নব্বইয়ের সন্ধ্যারাত

তখন এই সময় বিকাল সাড়ে তিনটায় শুরু হওয়া বাংলা সিনেমাটা মাত্র শেষ হত। বিজ্ঞাপন তখনও অনেক সময় ধরে হত, কিন্তু তখনকার বিজ্ঞাপনও ভালো লাগতো, প্রেমিকার কপট অভিমানের মত। সিনেমা শেষ আর বাবার হুঙ্কার- পড়াশুনা তো আকাশে উঠছে আজকাল! পড়ার সময় তো এত আগ্রহ দেখি না, পড়তে বস!

অবাক হতাম কারণ এই মানুষটাই কিচ্ছুক্ষণ আগে আমাদের সাথে তিন ঘণ্টার সিনেমা উপভোগ করেছেন, আর সিনেমা শেষ হতে না হতেই তার রুপ আমূল পরিবর্তন- একদম বাংলা সিনেমার কূটনামী করা ভিলেনের মতই। এই অবস্থা থেকে বাঁচাতেন মা।

‘আহহা! পড়বে তো ওরা, দেখি তুমি এদিকে আসো তো, আমি চা দিচ্ছি’ – কোটি টাকা লটারিতে জেতার খবরের চেয়ে বেশি শান্তিময় বাক্য ছিল আমাদের মায়ের বলা ‘আমি চা দিচ্ছি’ – এই ছোট্ট বাক্যটা। বাবা নামের মানুষটা এই বাক্যটা শুনেই একদম ঠাণ্ডা। মুখটা বইয়ে গুঁজে রাখতাম, কিন্তু কানটা থাকতো ডাইনিং টেবিলে বসা বাবা মায়ের চায়ের ফাঁকে চলা ‘হালকার উপরে ঝাপসা’ রোম্যান্টিক আলাপের মাঝে।

শার্লক হোমসের চেয়ে চালাক বাবা সেটাও ধরে ফেলতেন কিছুক্ষণ পর, তার প্রমাণ পেতাম এই বাক্যের মাঝে- সাকিব! আওয়াজ পাই না ক্যান পড়ার? শব্দ করে পড় না ক্যান? মিনমিন করে কীসের পড়া? মনে মনে পড়লে কি পড়া মনে থাকে? আর পারিনা এই ছেলেটাকে নিয়ে! মানুষের বড় ছেলে কত ম্যাচিউরড হয়, আর আমারটা!

ইমম্যাচিউর ছেলের ম্যাচিউর বাবাটা রাত দশটায় ডাকতেন, একসাথে ভাত খাওয়ার জন্য। আধা ঘণ্টা সময়- ভাত খাওয়া আর টিভি দেখা দুটোর জন্য। অথচ এই তিনিই আবার শিখিয়েছেন- একসাথে দুই কাজ কখনো হয়না। তাহলে প্রতিদিন একটা মাসুম বাচ্চাকে কেন রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটার মাঝে একসাথে দুটো কাজ শেষ করতে হবে?

জানতে ইচ্ছে হত অনেক, জিজ্ঞাসা করতাম না।

অধিক কৌতূহলের ফলাফল কানের নিচে আঘাত আনতে পারে- এই আশঙ্কায় চুপচাপ থাকতাম। ইচ্ছে করে একটু দেরি করে খাবার শেষ করার চেষ্টা করতাম। সময় বাড়ানোর কৌশল ও নিজের আবিষ্কার করা ‘আম্মু আজকের ডালটা যা মজা হয়েছে না! আমাকে আর একটু দাও তো!’, ‘ডাল বেশি নিয়ে ফেলসি আম্মু, আর একটু ভাত দাও তো, ভাত নিতে আসলাম’, ‘শুধু ভাত কি দিয়া খাব? আর একটু তরকারি দাও’ – খাবারের প্রতি অনীহা থাকা ছেলের ক্ষুধা হুট করে তো বেড়ে যাওয়ার কারণ মা আর বাবা সরু চোখে বোঝার চেষ্টা করতেন, আর আমি সুনিপুনভাবে অভিনয় চালিয়ে যেতাম। অভিনয়ে আমি ছোটবেলা থেকেই ভাল। দশটা চল্লিশ, পঞ্চাশ আর একটু- এগারোটা- ইয়েস!

ইচ্ছে করে দেরি করার কারণ একটাই -এক্স ফাইলস। সাড়ে এগারোটায় শুরু হবে। আজকে যদি বিধাতা একটু মুখ তুলে তাকান, একটু যদি বাবা আর মা ‘হ্যাঁ’ বলেন এক্স ফাইলস দেখার জন্য। খোদা মাসুম বাচ্চাদের আবদার শুনেন না, এমনটাই মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু হুট করে সেদিন মা বললেন- দেখুক না আজকে, থাক। একদিনই তো।

আমাদের মায়েদের সামনে বাবারা কিচ্ছু বলতেন না, শুধু রাগে কাঁচুমাচু মুখ। রাগ প্রকাশ করতেন এভাবে- আমি আর পারিনা এদের নিয়ে। উফ! দেখ! এক্স ওয়াই জেড ফাইল- সব দেখ! আমি ঘুমাতে গেলাম।

মিস করি অনেক। সমগ্র দুনিয়া এনে দিলেও আমার নব্বইয়ের সময়কার সামনে সেটা তুচ্ছ। এই আবেগ শুধুই অনুভবের, অন্যকোনোভাবে বুঝানো যাবে না।

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।