হারকিউলিসের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো কেউ জানে না

দিনটি ছিলো ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের সকাল, ঘড়ির কাটায় ঠিক তখন ১১ টা। আমি ট্রেইনার টেবিলে বসে আছি পায়ে ইঞ্জেকশান নেওয়ার জন্যে। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে আমার ঊরুর পেশি ছিড়ে যায়। পেইনকিলার নিয়ে আমি হয়ত দৌড়াতে পারব কিন্তু অনুভূতিহীন এই পা নিয়ে আমি খেলতে পারব না। সামনে বসা ট্রেইনারকে তখন একটা কথাই বললাম, ‘আমি যদি ভেঙে যাই, আমাকে ভাঙতে দাও। আমি পরোয়া করি না, আমি শুধু খেলতে চাই,আজকের ম্যাচটা খেলতে চাই।’

তখন আমি পায়ে বরফ লাগাচ্ছিলাম। আমি দেখতে পেলাম আমাদের দলের চিকিৎসক ড্যানিয়েল মার্টিনেজ আমার কক্ষে উপস্থিত।তার হাতে ধরে রাখা খামটি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখো, আঞ্জেল, রিয়াল মাদ্রিদ থেকে এই কাগজটি এসেছে।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি বলতে চাও।’

ড্যানিয়েল উত্তরে বলল, ‘রিয়াল চায় না তুমি আগামীকালের ম্যাচটা খেলো কারণ তুমি এই ম্যাচ খেলার মত অবস্থায় নেই। তাই তারা আমাদের জোর করছে যাতে আগামীকালকের ম্যাচে তোমাকে না খেলানো হয়।’

আমি তখনি বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা আসলে কি হচ্ছে। ততদিনে এই কথা অনেকটাই মুখে মুখে ছড়িয়ে পরেছে যে রিয়াল বিশ্বকাপের পরেই হামেস রদ্রিগেজের (কলম্বিয়ার ফরোয়ার্ড, ২০১৪ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটজয়ী) সাথে চুক্তি করবে। আর রিয়ালে হামেসের জায়গা হবে আমাকে বিক্রি করার মাধ্যমেই। যার কারনে রিয়াল কোনো দিনও চাইবে না ইনজুরির কারণো তাদের এই মহামূল্যবান সম্পদের কোনো ক্ষতি হোক। এটাই হল ফুটবলের ব্যবসা যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পরে না।

আমি খামটা হাতে নিয়ে তা না খুলেই ছিড়ে দু-টুকরো করলাম এবং ড্যানিয়েলকে বললাম, ‘কাগজগুলো ছুড়ে ফেলে দাও। এইখানে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা আমিই নেবো।’

সেই দিন রাতে আমি একটি ফোটাও ঘুমাতে পারিনি। ব্রাজিলের শোচনীয় পরাজয়ের পরে হোটেলের বাইরে আতশবাজি ফোটানো পুরোপুরি বন্ধ ছিলো। এমন নিস্তব্ধতার মাঝে আমার দু চোখের পাতা একটুর জন্যেও এক হয়নি।সেই সময়ের অনুভূতি আসলে ভাষায় বর্ণনাতীত। আপনি যখন বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের মুহূর্তে দাড়িয়ে,যেই ম্যাচের স্বপ্নে আপনি বিভোর থাকতেন সেই ম্যাচের পূর্বে ঘুম না আসাটাই স্বাভাবিক।

আমি এই ম্যাচটি মনেপ্রাণে খেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম কালকের ম্যাচে আমার খেলা, আমার দলের জন্যে একটি সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাবে। তাই আমি সকালে ঘুম থেকে উঠেছিলাম এবং আমাদের ম্যানেজার, সাবেলার সাথে দেখতে করতে গিয়েছিলাম। আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তাই যদি আমি তাকে বলতাম যে আমি খেলতে চাই, আমি জানতাম যে তিনি আমাকে চাপ দিবেন। তাই আমি তাকে আন্তরিক ভাবেই বললাম যে আপনি যাকে উপযুক্ত মনে করবেন তাকেই আজ খেলাবেন।

আমি বললাম, ‘যদি আপনার মনে হয় আমি আজ খেলতে পারব তবে আমি খেলব। যদি এটি অন্যকেও হয় তাহলে সেই খেলবে। আমি শুধু বিশ্বকাপ জয় করতে চাই যদি আপনি আমাকে খেলার জন্যে সুযোগ দেন, আমি খেলবো যতক্ষণ না আমি ভাঙবো।’

