সুপার থার্টি, অতিমানবীয় হৃতিক ও অংকের জাদুকর আনন্দ কুমার

‘সবচেয়ে উঁচু লাফটা কে দেবে?’ – চিৎকার করে জিজ্ঞেস করেন হৃতিক রোশন। একে একে সুপার থার্টির প্রত্যেকে জবাব দেয়। বিহারের প্রত্যন্ত সেই অঞ্চলের ছোট্ট একটা ছাপড়া ঘরে তখন ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছে। রুপালি পর্দায় কখনো কখনো যে চাইলেই জাদুকরী কিছু মুহূর্ত সৃষ্টি করা যায় তার বড় প্রমান হল এই সিকোয়েন্স। ‘সুপার থার্টি’ ছবির এই দৃশ্যটা দেখে কারো কারো চোখে পানি এসেছে, কেউবা ‍অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

‘সুপার থার্টি’ ছবির গল্পটাই এমন যে, তা আপনাকে এক আশাবাদের রাজ্যে ভাসিয়ে দেবে। গল্পে আবেগ আছে, আছে বিরুদ্ধ পরিস্থিতির সাথে লড়াই, আছে হার না মেনে দাঁত কামড়ে টিকে থাকার প্রতিজ্ঞা, আছে স্বপ্নপূরণের বাঁধভাঙা উচ্ছাস। আর এই সব কিছুর কাণ্ডারী একজনই – হৃতিক রোশন। ছবিতে তিনি অংক বোঝাতে বোঝাতে আসলে মেথড অ্যাক্টিং গুলিয়ে খেয়েছেন। ভাবতেই অবাক লাগে যে, এই মানুষটাকে আবার ক’দিন বাদে ‘ওয়ার’-এর মত ধুন্ধুমার অ্যাকশন ছবিতে দেখা যাবে।

ছবিতে হৃতিক করেছেনও আরেক তারকার চরিত্র। তিনি হলেন আনন্দ কুমার। ভারতের ভিন্নধারার একজন শিক্ষাবিদ। পুরো ছবি জুড়েই তাঁর গল্প বলা হয়েছে।

আনন্দ কুমারের জন্ম পাটনার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। দারিদ্রের সীমারেখার নিচে থাকা এক পরিবারের ছেলে যে। হয়তো সেখানে দিন আনতে দিন ফুরাতো, তবে স্বপ্ন দেখার কোনো কমতি ছিল না। মেধাবী ছাত্র আনন্দ কুমার ছিলেন অংকের জাহাজ। বিশাল বিশাল অংকের সমস্যা সমাধান করে ফেলতেন এক নিমিষেই।

তার সুবাদে বিশ্বখ্যাত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণেরও ডাক এসেছিল। কিন্তু, জীবনের রং তো সব সময় রঙিন নয়। বাবার মৃত্যু আর আর্থিক টানাপোড়েনে বিলেত যাওয়া হল না। কিন্তু, আনন্দ পিছ পা হলেন না। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘রাজার ছেলেই কেবল রাজা হবে, সেদিন শেষ। এখন সেই রাজা হবে, যে এর যোগ্য দাবীদার।’

এখান থেকে শুরু হয় আনন্দের লড়াই। বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলের গরীব ছাত্রদের বিনা পারিশ্রমিকে আইআইটি -জেইই পরীক্ষার জন্য প্রস্তত করা শুরু করেন তিনি। এই লড়াইয়ে তিনি একদমই নি:সঙ্গ। তার ওপর কোচিংয়ের এই রমরমা বানিজ্যের যুগে এমন মানুষের তো শত্রুর অভাব হয় না। তাই, আনন্দকে অনেক কিছুরই মুখোমুখি হতে হয়েছে। অংক দিয়ে আর যাই হোক, শারীরিক হামলাকে তো আর আটকানো যায় না!

তবে, কখনো ভয় পাননি। নষ্ট হওয়ার যন্ত্রণা তিনি পেয়েছেন বলেই সেই যন্ত্রনার কাতরতাটাও জানা আছে তাঁর। সেজন্যই বিহারে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন রাজানুজন ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিক্স। যেখানে ২০০২ সালে থেকে প্রতিবছর ৩০ জন মেধাবী ছাত্রকে ভর্তি নেওয়া হয়। প্রথম বছর ৩০ জনের সবাই আইআইটিতে সুযোগ পায়। সেখানেই হয় নতুন ইতিহাসের সূচনা!

দীর্ঘদিন হল, এশিয়ার সবচেয়ে আবেদনময় পুরুষের খেতাব পেয়ে আসছেন হৃতিক রোশন। তবে, আনন্দ কুমারের চরিত্রটি করার খাতিরে তাকে সেই তকমা, সেই ব্যক্তিত্ব ভাঙতে হয়েছে। গ্ল্যামারাস হৃত্বিক তাঁর চীরচেনা খোলস থেকে বেরিয়ে যেভাবে নিজেকে ভেঙেচুড়ে আবার নতুন রূপে গড়েছেন, তার প্রশংসা না করলেই নয়। এটাই হৃতিকের সেরা কাজ – এটুকু বললেও এক বিন্দু বাড়িয়ে বলা হবে না। আদিত্য শ্রিবাস্তব, পঙ্কজ ত্রিপাঠি, ম্রুনাল ঠাকুর, অমিত সাধরাও নিজেদের চরিত্রটা ফুঁটিয়ে তুলতে চেষ্টার কোনো কমতি রাখেননি।

‘শিক্ষায় তো সবারই অধিকার আছে’ – সিনেমার শুরুর দিকে কথাটা বলেছিলেন আনন্দ কুমাররূপী হৃত্বিক। তবে, একটা সময় নিজেই সেটা ভুলতে বসেছিলেন। তবে, সিনেমার শেষে নিজেই প্রমাণ করে দেখান যে – ‘শিক্ষা কোনো ব্যবসা নয়, এখানে কোনো ধনী-দরিদ্র নেই। এটা কারো একার সম্পত্তি নয়।’

নির্মাতা বিকাশ ব্যাল ছবির দ্বিতীয়ার্ধ একটু বেশি লম্বা করলেও শেষ অবধি সামাজিক বার্তার কারণে ছবিটা বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে দর্শকদের জন্য। এই ছবি মানবিকতার কথা বলে, বলে সকল প্রতিবন্ধকতার বাঁধা ভেঙে জীবনকে উপভোগ করার কথা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।