অমরেশ পুরি: বলিউডের অবিসংবাদিত সেরা খলনায়ক

স্নেহময় পিতা কিংবা ধুন্ধুমার কোনো ভিলেন – যখন যেটাই তিনি করুন না কেন হয়ে উঠতেন অসাধারণ। মনে হত, এর চেয়ে ভাল ভাবে হয়তো কাজটা আর কেউই করতে পারতো না। বিশেষ করে ভিলেন হিসেবে তিনি নিজেকে অপরিহার্য এক কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিলেন।

‘মিস্টার ইন্ডিয়া’র মোগ্যাম্বো, ‘বিধাতা’র জাগাভার, ‘মেরি জাঙ’-এর ঠাকরাল, ‘ত্রিদেব’-এর ভুজাঙ, ‘ঘায়েল’-এর বালওয়ান্ট রায়, ‘দামিনি’র ব্যারিস্টার চাড্ডা, ‘করণ অর্জুন’-এর ঠাকুর দুর্জন সিং, ‘রাম লাখান’-এর বিশ্বম্বর নাথ – ইত্যাদি চরিত্রের সুবাদে তিনি চিরকালই বেঁচে থাকবেন বলিউডের বুকে। তিনি হলেন জীবন নদীর ওপারে চলে যাওয়া অভিনেতা অমরেশ পুরি।

ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সম্মানের স্থানটায় আজো বসে আছেন তিনি। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালের ২২ জুন, পাঞ্জাবে। বাবা হলেন লালা নিহাল চাঁন্দ ও মা ভেদ কওর। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে পুরি ছিলেন তৃতীয়। শিমলার বিএম কলেজ থেকে পুরি স্নাতক করেন।

মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মাত্র ১০০ রুপি পকেটে নিয়ে। পরিশ্রম, অধ্যাবসায় ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনই তাঁর জীবনে সাফল্যের চাবিকাঠি। ১৯৫৭ সালে বিয়ে করেন উর্মিলা দিবেকারকে। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে রাজিব পুরি ও মেয়ে নম্রতা পুরি।

মুম্বাইয়ে যখন আসেন, তখন ভাই মদন পুরি প্রতিষ্ঠিত একজন অভিনেতা। ওই সময়ে প্রথম স্ক্রিন টেস্ট দিয়ে ব্যর্থ হন অমরেশ। যদিও, ভারতের শ্রম মন্ত্রনালয়ে একটা চাকরি জুটে যায়। চাকরির পাশাপাশি তখন পৃথিবী থিয়েটারে কাজ করা শুরু করেন। সিনেমায় আসার আগেই তিনি থিয়েটারের ভূবনে প্রতিষ্ঠিত হন। প্রথম সিনেমা যখন করেন তখন বয়স প্রায় ৪০ ছুঁইছুঁই।

সিনেমা ছাড়াও মঞ্চ নাটকের পরিচিত মুখ তিনি।  হিন্দি ভাষার সিনেমা ছাড়াও কান্নাড়া, মারাঠি, পাঞ্জাবি, মালায়ালাম, তেলেগু ও তামিল ছবিতেও বিস্তর কাজ করেছেন। পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জয় করেন তিনটি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার।

হলিউডের সিনেমাতেও কাজ করেছেন। একবার নয়, তিনবার। ছবি গুলো হল  – ‘গান্ধী’ (১৯৮২) ‘ইন্ডিয়ানা জোন্স’ (১৯৮৪) ও ‘দ্য টেম্পল অব ডুম’ (১৯৮৪)। হলিউডের খ্যাতনামা পরিচালক ও ইন্ডিয়ানা জোন্সের নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গ খুব পছন্দ করতেন পুরিকে। স্পিলবার্গ একবার বলেছিলেন, ‘পুরি আমার সবচেয়ে পছন্দের খলনায়ক। তার মত কেউ এই পৃথিবীতে আগে কখনো আসেনি, ভবিষ্যতেও আসবে না।’

পুরি মারা যান ২০০৫ সালের ১২ জানুয়ারি। ৭০-এর দশক থেকে মৃত্যুর আগ অবধি ৪০০ টিরও বেশি ছবিতে কাজ করেন তিনি। প্রথমে পার্শ্ব চরিত্র করতেন। কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের অবিসংবাদিত সেরা খলনায়ক। দর্শকদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য অমরেশ পুরির কণ্ঠস্বরই ছিল যথেষ্ট। তিনি ভিলেন হিসেবে কিংবদন্তিতুল্য সব চরিত্র করেছেন।

যদিও সেই খ্যাতিটা তিনি পান ক্যারিয়ারের একটা লম্বা সময় কেটে যাওয়ার পর। ১৯৮০ সালে ‘হাম পাঁচ’ ছবিটি দিয়ে তিনি খ্যাতির চূড়ায় ওঠেন। সেখান থেকে আর কখনোই অমরেশ পুরিকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

পুরির ক্যারিয়ারের গ্রাফ একেবারেই পাল্টে যায় ১৯৮৭ সালে। সেবার শেখর কাপুরের ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ মুক্তি পায়। সেখানে ‘মোগ্যাম্বো’র চরিত্র করেন তিনি। ছবিতে তাঁর বলা ‘মোগ্যাম্বো খুশ হুয়া’ এখনো ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে জনপ্রিয় সংলাপগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আশির দশকের শেষে ও নব্বইয়ের দশকে এমন সময় বহুবারই এসেছে তখন নির্মাতা ও প্রযোজকরা অমরেশ পুরিকে ছাড়া ছবিই বানাতে চাইতেন না।

ভিলেন চরিত্র ছাড়া ‘বাবা’ হিসেবেও অনন্য ছিলেন পুরি। নব্বইয়ের দশকে এসে বাবার চরিত্রে অভিনয় করে বেশ প্রশংসিত হন।বলিউডের কঠোর বা রাগী বাবা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তোলেন। গার্দিশ, দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, হালচাল, পরদেশ-সহ বিভিন্ন ছবিতে বাবার চরিত্রে অভিনয় করেন। তবে আলাদা করে বলতে হয় ‘ভিরাসাত’ সিনেমার কথা। বাবা- ছেলের প্রজন্মগত দ্বন্ধে বাবার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন অমরেশ পুরি।

– হিন্দুস্তান টাইমস ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।