আমি কাঁদতে শুরু করলাম।কারন আমি জানতাম এটাই শুধু আমাকে পরিতৃপ্ত করবে আর কিছু না।

ম্যাচের আগে আমাদের দল ঘোষণা করার সময়, সাবেলা ঘোষণা করে যে, এনজো পেরেজ আজ শুরু করতে যাচ্ছে আমার পরিবর্তে, কারণ সে শতভাগ সুস্থ ছিল। আমি এই সিদ্ধান্তকে শান্তভাবেই গ্রহন করলাম। তারপরেও আমি ম্যাচের আগে একটি ইনজেকশন নিয়ে নিলাম পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে। খেলার দ্বিতীয়ার্ধে, আমাকে বেঞ্চ থেকে বলা হয়, যাতে করে আমি খেলতে প্রস্তুত থাকি।

কিন্তু ডাক আর আসে নি। আমরা বিশ্বকাপ হারিয়েছি, এবং আমি কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন ছিল। ম্যাচের পর, প্রচার মাধ্যমগুলিতে কেন আমি খেলিনি তা নিয়ে অনেক সত্য মিথ্যা প্রচার হোল। কিন্তু আমি যা বলছি তা পরম সত্য।

আমার কাছে আজো সবচেয়ে কষ্টদায়ক মুহূর্ত ছিলো যখন ম্যাচ শেষে আমি সাবেলার সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ি। আমি জানতাম আমি আবেগপ্রবণ কিন্তু আমি জানতাম না এর মাত্রা এতোটা বেশি।

আমাদের ঘরের দেয়াল সাদা ছিল বলেই মনে করা হত। কিন্তু আমি তাকে সাদা হিসেবে কখনোই দেখিনি। প্রথমে তা ধূসর ছিল। তারপর আস্তে আস্তে কয়লার ধুলোমাখা কালোতে পরিণত হয়। আমার বাবা কয়লা শ্রমিক ছিলেন, কিন্তু খনিতে কাজ করতেন এমন নয়। তিনি আসলে কাঠ কয়লার ব্যবসা করতেন। আপনারা বার-বি-কিউ এর জন্য দোকান থেকে ছোট ব্যাগে করে যে কয়লা কিনে আনেন তার ব্যবসায় করতেন।

সত্যি এটা একটি খুব নোংরা ব্যবসা। তিনি টিনের ছাদে কাজ করতেন, বাজারে বিক্রি করার জন্য কাঠের কাঠামোর সমস্ত টুকরো তুলে ধরতেন। স্কুলে যাওয়ার আগে, আমি ও আমার ছোট বোন তাকে সাহায্য করতে জেগে উঠতাম। আমরা বয়স তখন বড়জোর ১০ বছর।সেই বয়সে ব্যাগ বোঝাই করে কাঠ কয়লা বহন করা আমার কাছে খেলার সমান।চারকোনা ব্যাগের সাথে খেলার জন্য তখন নিখুঁত বয়স। যখন কয়লা উত্তোলন করা হবে, তখন আমাদের বেড রুমের মধ্যে দিয়ে ব্যাগ বহন করে সামনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। আর আমাদের এই খেলার জন্য আমাদের বাড়ি মূলত কালো হয়ে গেল।

কিন্তু আমাদের দুইবেলা খাবারে যোগানদাতা ছিল এইটাই।আমার বাবার ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু আমার বাবার এক বন্ধু তার বাড়ির জন্য আমার বাবাকে জামিনদার হিসাবে নিয়োগ করেছিল যে ছিল আমার বাবার খুবই বিশ্বস্ত।কিন্তু সেই লোক একদিন হটাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই ব্যাংক আমার পিতার কাছে সরাসরি হাজির হয়েছিল পাওনা পরিষোদের জন্য।তার প্রথম ব্যবসা আসলে কাঠ কয়লার ব্যবসা ছিল না। তিনি তার বাড়ির মধ্যে একটুকরো দোকান চালু করেন। তিনি ব্লিচ, ক্লোরিন, সাবান এবং এই ধরনের পরিষ্কার দ্রব্য যা কাপড় পরিষ্কারে় ব্যবহৃত হয়,তা ছোট ছোট বোতলে ভরে বিক্রি করা শুরু করেন।আর এই সব পণ্যের বড় বড় ড্রামগুলো আমাদের ভিতরের ঘরে থাকত।

