি পরিচালনা করেছেন এস.এস. রাও, যার সাথে কমল পুষ্পক নামের এক সাইলেন্ট ফিল্ম বানিয়েছিলেন। এই সিনেমায় খুব ব্রিলিয়ান্ট একটা দৃশ্য আছে, যেখানে সার্কাসের কমল নিজের কান্না ঢাকতে হাসি মাখা জোকারের মাস্ক পড়ে। যে মুভির প্রধান চরিত্র এক ‘বামন’, পুরোটা সময় জুড়ে যেখানে পাখি-কুকুর-হাতি-বাঘ-সিংহ থাকবে, সেই সিনেমা প্রথমে কেউ প্রোডিউস করতে রাজি হয়নি।

পরে কমল নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে সিনেমাটি বানান। সেই সাথে এই সিনেমার স্ক্রীপ্ট লিখেন, এমনকি একটা গানও গান। মুক্তির পর এটি পরিণত হয় তামিল ইন্ডাস্ট্রির সবচে ব্যবসাসফল ছবিতে (আগের রেকর্ডটিও কমলেরই ছিল)। সিনেমাটি টোরেন্টে পাওয়া যাবে, ইউটিউবে হিন্দি ভার্শন আছে। মজার ব্যাপার হলো, হিন্দি ভার্শনে নায়কের কণ্ঠ দিয়েছেন কমল নিজেই এবং নায়িকার কণ্ঠ দিয়েছেন তার তৎকালীন স্ত্রী সারিকা। আর সেই নায়িকাটি আর কেউ নন, কমলের বর্তমান জীবনসঙ্গী গৌতমী।

আশির দশকের এই ছবিটা দেখার পিছে মূল কারণ ছিলো কমল হাসান। আমি মুগ্ধ চোখে তার কাজ দেখি। কমল হাসান ভূ-ভারতের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি অভিনয়ের মাস্টারক্লাস নেবার মতো ক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, কমল হাসান ক্যান ডু এনিথিং অ্যান্ড এভরিথিং। কিছুদিন আগে, একজন সমালোচক ‘ভারত আনে নেনু’ মুভিতে মহেশ বাবুর খুব প্রশংসা করেছিলেন।

কারণ ওই মুভিতে মহেশ মাতৃভাষাটা ভালভাবে জানেন না। দক্ষিণী মুভিতে তো নায়কের সামান্যতম দুর্বলতার দেখা মেলে না, তারা সব কিছুতে ফার্স্ট। এই ২০১৮ সালে এসেও যখন সবাই ইমেজ নিয়ে এতটা সেনসিটিভ; ভেবে দেখুন তো, কি পরিমাণ গাটস থাকলে সেই ৩০ বছর আগে একজন নায়ক বিনা দ্বিধায় এমন চরিত্র করতে পারেন।

রজনীকান্তের জন্মদিনে পোস্ট এসে ভরে যায়, তিন খানকে নিয়ে কিছু বললে তো সিনেমার গ্রুপে পুরোদস্তুর দাঙ্গাল থুক্কু দাঙ্গা লেগে যায়। অথচ কমলকে নিয়ে বেশিরভাগ লেখা খুব ট্র্যাডিশনাল, বাই দ্য বুক ঘরানার। অভিনেতা কমলের কথা তো বাদই দিলাম, পরিচালক হিসেবে তিনি যে কতটা ভিন্নচিন্তার কাজ করেন সেটা কেউ বলে না। ভারতের নিয়মিত পরিচালকদের মাঝে খুব কমই এমন আছেন, যারা কমলের মতো এতটা পলিটিক্যালি সেল্ফ-অ্যাওয়ার ছবি বানান।

যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে যাই। শাহরুখ খান নিজে কিন্তু কমল হাসানের বড় ভক্ত। কমলের সাথে কাজ করার লোভে ‘হে রাম’ ছবিটায় তিনি বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছিলেন। কয়েকবছর আগে রাম গোপাল ভার্মা টুইট করেছিলেন, শাহরুখ নাকি কমল হাসানের মতো ক্যারিয়ার সুইসাইডের পথ ধরেছেন।

শাহরুখের অবশ্য কপালটাই খারাপ। গত দশ বছরে চোপড়া-জোহার-ফারহানের কমফোর্ট জোন ছেড়ে যে কয়টা মুভি করেছেন, বেশিরভাগ সময় খুব ভয়াবহ ফলাফল পেয়েছেন। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড উইনার রাহুল ঢোলাকিয়া থেকে শুরু করে মনিশ শর্মা হয়ে রোম্যান্টিক কমেডি এক্সপার্ট ইমতিয়াজ আলি প্রত্যেকে তাদের ক্যারিয়ারের সবচে দুর্বল মুভিটি বানিয়েছেন শাহরুখের সাথে। ভাগ্য কতটা বিরূপ হলে মাসালা মুভির জন্য বিখ্যাত রোহিত শেঠি ‘দিলওয়ালে’র মতো এমন বিস্বাদ মুভি উপহার দেন।

কিংবা অ্যাভারেজ মুভি মেকার অনুভব সিনহা চার বছর সময় নিয়েও, একটা অ্যাভারেজ মুভি বানাতে পারেন না (একমাত্র ব্যতিক্রম ফারাহ খান। মিসেস কুন্দরের ‘তিস মার খান’ এতটাই বাজে মুভি ছিলো যে, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’-কে সবাই ইমপ্রুভমেন্ট হিসেবে গণ্য করেছে)। এবার শাহরুখ কাজ করেছেন প্রমিসিং ডিরেক্টর আনন্দ রায়ের সাথে। এরকম সিজিআই নির্ভর সিনেমা শাহরুখ আগেও একটা করেছিলেন। তখন যেটা ছিলো রা.ওয়ান, এখন সেটা নেমেছে জিরো-তে। নিউমারোলজিও শাহরুখ খানকে নিয়ে খেলছে কিনা, সেটাও ভাবনার বিষয়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।