দমে যাবার পাত্র নন তিনি

মোটা দাগে আমরা সিনেমাকে দুটো ভাগে ভাগ করে ফেলি। যার একটি বাণিজ্যিক অন্যটি অবাণিজ্যিক। কমার্শিয়াল বনাম আর্ট। আমরা মনে করি কমার্শিয়াল সিনেমায় আর্ট নেই, সব আর্ট যেন বরাদ্দ অবাণিজ্যিক সিনেমার জন্য। তাই সিনেমা দেখার আগে মনের ভেতর গেঁথে নেই এটি আর্ট ফিল্ম, ওটি কমার্শিয়াল ফিল্ম।

প্রতিনিয়ত প্রায় একই ছকে নির্মিত বাণিজ্যিক ছবি দেখে দেখে চোখে ছানি ফেলে দেয় দর্শকরা, তবু তারা অবাণিজ্যিক ছবি গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে দেখতে চায় না। তবে ইদানিং এ ধ্যানধারনার পরিবর্তন হচ্ছে। দর্শক সবধরনের ছবিই দেখছেন। নির্মাতারাও চেষ্টা করছেন দর্শকের মনের ভাষা পড়ে নিতে।

বাণিজ্যিক সিনেমা একটি সিস্টেমে সিনেমাহলে মুক্তি পায়। অধিকাংশ বাণিজ্যিক ছবিতে তারকা শিল্পীরা অভিনয় করেন। সেই তারকার রূপে গুণে মুগ্ধ হয়ে দর্শক সিনেমা দেখত আসে, পরিচালক কি বলতে চাইলেন বা গল্পটি যুতসই হলো কিনা তা আর ভাবনায় আসেনা।

এই সিস্টেমের বাইরেও একধরনের ছবি আছে, তা হলো স্বাধীন নির্মাতার সিনেমা। বাণিজ্যিক সিনেমার চাপিয়ে দেয়া কিছু থাকেনা, নির্মাতা নিজের মতো করেই কাজ করেন; সিনেমা বানান। বাংলাদেশেও এমন ছবি হয়েছিল, হচ্ছে, হবে। এমন একজন নির্মাতা এবারের ঈদে অভূতপূর্ব কাজ করে বসলেন। ঈদে রিলিজ দিয়ে বসলেন নিজের ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমা।

তরুণ পরিচালক অন্ত আজাদ। তিনি পঞ্চগড়ের ছেলে। এ জেলায় কোন সিনেমাহল নেই। কোন নাটক বা সিনেমার শুটিং হয় না। অন্ত জীবনের প্রয়োজনে ঢাকায় এসে টুকটাক নাটক বানালেও সাহস করে সিনেমা বানিয়ে ফেললেন। সম্পূর্ন নিজের অর্থে। তারকা শিল্পী না নিয়েই। একদম আনকোরা ছেলেমেয়ে যাদের গল্পে প্রয়োজন, তাদের নিয়েই কাজ করলেন অন্তু।

ছবির নাম ‘আহত ফুলের গল্প’। বিশুদ্ধ প্রেমের ছবি এটি। রয়েছে পাঁচটি গান। রয়েছে গভীর ম্যাসেজ। সিনেমার শেষ দর্শককে ভাবাবে, কাঁদাবে – এমনটাই জানালেন পরিচালক।

বাংলাদেশে এবার ঈদে চারটি মূলধারার ছবি মুক্তি পেয়েছে। সেগুলো হল – ক্যাপ্টেন খান, জান্নাত, মনে রেখো এবং বেপরোয়া। মিডিয়ার আলোচনায় বাণিজ্যিক ছবিগুলোই। মানুষ অন্তু আজাদের ‘আহত ফুলের গল্প’ নামেও যে একটি ছবি মুক্তি পেয়েছে তার খবরই রাখেনা। অন্ত আজাদ দমে যাবার পাত্র নন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই ছবিটি সবার কাছে পৌঁছে দেবেন। তাই শুরু করলেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে সিনেমার প্রদর্শনী।

নিজের একক প্রচেষ্টায় গ্রামের পথে মাইকিং করে করে সিনেমা ফেরী করা শুরু করলেন। স্কুল, কলেজে নিজের সিনেমার গল্প শোনাতে হাজির হলেন। তাও ঈদের বাজারে। বাংলাদেশে খুব সম্ভবত ঈদের সময় ব্যক্তিউদ্যোগে নির্মিত ছবির প্রথম প্রদর্শন এটি। অন্ত আজাদ ইতিহাস তৈরী করে ফেললেন, হয়তো নিজের অজান্তেই।পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে শুরু হওয়া এ মুভমেন্ট সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে তবেই ঢাকায় ফিরতে চান অন্তু আজাদ।

অন্তর মনোবাসনা সবার চেয়ে আলাদা। ঈদে সব পরিচালক সিনেমা মুক্তি দেন, একটা সিস্টেমে বসে। অন্যদিকে অন্ত আজাদও সিনেমা মুক্তি দিলেন, তবে স্বাধীনভাবে। তিনি ইন্ডি ফিল্ম মেকার। শাদা বাংলায় বলতে গেলে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি তার ছবি নিয়ে প্রচারনা নিজেই চালাচ্ছেন। নিজ উদ্যোগে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের পরিত্যক্ত টাউনহল পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে সিনেমার শো করছেন।

তিনি টিকেটের ব্যবস্থাও করেছেন। পঞ্চাশ টাকা ও একশ টাকা। টানা দুই সপ্তাহ এখানে সিনেমা চালানোর ইচ্ছা তার। তিনি বাংলাদেশ ঘুরতে চান তার সিনেমা নিয়ে। তারপর ঢাকায় রিলিজের ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। তিনি সিনেমা ফেরী করছেন, ঠিক যেন তারেক মাসুদের মতো। তরুণ অন্ত আজাদের মাঝেই আমরা ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছি তারেক মাসুদের।

অন্ত আজাদদের সফল হওয়া জরুরী, আমাদের তরুণ নির্মাতাদের স্বপ্ন দেখাতে অন্ত আজাদের চেষ্টা হয়ে থাকবে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

  • এক নজরেআহত ফুলের গল্প

সিনেমার পাঁচটি গানের তিনটি মৌলিক। বাকি একটি রবীন্দ্র সঙ্গীত অন্যটি উত্তরবঙ্গের প্রচলিত বিয়ের গান। তিনটি মৌলিক গান রচনা করেছেন টোকন ঠাকুর, কামরুজ্জামান কামু ও সোলায়মান আকন্দ। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন পিন্টু ঘোষ, কমারুজ্জামান রাব্বি ও লিপু অসীম। রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইলেন রোকন ইমন, উত্তরবঙ্গের স্থানীয় শিল্পীরা গেয়েছেন বিয়ের গানটি।

সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন একদম নতুন মুখেরা। তারা হলেন তাহিয়া খান, সুজন মাহাবুব, গাজী রাকায়েত, অনন্যা হক, শেলী আহসান, জয়া, অভি চৌধুরী প্রমুখ।

ছবিটির সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন মো: আরিফুজ্জামান, সম্পাদনা করেছেন সৈকত খন্দকার, পিন্টু ঘোষ ও রোকন ইমন ছিলেন আবহ সংগীত ও সংগীত আয়োজনে। শব্দ দেখভাল করেছেন শৈব তালুকদার, কালারে ছিলেন রাশেদু্জ্জামান সোহাগ, শিরোনাম ও ভিএফএক্সে নাজমুল হাসান।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।