এটা একটা সময় পর্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। ভাল যাচ্ছিল সব। কিন্তু, তাদের শিশু সন্তান আমিই তাদের এই ব্যবসা নষ্ট করার পিছনে বড় কারণ ছিলাম। একদিন ব্যবসা চলাকালীন সময়ে আমি হটাত মাঝ রাস্তার দিকে দৌড়ানো শুরু করি। চলন্ত গাড়ির সাথে ধাক্কা খাওয়া থেকে আমি বেচে যাই অল্পের জন্য।তখন থেকেই আমার মা এই ব্যবসাকে বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং আমদের এই ব্যবসার সমাপ্তি ঘটে সেই খানেই।

তখন আমার বাবা অন্য কিছু করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। সেই মোতাবেক তিনি সান্তিয়াগো থেকে কয়লা নিয়ে আসা এক ব্যক্তির থেকে কয়লা নিয়ে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম পর্যায়ে আমাদের এই ব্যবসা করার মত পর্যাপ্ত টাকা ছিলো না। তারপরেও কষ্ট করে এই ব্যবসা চালু রাখতে হয়েছিল যাতে আমাদের পরিবার দুবেলা দুমুঠা কিছু খেতে পারে।

এই কারনে আমি খুব অল্প বয়সে ফুটবলের কাছে ঋণী হয়ে গিয়েছিলাম।

আমার দুরন্তপনাতে আমার মা এতোটাই অতিষ্ঠ ছিলো যে তিনি একদিন আমাকে এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান এবং তাকে প্রশ্ন করেন এমন দুরন্ত ছেলেকে নিয়ে কি করবেন।

ডাক্তার একজন খুব ভালো আর্জেন্টাইন ডাক্তার ছিলেন। যার ফলে তার উপদেশ ছিলো আমাকে যাতে ফুটবল খেলায় সাথে যুক্ত করে দেওয়া হয়। সেই থেকেই আমার ফুটবলের পথচলা শুরু।

আমি প্রথম থেকেই ফুটবলে ভালো করতে শুরু করলাম। আমি এতোটাই ফুটবল খেলতাম যার কারণে প্রতি দুই মাসে আমার ফুটবল বুটগুলোর নিচে ক্ষয়ে যেত। আর আমার মা সেই বুটের তলাতে আঠা লাগিয়ে খেলার উপযোগী করে দিত। কারণ প্রতি দুই মাসে ফুটবল জুতো কেনার মত আমাদের তখন সেই আর্থিক অবস্থা ছিলো না।

তবে আমি ভালোই ফুটবল খেলছিলাম। আমি আমার এক পার্শ্ববর্তী ক্লাবের হয়ে ৬৪ গোল করেছিলাম যখন আমার বয়স ছিল মাত্র ৭। একদিন আমার মা এসে বলল, ‘রেডিও ষ্টেশনের কিছু লোক আমার সাথে কথা বলতে চায়।’

একদিন আমি সেই রেডিও ষ্টেশনে গেলাম এবং তারা আমার সাক্ষাতকার নিলো। কিন্তু আমি সেই সময় এতোটাই লাজুক ছিলাম যে আমি পুরো সাক্ষাতকার জুড়ে খুবই অল্প কথা বলেছিলাম।

সেই বছর একদিন হঠাৎ আমার বাবার কাছে রোজারিও সেন্ট্রাল নামের এক ক্লাব থেকে ফোন আসে। তারা তাদের ক্লাবে আমাকে নিতে ইচ্ছুক। কিন্তু সমস্যা হল আমার বাবা ছিলেন নিওয়েল ওল্ড বয়েজ ক্লাবের সমর্থক। কিন্তু মা ছিলেন সেন্ট্রালের বড় সমর্থক। যার ফলে বাবার অনিচ্ছা এবং নয় কি.মি. দূরে হওয়া সত্ত্বেও মার ইচ্ছাতেই আমি ‘রোসারিও সেন্ট্রালে’ যোগদান করি।

