সাদামাটা ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংবা একজন আনসাং হিরো

১৯৮০ সালের মে মাস। দক্ষিণ কোরিয়ায় চলছে সামরিক শাসন। মিস্টার চুন নামক এক আর্মি জেনারেল ক্ষমতায় বসেছেন আগের বছর রাষ্ট্রপতি পার্ক চুং-হি কে হত্যা করে।

মার্শাল ল’ ঘোষণা করে সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়, পার্লামেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীপক্ষের নেতাদের ধরপাকড় চলছে। এরই প্রেক্ষিতে ১৮ মে গুয়ান-জু শহরের প্রতিবাদী জনতা রাস্তায় নেমে এল, সৈনিকরা চালালো গুলি।

একজন জার্মান সাংবাদিক উত্তর কোরিয়ায় এলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ – কিছু খবর সংগ্রহ করা। যেতে হবে গুয়াঙজু। তিনি সংবাদ পেয়েছেন গুয়াঙজু শহরে শাসকগোষ্ঠী নির্যাতন চালাচ্ছে সাধারন মানুষের ওপর।

সকল যোগায‌োগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সে অঞ্চলের সাথে দেশের। মানুষ সঠিক খবর জানে না, চলছে গুজবের ডাল-পালার প্রশস্তকরণ চলছে। দেশজুড়ে চলছে কারফিউ, গণতান্ত্রিক সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতায় সামরিক সরকার।

১৯৮০’র সামরিক শাসনামল

সাংবাদিক ট্যাক্সি কোম্পানিকে খবর দিলেন। তাঁকে সে শহরে যেতে হবে খবর সংগ্রহের লক্ষ্যে, যে চালক তাঁকে নিয়ে যাবেন তাকে দেয়া হবে মোটা অংকের পারিশ্রমিক।

মিস্টার কিম কাজটা নিলেন। তিনি অকুতোভয় সাংবাদিককে নিয়ে সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে চলে এলেন জনবিচ্ছিন্ন গুয়াঙজু শহরে। সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়তে লাগলো সরকারের নির্যাতনের চিত্র।

ছাত্র, জনতার বক্তব্য ভিডিও করে নিলেন তিনি। হাসপাতালে আহতদের আহাজারি, নিহতদের অনন্ত আক্ষেপ পরিবেশ ভারী করে তুললে ট্যাক্সি চালকই সাংবাদিককে সাহস দিলেন।

সাংবাদিক তাঁর কাজ শেষ করলেন নানান বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে। ট্যাক্সি চালক তাকে বিমানবন্দরে অগ্রীম ফ্লাইটে জাপান যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন, পাছে সামরিক সরকার তাঁকে ধরে ফেলে।

সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার ও জার্মান সাংবাদিক

১৯৮৭ সালে সামরিক সরকার নির্বাচন দিতে গণতান্ত্রিক নির্বাচন দিতে রাজি হয়েছিল। ১৯৯০ সালের শেষদিকে মিস্টার চুনকে ১৯৭৯ সালের বিদ্রোহ ও গুয়াঙজু হত্যাকাণ্ডের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

২০০৩ সাল। দক্ষিণ কোরিয়ার চিত্র বদলে গেছে। সেখানে এখন গণতন্ত্র। সেই সাংবাদিক তার বীরত্বের জন্য পুরস্কার পেলেন; তখন তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন তাকে সহায়তা করা সেই ট্যাক্সি চালক মিস্টার কিমের, তাঁর চোখে তিনিই যে প্রকৃত বীর।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গুয়াঙজু হত্যাকাণ্ডের খবরাখবর বিশ্ববাসীর পক্ষে জানা অসম্ভব ছিল যদি না সিউল শহরের চালক মিস্টার কিম তাকে এত সহযোগিতা না করতেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণও অন্ধকারে থেকে যেত।

সাংবাদিক অনেকবার মিস্টার কিমের খোঁজ করেছিলেন, কেউ তার কোন নূন্যতম তথ্য দিতে পারেনি। হয়তো মিস্টার কিম চাননি কেউ তাকে খুঁজে পাক। সাংবাদিক পুনরায় তার ট্যাক্সিতে চড়তে চেয়েছিলেন। দেখতে চেয়েছিলেন আধুনিক দক্ষিণ কোরিয়া। সে আশা তাঁর পূরণ হয়নি। মিস্টার কিমের সাথে দেখা হওয়ার আগেই ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

জুরগ্যান হিনজপিটার

সাংবাদিক ভদ্রলোকের নাম ছিল জুরগ্যান হিনজপিটার। তিনি ৭৮ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। জার্মান মিডিয়া এআরডি’র জাপানভিত্তিক রিপোর্টার ছিলেন তিনি। সে ট্যাক্সি চালকের নাম ছিল কিম সা বোক। কে জানে এটাও হয়তো ছদ্মনাম!

এতক্ষণ যা বললাম তা সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা। হারিয়ে যাওয়া ট্যাক্সি চালকের খোঁজ বের করার জন্য দক্ষিণ কোরিয়াতে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছিল ২০১৭ সালে। ছবির নাম ছিল ‘এ ট্যাক্সি ড্রাইভার’ যাতে অভিনয় করেছিলেন সং কাং-হো।

মিস্টার হিনজপিটারের মতো সিনেমা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও খোঁজ করেছিলেন মিস্টার কিমের। প্রায় সকল প্রবীণ দক্ষিণ কোরিয়ান নাগরিকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তার ব্যাপারে। কেউ সদুত্তর দিতে পারেনি।

অনেক খোঁজাখুজির পর খুঁজে পাওয়া গেছে তাঁর ছেলেকে। তিনি হলেন কিম সিউঙ-পিল। তিনি জানান, তাঁর বাবা ১৯৮৪ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দিত যে, আমার বাবার ব্যাপারে সত্যিটা এখন দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছে।’

গুয়াঙজুতে জুরগ্যান হিনজপিটারের স্মৃতি স্তম্ভ

জীবদ্দশায় একজন অদৃশ্য দেশপ্রেমিক হয়েই ছিলেন মিস্টার কিম। সবাই তো পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে চায় না, ধরে নেয়া যায় মিস্টার কিমও তেমন কেউ। যিনি পর্দার আড়ালের নায়ক হয়েই থাকতে চেয়েছিলেন।

– নিউ ইয়র্ক টাইমস ও কোরিয়া জোঙগ্যাঙ ডেইলি অবম্বনে অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।