অ্যাঙলো-জাঞ্জিবার লড়াই: ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট যুদ্ধ

জাঞ্জিবার জায়গাটার নাম শুনেছেন? তাঞ্জানিয়ার অংশ মোটে ৯৫০ স্কয়ার মাইলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত দেশটির নাম অনেকে শুনে থাকলেও একে নিয়ে আগ্রহীর সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা হবে। যদিও, ভারতীয় মহাসাগরের বুকের এই দেশটিতেই সংগঠিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ।

সেই ইতিহাসটা যাতে ফিরে যেতে হবে সেই ১৮৯৬ সালে। জাঞ্জিবারে তখন ওমানি সালতানাতের শাসন চলছে, আসলে পর্দার আড়াল থেকে সব ক্ষমতা ছিল গ্রেট ব্রিটেনের হাতে। সুলতান হামাদ বিন থুওয়াইনির আকস্মিক মৃত্যু হয় ২৫ আগস্ট।

খালিদ বিন বারগ্রাশ

এরপর তারই চাচাতো ভাইয়ের ছেলে খালিদ বিন বারগ্রাশের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই ২৯ বছর বয়সী তরুণ সেদিনই সুলতানি দখল করেন। ওই সময় পেছন থেকে মদদ যোগায় জার্মানি। জার্মানদের সহায়তা নিয়ে বারগ্রাশ চুড়ান্ত স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন।

ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল বারগ্রাশ তাঁদের হয়ে কাজ করবেন না, সুলতান হিসেবে তাঁদের পছন্দ ছিল হামাদ বিন মোহাম্মদকে। গ্রেট ব্রিটেন বিষয়টা বুঝতে পেরে খুব বেশি কালক্ষেপন করেনি। দ্রুতই সৈন্য-সামন্ত পাঠিয়ে দেয় দ্বীপ দেশটিতে।

যুদ্ধের আগে জাঞ্জিবারের সুলতানদের প্রাসাদ

দিনটি ছিল ২৭ আগস্ট, সকাল নয়টা।

সুলতানের যুদ্ধ করার সম্বল বলতে কেবল একটা রাজকীয় জাহাজ – ‘এইচএইচএস গ্ল্যাসগো’। তাঁর হয়ে লড়াই করার জন্যই ছিল মোটে দু হাজার ৮০০ জন মানুষ। এর অধিকাংশই আবার সিভিলিয়ান।  অন্যদিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটেনের স্কয়াড্রনে ছিল পাঁচটি জাহাজ।

এইচএইচএস গ্লাসগো

ব্রিটেনের হাতে ছিল তিনটা ক্রুজার, দু’টি গানবোট। সাথে ১৫০ জন মেরিন সেনা আর ৯০০ জাঞ্জিবারিস সেনা ছিল। রয়াল নেভির দায়িত্বে ছিলেন রিয়ার-অ্যাডমিরাল হ্যারি রওসন, আর তাঁদের সঙ্গী জাঞ্জিবারিস সেনাদের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল লয়েড ম্যাথিউস।

সেখানেই মোটামুটি যুদ্ধের আসন্ন ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। সুলতান বারগ্রাশের কড়া নির্দেশনা ছিল প্রাসাদের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে রাখার। প্যালেস গার্ডরা সেটা অক্ষকে অক্ষরে পালন করে। সদর দরজায় ভারি আর্টলারি পিসেস ও মেশিন গান বসানো হয়।

ব্রিটিশ নেভি নিয়ে নিয়ে আসে ভয়ংকর যুদ্ধ জাহাজ এইচএমএস থ্রাশকে।

সকাল নয়টা বেজে দুই মিনিট। গ্ল্যাসগো আর প্রাসাদকে সামনে রেখে যখন ব্রিটিশদের আক্রমণ শুরু হয়, তখনই বোঝা যায় এই লড়াই হতে যাচ্ছে একপাক্ষিক।

কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই যে ব্রিটিশরা বোঝা যাবে সেটাও বোঝা যাচ্ছিল। ব্রিটিশরা গোলা-বারুদ দিয়ে আক্রমণ শুরু করা মাত্রই সবাই পালিয়ে যেতে শুরু করে।

রয়্যাল নেভি কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্ল্যাসগো আর বাকি ছোট দু’টি নোৗকাকে ডুবিয়ে দেয়। পেশাদার ব্রিটিশ সেনাদের কাছে জাঞ্জিবারের অপেশাদাররা পাত্তাই পায়নি। আনুমানিক ৫০০ জনের মত মানুষ এই যুদ্ধে প্রাণ হারায়।

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও তখনও রাজবাড়ির ফ্ল্যাগপুলে পতাকাটা তখনও লাগানো ছিল। এটাকে ব্রিটিশরা ‘আত্মসমর্পনে অস্বীকৃতি’ বলে মনে করা। মেশিন গান দিয়ে পতাকা গুড়িয়ে দেওয়ার সময় ঘড়িতে বেজেছিল নয়টা ৪০ মিনিট।

যুদ্ধ শেষে সুলতানের হারেমের ভঙ্গুর দশা

এর অর্থ হল যুদ্ধটা মোটে ৩৮ মিনিট স্থায়ী হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এর চেয়ে কম সময়ের যুদ্ধ আগে পরে আর দেখা যায়নি। এটা গিনেস বুকের রেকর্ডেও নাম লিখিয়েছে।

অনেকে তামাশা করে এর নাম দিয়েছেন ‘দ্য ব্রেকফাস্ট ওয়ার’। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিক ভাবে জাঞ্জিবার নিজেদের সার্বোভৌমত্ব হারায়, পরিণত হয় ব্রিটিশ উপনিবেশে।

বারগ্রাশ প্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যান। জার্মানদের সহায়তায় তিনি চলে যান জার্মান নিয়ন্ত্রিত পূর্ব আফ্রিকায়। ১৯১৬ তাকে তাঞ্জানিয়ার রাজধানী দারুস সালাম থেকে গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়।

নির্বাসন শেষে করে আবারো তিনি পূর্ব আফ্রিকায় ফিরেছিলেন। মোম্বাসায় ১৯২৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

ব্রিটিশ পত্রিকায় খবর ছাপা হয়

– দ্য টেলিগ্রাফ, হিস্টোরিক ইউকে ও ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।