এরপর থেকে শুরু হয় আমাকে নিয়ে আমার মার কষ্টের পথচলা।

তখন আমার বোন গ্রেসিলা খুব ছোট। তার মরচে ধরা, সামনে ঝুড়িওয়ালা, হলুদ রঙের সাইকেলটার সামনে বাবা একটা কাঠের পাটাতন লাগিয়ে দিয়েছিলো যাতে করে মা আমাকে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে আর গ্রেসিলাকে সামনের কাঠের পাটাতনে বসিয়ে নয় কিলোমিটার দূরের ক্লাবে অনুশীলনের জন্য নিয়ে যেতে পারেন।

আপনারা হয়ত ভাববেন ব্যাপারটি খুব সহজ। কিন্তু আমি জানতাম রোদ, ঝড়, ঠাণ্ডা,বৃষ্টি এই সব মাথায় নিয়ে আমার মা কিভাবে প্যাডেল চালিয়ে এতদূরে আমাকে, গ্রেসিলাকে আর ঝুড়িতে করে হালকা খাবার আর আমার খেলার সরঞ্জামাদি আনা নেওয়া করত।

কিন্তু সেন্ট্রালে আমার জীবন খুব একটা সুখকর ছিলো না। এমনকি আমার মা না থাকলে হয়ত আজকে আমার এই ফুটবলার হওয়াটাও হত না।

তখন আমার বয়স প্রায় ১৫ এর কাছাকাছি কিন্তু আমার শারীরিক গঠন তখনও এতোটা ভালো ছিলো না। অপরদিকে আমার কোচ ছিলো শারীরিক গঠনকে জোড় দেওয়ার পক্ষপাতী। তার সামনে সুঠাম শারীরিক গঠন বিশিষ্ট এবং আক্রমণাত্মক খেলায় পারদর্শী ছেলেগুলায় খেলোয়াড় হিসেবে উপযুক্ত ছিলো। কিন্তু আমার খেলার ভঙ্গি এরকম ছিলো না।একদিন আমি একটি হেডের বল জাম্প করে হেড করতে পারিনি। খেলার শেষে কোচ আমাকে সবার সামনে দাড় করালেন আর বললেন, ‘তুমি একটা দুর্বল, ভীতু ছেলে। তোমাকে দ্বারা কিচ্ছু হবে না। তুমি নিশ্চিত ব্যর্থ হবে।’

কোচের এই কথা গুলো আমি মেনে নিতে পারি নি। আমি কোচের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়লাম এবং একছুটে সেখান থেকে বেড়িয়ে চলে এলাম।

আমি যখন ঘরে ফিরে এলাম তখনো আমার মা কিচ্ছু জানতো না। কিন্তু আমি সেই অপদস্থতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারিনি। আমি ঘর থেকে বের হতাম না, স্কুলে যেতাম না। আমার এই অবস্থা দেখে আমার মা কিছুটা অবাক হলেন। অন্যান্য সকল মায়ের মত তিনিও আমার অন্য বন্ধুদের থেকে সেই দিনের ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং ব্যপারটি সম্পর্কে অবগত হলেন। তিনি তখন আমাকে শুধু একটা কথাই বললেন, ‘আঞ্জেল, তোমাকে ফিরে যেতে হবে। তোমাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। তুমি হাল ছেড়ো না, নিজেকে প্রমাণ কর।’

পরের দিন আমি যথারীতি ক্লাবে গেলাম এবং আগের থেকে অনেক বেশি পরিশ্রম দিলাম। এই কথা স্বীকার করতে হবে এই ক্ষেত্রে আমার বন্ধুরা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল।

তারপরেও ১৬ বছর বয়সে আমি যথেষ্ট চর্মসার ছিলাম। যার ফলে আমি সেন্ট্রালের সিনিয়র দলে জায়গা পাই নি। এমন অবস্থায় আমার বাবা প্রচণ্ড আশাহত হোন। কারণ আমাদের আর্থিক অবস্থা এতোটাও অনুকূলে ছিলো না যে আমি শুধু মাত্র সখের বসে ফুটবল খেলব। আমার পরিবারের তখন টাকার প্রয়োজন ছিলো। ফলে বাবা আমাকে এক বছরের সময় বেধে দেন। যদি এই এক বছরে আমি দলে চান্স না পাই তবে আমাকে ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানিয়ে বাবাকে ব্যবসার কাজে সাহায্য করতে হবে।

ভাগ্যক্রমে পরের বছর আমি সেন্ট্রালের হয়ে অভিষিক্ত হই। আর তখন থেকেই আমার খেলোয়াড়ি জীবনের সূচনা ঘটে।

