একবার গেলে আর ফিরে আসে না

বাংলাদেশের কোন নায়িকাকে যদি সামান্যতমও নটি বিনোদিনীর সাথে তুলনা করা যায় তো তিনি হবেন অঞ্জু ঘোষ। কিশোরী বয়সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিউ ভোলানাথ অপেরার নৃত্যশিল্পী ও গায়িকা থেকে চট্টগ্রামের পেশাদার যাত্রা মঞ্চ।

এরপর বাংলা সিনেমার নায়িকা। টিকে থাকার জন্য ডাকসাইটে পরিচালকের বাহুলগ্না হওয়া। সময় ও সাফল্যের  স্রোতে সম্পর্কের সুতো থেকে ছিটকে যাওয়া। এক সময়ে এক নম্বর ব্যবসাসফল নায়িকা হওয়া।

তারপর দেশের বাজারে দরপতন। ভাগ্যান্বেষণে কলকাতা, টালিগঞ্জ। আবার যাত্রামঞ্চ৷

অভিনয়ই একমাত্র পেশা। পরিবারের ভরণপোষণের দায় তাঁর।   জীবিকার টানে জীবনের নাগরদোলায় চড়েছেন। দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটেছেন।

শেষ বয়সে আবার দেশে এসে পুরনো কাজের ক্ষেত্রটি দেখলেন।  পুরনো বন্ধুদের সাথ পুনর্মিলন হলো। এখানটায় তিনি ভাগ্যবান। তাঁর পুরনো বন্ধুরা তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন।

পুরো জীবনটাই যেন সিনেমা। উত্থান পতনে ভরা। কিন্তু পেশাদারিত্বে কোন ফাঁক নেই।

আমাদের ছেলেবেলার হিট নায়িকা ছিলেন। তাঁর নায়ক  ইলিয়াস কাঞ্চন।  দীর্ঘদিন পর অঞ্জু যখন এফডিসিতে এলেন ইলিয়াস কাঞ্চনের সেকি উচ্ছাস! গান গাইতে গাইতে মালা পরিয়ে দিলেন প্রিয় বন্ধুকে।

কাঞ্চন সাহেবকে পেশা সূত্রে ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে চিনি। খুব সিরিয়াস আর গম্ভীর ধরণের চমৎকার ব্যক্তিত্ববান মানুষ।

বাইশ বছর পর প্রিয় বন্ধু সহকর্মীকে পেয়ে যেভাবে আবেগাপ্লুত হয়েছেন, চোখ অশ্রুসিক্ত করেছে  ইউটিউবে সে দৃশ্য দেখে আমার নিজের ভেতরই কেমন হাহাকার জেগে উঠেছে। যদিও কাঞ্চন সাহেব খুব পরিমিতি দেখিয়েছেন। কিন্তু তার আবেগটুকু বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি।

অঞ্জু ঘোষ সাহিত্যিক বা কবি নন। খুব গুছিয়ে কথা বলতে জানেননা। কিন্তু কেন যেন মনে হলো আমি তাঁর আবেগেরও সবটা বুঝতে পেরেছি। উনি উনার আনাড়ি ভাষায় বললেন, ‘আমি যেন তীর্থ পাড়া দিয়েছি।’ বলেই কেঁদে ফেললেন।

আমরা শিক্ষিত হয়েছি। রুচিবান হয়েছি। বাংলা সিনেমার এইসব অভিনেতা অভিনেত্রীদের তাচ্ছিল্য করতে শিখেছি। আমাদের বিনোদনের মার্গ এখন উঁচু তারে বাঁধা।

কিন্তু একটা সময় আমাদের আনন্দ বিনোদনের খোরাক যুগিয়েছেন এই মানুষগুলি। অভিনয়ের মত একটি ঝঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবন যৌবন হাতের তালুতে নিয়ে দুরন্ত যাদুকরের মত ভোজবাজি খেলেছেন।

এদেশের বিনোদন শিল্পে শতকোটি টাকার বাণিজ্য এনে দিয়েছেন। আজ তাঁরা বিগত যৌবনা। আহা যৌবন কি মহার্ঘ এক দান! একবার গেলে আর ফিরে আসেনা।

খুব ভাল লাগলো এটা দেখে যে অঞ্জু ঘোষকে বাইশ বছর প্রায় অন্তরালে থাকার পরও আজো কেউ ভোলেনি। এফডিসি তাঁকে যথাযথ সম্মান দেখিয়েছে৷

কেন যেন অঞ্জু ঘোষকে আমার আজ খুব বড় শিল্পী মনে হলো৷ আগে হয়নি। সেই সাথে ইলিয়াস কাঞ্চনকেও।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।