আমার জীবনের সংগ্রাম তখনো থেমে থাকেনি। যাত্রীবাহি প্লেনের ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য তখন আমাদের ছিলো না। যার ফলে আমরা কার্গো প্লেনে করে এক শহর থেকে আরেক শহরে উড়ে যেতাম। হারকিউলিস নামক কার্গো প্লেনের ইঞ্জিনের বিকট শব্দ থেকে বাঁচার জন্য কানে বিশাল বিশাল হেডফোন ব্যবহার করতাম আর কার্গো প্লেনের ভিতরে তোষক বিছিয়ে বসতাম।

আজো আমি যখন খুব আনন্দে থাকি তখন পিছনের এই দিনগুলোর কথা চিন্তা করি আর ভাবি এখন কতোটা ভালো আছি।

পরে আমি বেনফিকাতে খেলার জন্য সুযোগ পাই। হয়ত সবাই ভাববে আমি কতোটা ভাগ্যবান। প্রথমে বেনফিকা এর পরে রিয়াল, এর পরে ম্যানচেস্টার। কিন্তু শুধু আমিই জানি এর পিছনের দিন গুলো কতোটা কষ্টের। বেনফিকাতে আসার পরে আমার বাবাও আমার সাথে পর্তুগালে চলে আসেন। তার ব্যবসা, পরিবার, স্ত্রী সবকিছু ছেড়ে তিনি সাগর পাড়ি দিয়ে চলে আসেন পর্তুগালে। আমি সাক্ষী ছিলাম সেই সব রাত গুলোর যখন আমার বাবা তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে কান্না করে বলতেন তার অনুপস্থিতি তাকে কতোটা ভোগাচ্ছে।

তখন মাঝে মাঝে মনে হত আমি মনে হয় আসলেই অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি। আমার হয়ত উচিত ফিরে যাওয়া,সব ছেড়ে চলে যাওয়া।

২০০৮ এর অলিম্পিক আমার জীবনটাকেই পরিবর্তন করে দেয়। কারণ সেই বছর আমি আর্জন্টিনার হয়ে খেলার জন্য ডাক পাই।তখনো আমি বেনফিকার হয়ে একটা ম্যাচও খেলিনি কিন্তু সুযোগ পেয়েছিলাম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলার লিও মেসির সাথে খেলার।

তার দৃষ্টি আমার আপনার মত না। সে হতে পারে আমাদের মতই কিন্তু তার গতি, তার ক্ষীপ্রতা হার মানাবে যেকোন শ্রেষ্ট ফুটবলারকে।

তার সাথে খেলার সব থেকে মজার। কারণ আপনার মনে হবে আপনি শূন্যে দৌড়াচ্ছেন আর বল আপনার পায়ে জাদুর মত এসে লাগছে।

সেই অলিম্পিকে আর্জেন্টিনা জয়ী হয় ফাইনালে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে। সৌভাগ্যক্রমে আমার করা গোল আর্জেন্টিনাকে এনে দেয় স্বর্ণপদক।

 

মাত্র ২০ বছর বয়সে আমি বেনফিকাতে যোগ দিই। দেশের হয়ে স্বর্ণপদক জিতি অবশেষে রিয়াল মাদ্রিদে নিজের জায়গাটুকু নিশ্চিত করি।

এটি শুধু আমার জন্য নয় আমার পুরো পরিবার, আমার দলের সদস্য আর যারা আমাকে উৎসাহ যুগিয়েছে এতোদিন ধরে সকলের জন্য গর্বের বিষয় ছিলো। সবাই বলত আমার বাবা নাকি আমার চেয়েও ভালো ফুটবল খেলত। কিন্তু খুব অল্পবয়সেই তিনি তার দুই পায়ের হাটু ভেঙে ফেলেন। এমনকি আমার বাবার বাবা নাকি আমার বাবার চেয়েও ভালো ফুটবল খেলতেন। কিন্তু ট্রেন দূর্ঘটনায় তিনি তার দুটো পা হারান। আর তাদের অপূর্ণ স্বপ্ন পূর্ণ হল আমার মাধ্যমে।

আমার স্বপ্ন অনেক সময় ডুবতে বসেছিলো। কিন্তু আমি হাল ছাড়ি নি, চেষ্টার ত্রুটি রাখি নি।

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সবাইকে তার ভাগ্যের উপর বিশ্বাস রাখা উচিত। ভাগ্য যা চাইবে তার বাইরে কিচ্ছু হবে না।

আশা করি এতক্ষনে সবাই বুঝতে পারবে, সেদিন সাবেলার সামনে আমি কেনো ভেঙে পড়েছিলাম।

আমি বিচলিত ছিলাম না, আমার ক্যারিয়ার নিয়েও তেমন কোন ভাবনা ছিলো না, খেলা শুরু করা নিয়েও চিন্তিত ছিলাম না।

বুকে হাত রেখে বলতে পারি, আসল সত্য ছিলো, আমি চেয়েছিলাম নিজেদেরকে স্মরণীয় করে রাখতে, আর্জেন্টিনার ইতিহাসে, ফুটবলের ইতিহাসে।

যার কারণে, বিশ্বকাপ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পরে আর্জেন্টিনার বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে আমাদের নামে হওয়া নিন্দা, সমলোচনা আমাকে অনেক ব্যথিত করেছিল। আমরাও মানুষ,সবকিছু সবসময় আমাদের হাতে আসলেই থাকে না।আর তার জন্য এমন অস্বাস্থ্যকর সমালোচনা আসলেই ক্ষতিকর।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে বিশ্বকাপের ফাইনাল কোয়ালিফাইং ম্যাচের আগে থেকেই আমি মনোচিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতাম। মানসিক চাপ তখন এতোটাই বেশি ছিলো যা বর্ণনা করা যায় না।সেই সময় আমার পরিবার আমাকে যথেষ্ট সাহস যুগিয়েছিল। সেই সাথে মনো চিকিৎসকের পরামর্শ আমাকে মানসিক ভাবে শান্ত রাখতে যথেষ্ট সাহায্য করত।

আমি নিজেকে বোঝাতাম যে আমি পৃথিবীর অন্যতম সেরা দলের হয়ে খেলছি।ছোটবেলার লালিত স্বপ্ন পূরণ করে আমি আমার দেশের হয়ে খেলছি। পেশাদারিত্বের চাপে আমরা প্রায়ই এই সব কথা ভুলে যাই কিন্তু বাস্তবে ফিরে আসলে বুঝি চাপটা কতটুকু।

আমার মনে হয় আজকালকার মানুষেরা ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউবে শুধু খেলা দেখে কিন্তু খেলার পিছনে খেলোয়াড়দের কষ্টটুকু আর দেখে না। তারা যখন দেখে আমি আমার মেয়েকে কোলে নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফির সাথে হাসি মুখে ছবি তুলছি তারা আসলেই ভাবে আমরা হয়ত খুব সুখে আছি। কিন্তু তারা হয়ত জানে না একবছর আগে আমার কন্যার জন্ম হয় অকালজাত শিশু হিসেবে। সে দুই মাস হাসপাতালে ছিলো আষ্টেপৃষ্ঠে টিউব আর বিভিন্ন মেশিনের তার জড়িয়ে।

চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি নিয়ে কাঁদতে থাকা ছবি দেখে অনেকে হয়ত ভাববে আমি কাঁদছি ফুটবলের জন্য। কিন্তু না, আমি কেঁদেছিলাম কারণ আমার কোলে আমার মেয়ে ছিলো বলে আর সৌভাগ্যক্রমে সে আজ আমার সাথে আমার খুশির অংশীদার হতে পেরেছে।

তারা বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখেছে আর প্রত্যক্ষ করেছে ফলাফলটাকে। যা ছিল ০-১, কিন্তু তারা জানে না এতোটা পথ আসতে আমাদের ভ্রমণটা কতোটা কষ্টদায়ক ছিলো। আমরা কতোটা যুদ্ধ করে এই পথ পাড়ি দিয়েছি।

তারা হয়ত জানে না কেন আমার ঘরের সাদা দেয়াল কালো হয়েছিল। কেন আমার বাবা টিনের ছাউনি দেয়া ছোট্ট ঘরে দিন রাত কাজ করত। তারা জানে না কিভাবে আমার মা রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমাকে আর বোনকে নিয়ে সাইকেল চালিয়ে ৯  কিলোমিটার পথ প্রতিদিন আসা যাওয়া করত।

হারকিউলিসের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো কেউ জানে না।

–  দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে কলামটি লিখেছেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।